তোতা পাখির মত ‘মাসাচিং’ ‘মাসাচিং’ বলতাম, যেন চারদিকে ‘মাসাচিং’ বলার প্রতিযোগিতা চলতেছে।

অামরা সাভার গিয়া প্রথম যে বাসাটাতে উঠছিলাম সেইখানে বিভিন্ন এলাকার, অার ধর্মের মানুষ থাকত। একজন হিন্দু অান্টি ছিলেন, যার ছেলের নাম অাবির। একজন খ্রিস্টান অান্টি ছিলেন, ওনার একটাই মেয়ে। নাম অনুপমা। ও হিংসুইট্টা বইলা ওর সঙ্গে কেউ খেলতে চাইত না।

একজন চাকমা অান্টি থাকতেন একদম শেষের ফ্ল্যাটটাতে। উনার নাম মাইসা চৌধুরী। খালি মাইসা চৌধুরী কেন তা নিয়া অামরা ভাবতাম। আমাদের ধারণা ছিল চাকমাদের নাম শুধুমাত্র ওরাই উচ্চারণ করতে পারে। উনার নামও তেমন হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হইয়া মাইসা চৌধুরীর মত সরল নাম হইল কেন? জটিল কেন হইল না?

অান্টি অামারে অনেক অাদর করতেন, কখনোই অামারে অামার নামে ডাকেন নাই, উনার দেওয়া ‘রিতু’ নামে ডাকতেন। অামারে দেখলেই রিতু বইলা ডাক দিতেন। অামিও দৌড়াইয়া গিয়া সুন্দর মত উনার বিশাল কোলে বইসা পড়তাম।

অামরা বাড়ির সব বাচ্চারা উনারে ডাকতাম ‘দিদি অান্টি’ বইলা। বড়রা উনারে ‘দিদি’ বলত, অামরা ওই দিদি ধইরাই অান্টি ডাকতাম, দিদি অান্টি।

দিদি আন্টি কয়দিন পর পর উনার গ্রাম থেইকা নতুন নতুন কাজের মেয়ে অানতেন। তাদের কেউই বেশি দিন থাকত না। কেন থাকত না তা জানি না।

প্রথম যারে অানছিলেন, তার নাম ‘পুতুল’। এর নাম পুতুল কেন তা ওর চেহারা দেখলেই বোঝা যাইত, এত্ত সুন্দর একটা মেয়ে ছিল পুতুল, যে কেউ একবার দেখলে অারো বহুবার দেখতে চাবে!

চুলগুলা কালো অার স্ট্রেইট, স্লিম ফিগার, সুন্দর স্কিন, অার গোলাপি পাতলা ঠোঁট পুতুলের। সব সময় থামি অার উপরে ওই রকম কাপড়ের একটা টপ পরত। কী যে সুন্দর লাগত!

কিন্তু, সে বেশিদিন থাকল না দিদি অান্টিদের বাসায়। অল্প দিনের জন্য অাসল, অাবার চইলাও গেল।

তখন অামার একটু মন খারাপ হইল। অামার পুতুলরে দেখতে ভাল লাগত। ও যখন কাজ করত, অামি ওর দিকে তাকাইয়া থাকতাম। পুতুল তাকাইলে অাবার দ্রুত চোখ সরাইয়া নিতাম, ভান করতাম যেন এতক্ষণ অন্য কিছু দেখতেছিলাম। পুতুল তা বুঝত নিশ্চই!

পুতুল যাওয়ার পরে দিদি অান্টি নিয়া অাসলেন মাসাচিংরে। পুতুল যতটা সুন্দর ছিল, মাসাচিং তার কিছুই না। তবে চেহারা অার সাইজের জন্য ওরে দেখতে অনেক কিউট লাগত। অামরা বাচ্চারা পছন্দ করছিলাম ওর নাম—মাসাচিং। তোতা পাখির মত ‘মাসাচিং’ ‘মাসাচিং’ বলতাম, যেন চারদিকে ‘মাসাচিং’ বলার প্রতিযোগিতা চলতেছে। যে সবচেয়ে বেশিবার ‘মাসাচিং’ বলতে পারবে তার জন্য বিশেষ পুরস্কার অাছে।

সে অল্প দিনের মধ্যেই সবার সঙ্গে খাতির জমাইয়া ফেলল। যেইটা পুতুল পারে নাই। পুতুল ছিল ইন্ট্রোভার্ট। আার মাসাচিং খুব মিশুক প্রকৃতির। সবসময় হাসিখুশি, চঞ্চল। সবার সঙ্গে মিশত, কথা বলত। সব বাচ্চারে অাদর করত।

মাসাচিং-এর সঙ্গে মিশার পর মনে হইল, অামার অাসলে পুতুলের চাইতে মাসাচিংরেই বেশি ভাল লাগে। এই যে পুতুল যখন ছিল, কখনোই সে অামারে অত অাদর করে নাই। গাছ থেইকা মরিচ ছিঁড়ার সময় বা তারে কাপড় মেলার সময় অামারে কখনোই ডাকে নাই, অামি যে বাচ্চা হিসাবে খুবই ভাল অার কিউট তাও বলে নাই। খালি হাসছে। খালি হাসিতে কি হয়!

২.
ওই বাড়ির প্রত্যেকটা ফ্ল্যাটের পিছে এই পরিমাণ জায়গা ছিল যে একটা কইরা প্রাইভেট কার অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। ওইখানে বড়রা বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি-ওষুধি গাছ লাগাইত। অামরা ওইখানে খেলতাম বা খেলার সময় লুকাইতাম। খেলায় কোনো দুর্ঘটনার সিন থাকলে ওইখান থেইকা পুঁইশাকের লাল দানা ছিঁড়া অাইনা হাতে ঘষতাম, ঘইষা তা দিয়া রক্ত বানাইতাম।

তবে, অামি অারেকটা কারণে ওখানে যাইতাম। মাসাচিং যখন রান্নাঘরে থাকত ওইসময় ওর অাশেপাশে কেউ থাকত না। তো অনেক প্রাইভেট অালাপ করা যাইত। যেমন সে রানত অার অামি গ্রিল ধইরা ঝুলতে ঝুলতে কালকে পরশু কী হইছে না হইছে, কে অামার সঙ্গে ঝগড়া করছে, কে দুর্ব্যবহার করছে, কার সঙ্গে অার খেলি না এখন, কেন খেলি না, তাতে কত খারাপ লাগছে অামার—সব বলতাম। অার মাসাচিং মনোযোগ দিয়া শুনতে শুনতে “অাহারে”, “ইশ”, “ওমা, তাই” করত!

দিদি অান্টিরা মরিচ ভর্তা খাইতেন খুব। তবে, অামার সবচেয়ে পছন্দের ছিল ওনার হাতের একটা বেগুনের তরকারি। ছোট ছোট বেগুন অাস্ত রাইখা গোড়ার দিকটা মশলা ঢোকার জন্য ফালি কইরা খুব ঝাল দিয়া রানতেন। তরকারিটা খাইতে খুবই স্বাদের। এই পদ যেইদিন রান্না হইত ওইদিন অামার ওনাদের বাসায় অঘোষিত দাওয়াত। দিদি আন্টি মাসাচিংরে আমাদের বাসায় পাঠাইয়া দিতেন আমারে নিয়া যাওয়ার জন্য।

তবে ভর্তা হইলে দিদি অান্টি মাসাচিংরে দিয়াই বানাইতেন। মাসাচিং দীর্ঘসময় নিয়া পাটায় এত্তগুলা মরিচ পিষতে থাকত, অার অামি তা দেখতে দেখতে ওরে হাজারটা প্রশ্ন করতাম—মরিচ কেন ভর্তা করে? না করলে কী হইত? মরিচের রঙটা এইখানে লাল হইলে তা খাইতে ভিন্ন হইত কিনা, ঝাল বেশি হইত কিনা, এইটাতে কেন পিঁয়াজ দিবে না, ভর্তা কেন চুলায় রান্ধে না—ইত্যাদি ইত্যাদি।

মাসাচিংয়েরও ধৈর্য্য ছিল সেইরকম। ও অামার সব প্রশ্নের উত্তর দিত, এবং খুব অাগ্রহ নিয়া। যেন, এইখানে ওর কথা বলার অার কেউ নাই অামি ছাড়া, সারাদিনে ওই একবারই ওর কথা বলার অনুমতি অাছে!

প্রত্যেকবারই সে যখন ভর্তা বানাইত, অামি সবার অাগে তা থেইকা একটু খাইতাম। সে জানত আমি ঝাল একদম সহ্য করতে পারি না, খুবই নিষেধ করত। আমিও নাছোড়বান্দা, ভর্তা না খাইয়া যাব না। না দেওয়া পর্যন্ত ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকতাম।

নিরুপায় হইয়া ওরে দিতেই হইত। জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়া অামি রান্নাঘরে হাত বাড়াইয়া দিতাম, ও হাতের তালুতে একটুখানি ভর্তা দিত, অার বলত, “ভাবি দেখো খাবে কিনা, দেখিও পরে জ্বলবে মুখে, খেলে জলদি মুখে দাও, হাত জ্বলবে পরে!”

অামি খুব সাহস নিয়া প্রত্যেকবারই তা মুখে দিতাম, কিন্তু প্রত্যেকবারই অামার ঝাল লাগত। এত ঝাল যে কান্না চইলা অাসত, চোখ দিয়া পানি পড়তে থাকত। অামি তখন ওর সামনে থেইকা দৌড় দিয়া অন্যখানে চইলা যাইতাম। গিয়া জামায় চোখ মুছতাম আর জোরে জোরে শ্বাস নিতাম। তবু ওরে দেখাইতাম না, ঝালে অামার কষ্ট হইতেছে!