মাসাহিরো শিনোদা’র ‘সাইলেন্স (১৯৭১)’

২০১৬ সালের শেষ মাসে মুক্তি পায় আমেরিকান পরিচালক মার্টিন স্করসেজি’র সিনেমা ‘সাইলেন্স’। তিনি প্রায় ৩০ বছর যাবৎ ছবিটি নির্মাণের পরিকল্পনা করে আসছিলেন। এই চলচ্চিত্র জাপানি লেখক শুসাকু এন্দো’র বিখ্যাত বই অবলম্বনে তৈরি।

স্করসেজি তার ক্যারিয়ারের প্রায় সব ছবিতেই ক্যাথলিক মানসিকতায় অপরাধবোধ কীভাবে কাজ করে—তা নিয়ে এগোনোর চেষ্টা করেছেন। ‘সাইলেন্স’-এর প্রেক্ষাপট ১৫০০ সালের মাঝমাঝিতে শুরু হওয়া খ্রিস্টধর্মের সংস্কার ও প্রচারের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এই ছবি দিয়ে স্করসেজি ক্যাথলিসিজম ও এর সাথে জড়িত দ্বিধাগুলি দৃঢ়ভাবে আলোচনায় আনার সুযোগ পেয়ে যান।

ছবির পরিচালক মাসাহিরো শিনোদা।

একই উপন্যাস থেকে ১৯৭১ সালে জাপানি পরিচালক মাসাহিরো শিনোদা এই শিরোনামেই একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন। ওজু, কুরোসাওয়া কিংবা মিজোগুচিদের ভিড়ে শিনোদা’র নাম যেমন অনেকের শোনা হয় নাই, তেমনি তার এই ছবির ব্যাপারেও অনেকেই জানে না।

সিনেমার শুরু হয় কিছু স্থির চিত্রকর্ম দেখিয়ে। ক্যামেরা চলছে আর জাপানি উডব্লক প্রিন্টের ছবি আসছে একের পর এক।

ধারাবর্ণনায় ষোড়শ শতকে জাপানের ধর্মীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হচ্ছে। সে সময় খ্রিস্টধর্মের উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য স্পেনের ধর্মযাজক ইগনেশিয়াস লয়োলার উদ্যোগে তৈরি হয় ধর্মসংঘ ‘সোসাইটি অফ জিজাস’।

তাদের তত্ত্বাবধানে পাদ্রীরা ছড়িয়ে পড়েন ধর্মপ্রচারে। সেই অভিযাত্রা ইউরোপ ছাড়িয়ে যায়। ১৫৪৯ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস এক্সেভিয়ারের নেতৃত্বে তা এসে পৌঁছে জাপানে।

ত্রিশ বছরে তাদের ধর্মপ্রচার জন্ম দেয় প্রায় তিন লাখ অনুসারীর। জাপানের শাসকগোষ্ঠী ধর্মের এরকম ‘জবরদখলে’ শুরু থেকেই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিল। সেখানে খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই সাথে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়েছিল, তাদেরকে ধর্মত্যাগে বাধ্য করতে শুরু হয় অত্যাচার ও অবদমন।

শুরুর মতো সিনেমার শেষটাও হয় কিছু স্থিরচিত্র দেখিয়ে। তবে এবার চিত্রকর্ম নয়, বরং ক্যামেরা নিজেই স্থির। সেই সাথে তাতে ধারণ করা পাত্র-পাত্রীরাও। আর এই নিশ্চল মুহূর্তগুলির মাঝখানের সময় যেন টানা কবিতার মতো দেখিয়ে যায় হিংস্রতা ও মানবিকতার চরম রূপ।

“বহুকাল ধরে এখানকার মানুষজন তাদের পোষা গরু আর ঘোড়াগুলির মতই জীবনযাপন করে আসছে। এমনকি শেষমেশ তারা মারাও যায় এই বন্য পশুদেরই মত।”

রুক্ষ পাহাড়ি ভূমিকে ক্ষেতে পরিণত করতে জাপানি চাষিদের যে অসুবিধা পার করতে হত—তার বিনিময়ে তাদের প্রাপ্তির বৈষম্যটা ধরতেই এক বিদেশি পাদ্রীর এই মন্তব্য। তিনি তার ডায়েরিতে কথাগুলি টুকে রাখছেন। যে উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাটি তৈরি, তার কাঠামোটাও ছিল ডায়েরি আর চিঠির আদলে। একজন আরেকজনকে চিঠি লিখছে বা কখনো কখনো নিজের রোজনামচা লিখে যাচ্ছে—আর তাদের আলাপ ও আত্মকথনেই এগোচ্ছে কাহিনি।

নিজের উপন্যাস থেকে সিনেমাটির চিত্রনাট্য লেখার সময় প্রখ্যাত জাপানি লেখক শুসাকু এন্দো এই কাঠামোটা আর রাখেন নি। তবু ডায়েরি লেখার এই দৃশ্যটুকুতে তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়।

উপন্যাসটা ছিল ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী। সপ্তদশ শতকের সংঘাতময় জাপানকে প্রেক্ষাপটে রেখেই লেখক গল্প ফেঁদেছিলেন, পাশাপাশি তার চরিত্রগুলিও ছিল বাস্তব ব্যক্তিত্বদের প্রতিচ্ছবি।

গল্পের শুরুটা এমন—সোসাইটি অফ জিজাসের দুইজন ‘জেজুইট’ পাদ্রিকে জাপানে পাঠানো হয় ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তাদের সংঘের প্রবীন এক ফাদারকে খুঁজে বের করার জন্যে। তিনি ৫ বছর যাবৎ নিখোঁজ। কিছু খ্রিস্টান জাপানির সহায়তায় ফাদার রদ্রিগেজ ও ফাদার গার্পে জাপানের একটি গ্রামে এসে পৌঁছান। সেখানকার অনেক গ্রামবাসী খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। সেই গ্রামবাসীদের আশ্রয়ে থেকে পাদ্রি দু’জন জাপানের অবস্থা কিছুটা আঁচ করার চেষ্টা করেন। তাদের উপলব্ধি অবশ্য ফাদার রদ্রিগেজের ডায়েরির লেখায় স্পষ্ট। তবে নিতান্ত এই পর্যবেক্ষণ বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে বেশি সময় লাগে না।

লুকিয়ে থাকা খ্রিস্টানদের খুঁজে বের করতে জেলাশাসকের লোকেরা তৎপর। নিয়মিত বিরতিতে তারা গ্রামে ঢুঁ মারে।  তুলে নিয়ে যায় সন্দেহভাজনদের। তাদের উপর শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ধর্মত্যাগে বাধ্য করানো হয়। একটা ফলকের উপর যীশু বা মেরীর প্রতিকৃতি—স্থানীয় ভাষায় একে ‘ফুমিয়ে’ বলে—তার ওপর পা দিয়ে দাঁড় করিয়ে সেসব খ্রিস্টানদের আনুগত্যের পরীক্ষা নেয়া হবে। সবাই বলে, ওই গ্রামেরই ছেলে ‘কিচিজিরো’কে তার পরিবারসহ ধরে নিয়ে গিয়ে ফুমিয়ে’র ওপর দাঁড়াতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের বাকি সবাই ধর্মবিশ্বাসে অটল থাকলেও কিচিজিরো পারে নি। যীশু ও মেরীকে অপবিত্র করে সে বেঁচে যায়। আর বাকি সবাই পায় মৃত্যুদণ্ড।

এখন অবশ্য কিচিজিরো নিজের পাপমোচনের আশায় আবার স্বধর্মে ফিরে এসেছে। পাদ্রিদের সাথে দেখা করতে মরিয়া সে। দেখা হবার পর ফাদার রদ্রিগেজকে সাথে নিয়ে নৌকা পার হবার সময় ফাদারের তিরস্কারে সুযোগ পেয়ে মাথা নুয়ে শুয়ে পড়ে। রাতের ছায়ায় ফাদারের দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তির সামনে নৌকার গলুইয়ে গড়াগড়ি খায়।

কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক কাজুয়ো মিয়াগাওয়া’র সিনেমাটোগ্রাফিতে এমনকি অন্ধকারেও প্রকৃতির প্রতি অনুষঙ্গের ছায়ারেখা স্পষ্ট। যেন কোনও বিশদ সেটে সবকিছু সযত্নে ও সচেতনভাবে বসানো। স্থির কোনও নদীতে রাতের চাঁদের আলোর প্রতিফলন, তার এক কোণে নৌকা—আর সবকিছুর পেছনে পাহাড়ের সারি যেন কারো হাতের পেন্সিলে আঁকা।

একসময় ধরা পড়ে যান ফাদার রদ্রিগেজ। কিচিজিরো প্রতারণা করে। নিজেকে বাঁচাতে আবারো ভীতির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে সে। তবে যীশু খ্রিস্টকে ধোঁকা দিয়ে জুডাস যেমন আত্মহত্যা করেছিল, তেমনি অনুতাপের যন্ত্রণায় কিচিজিরো ফের নিজ ধর্মে ফিরে যেতে চায়; প্রয়োজনে মৃত্যুও তার কাম্য। অন্যপাশে ফাদার রদ্রিগেজের মাঝেও যীশু প্রতিফলিত হতে থাকেন—ধর্ম প্রতিষ্ঠায় অবিচলিত থাকতে তাকে পাশবিক সব শাস্তি সহ্য করে যেতে হয়।

তার শারীরিক কষ্টের বিপরীতে স্থানীয় খ্রিস্টানদের নির্যাতনের নিয়মিত পর্বগুলি তার সহ্যক্ষমতার পরীক্ষা নেয়। অত্যাচারের নৃশংসতায় নিজের দায়িত্ব নিয়ে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান, বোঝার চেষ্টা করেন ধর্মত্যাগীদের বাধ্যতা। নিজ চোখে দেখতে থাকেন—কীভাবে প্রচণ্ড নিপীড়নের মাঝেও তাৎক্ষণিক ভালোবাসা আর মানবিকতাকে তারা ভুলে থাকতে পারে না; হতাশা নিয়ে খেয়াল করেন, শাসকরা কীভাবে তা-ই কাজে লাগায়। শেষ নির্যাস পর্যন্ত সহানুভূতি নিংড়ে নিয়ে কাজ আদায় করে নেয় তাদের কাছ থেকে।

আমাদের মধ্যে সেই স্নায়বিক আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে অত্যাচারের প্রায় সব দৃশ্য শুধু মিড আর লং শটে নেওয়া—কেবল আতঙ্কিত দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ও হাহাকার ধরা পড়ে ক্লোজ-আপে। এরকম চিত্রায়ন দিয়ে পরিচালক মাসাহিরো শিনোদা আমাদেরকে যেন একরকম ‘নীরব’ দর্শকে সংকুচিত করে ফেলেন।

তবে শারীরিক নির্যাতনের অংশগুলির মতই চিত্রনাট্যের সংলাপময় দৃশ্যগুলিও প্রবলভাবে কার্যকর। সেখানে বৌদ্ধ আর খ্রিস্টধর্মের সহাবস্থানের সম্ভাবনা এবং পরস্পরবিরোধ নিয়ে তর্ক চলে ফাদার রদ্রিগেজ ও জাপানি শাসকদের মাঝে। তাদের প্রত্যেকেরই যুক্তি প্রায় দৃঢ, অবস্থান পরিষ্কার। কিন্তু শাসক-শাসিতের সম্পর্কের মত তার ফলাফলও পূর্বনির্ধারিতই থাকে। আবার কিছু চরিত্র তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েও সংশয় বোধ করে। শেষের দিকের এক দৃশ্যায়নে নির্মাতারা দুইটি চরিত্রের মাঝখানে গৌতম বুদ্ধের একটি মূর্তিকে শিফটের ফোকাসে একটু পর পর স্পষ্ট করেই আবার ঝাপসা করে দেন—তাতে হয়ত ছবির শেষটা কিছুটা বোধগম্য হয়।

শুসাকু এন্দো’র উপন্যাস ‘চিনমোকু’ (সাইলেন্স)।

আর বাইরে সারাক্ষণ পাহাড়ের গায়ে সমুদ্রের পানি আছড়ে পড়ে, তারপরও যেন পাহাড় শুকনাই থেকে যায়। কিন্তু রাতের বেলা সবাই যখন নিশ্চুপ—সবকিছু নীরব—তখনো সাগরের গর্জন থামে না।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)

Leave a Reply