ফিল্মের মাধ্যমে আমি কেবল আপনার ভেতরের মুক্তির ইচ্ছাটুকুকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করি।

জার্মান নিউ ক্লাসিক ‘দি হোয়াইট রিবন’-এর পরিচালক মিখায়েল হানেকের চলচ্চিত্র দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে। ‘ফানি গেইমস’ (১৯৯৭), ‘দি পিয়ানো টিচার’ (২০০১), ‘ক্যাশ’ (২০০৫) ইত্যাদি চলচ্চিত্রসমূহে হানেকে মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং পুরুষতন্ত্রের ত্রুটিসমূহের মুখোশ উন্মোচন করেন। সাক্ষাৎকারে ‘দি হোয়াইট রিবন’ এর পাশাপাশি উঠে এসেছে তার অন্যান্য ছবির কথাও; উঠে এসেছে নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা, ভয় ইত্যাদি সম্পর্কে তার সিনেভাবনা ও দর্শন। জার্মান সাপ্তাহিক দি স্পিগাল-এর অনলাইন সংস্করণ থেকে ২০০৯ সালে গৃহীত এ সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করা হয়েছে।—অনুবাদক

মিখায়েল হানেকের সাক্ষাৎকার (২০০৯)

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফিলিপ এমকি ও লার্স-ওলাভ বায়ার

অনুবাদ: চিংখৈ অঙোম


স্পিগাল

দি হোয়াইট রিবন এর মত শকিং একটা সিনেমার জন্য আপনি কান এর পালমে দোর জিতলেন। হলিউডে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য জার্মানি এখন এমনকি একজন অস্ট্রিয়ান হিসেবেই আপনাকে অস্কারে পাঠাচ্ছে। আমরা আশা করছি অস্কার এর বিচারকরা আপনার এই ছবির নিষ্ঠুরতা হজম করতে পারবে এবং তাদেরকে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে না।

মিখায়েল হানেকে

নিষ্ঠুরতা?! আমার এই ফিল্ম অসাধারণ একটা ভালোবাসার গল্প বলে, এবং একদমই নিষ্ঠুর নয় সেটা। এই ছবির অনেকগুলি মুহূর্তই ভালোবাসায় ভরা। কিন্তু আমার ব্যাপারে সবার একটা স্টেরিওটাইপ ধারণা যে আমি শুধু আমাদের ভেতরের অন্ধকার অংশগুলির গল্পই বলি। আসলে আমি মানুষকে অনেক ভালোবাসি, কিন্তু সবার ভালোবাসা পাওয়ার মত সবচাইতে যোগ্যতম মানুষটিরও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে সে সারাজীবন একই রকম থাকবে। আমরা যে কেউ অপ্রত্যাশিত যে কোনো কিছুই করে ফেলতে পারি। জাস্ট সে রকম উপযুক্ত কোনো পরিস্থিতিতে থাকলেই হয়।

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

স্পিগাল

দি হোয়াইট রিবন একটা জার্মান গ্রামের গল্প, ১৯১৩-১৪ সাল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কাল, যেখানে রহস্যময়ভাবে সহিংস কাণ্ডকারখানা ঘটতে থাকে। গ্রামের মানবসম্পর্ক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, এমন একটা সিচুয়েশন। এখানে কোনো নায়ক নেই, কোনো নির্বাণ নেই। মানবতা সম্বন্ধে এমনই নেগেটিভ ধারণা আপনার?

হানেকে

মানবতা সম্পর্কে আমার ধারণা মোটেই নেগেটিভ না। তবে আমরা যে দুনিয়ায় বাস করি সেটাতে বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্যেরই আধিপত্য। আর ড্রামার উদ্দেশ্যই দ্বন্দ্ব দেখানো, এটা আমার বিশ্বাস, এবং আমি এই ব্যাপারটাকে খুব সিরিয়াসলি দেখি।

উপন্যাসের লেখকদের মত একক শৈল্পিক ক্ষমতাঅলা সিনেমা পরিচালকদের বলা হয় অঁতর। ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঁতরদের একজন মিখায়েল হানেকে। হানেকের জন্ম ১৯৪২ সালে, অস্ট্রিয়ায়। ১৯৮৯ সালে প্রথম চলচ্চিত্র ‘দি সেভেন্থ কনটিনেন্ট’ নির্মাণের আগে তিনি টেলিভিশন এডিটর এবং থিয়েটার ও টিভি পরিচালক হিসেবে প্রায় দুই দশক কাজ করেন। ২০০৯ সালে ‘দি হোয়াইট রিবন’ এবং ২০১২ সালে ‘আমোর’ ছবির জন্য তিনি কান এর পালমে দোর পুরস্কার লাভ করেন; সেই সময় পর্যন্ত তিনি মাত্র সপ্তম পরিচালক যিনি দ্বিতীয়বার এই পুরস্কার লাভ করেন। সিনেমা বানানোর পাশাপাশি হানেকে ফিল্ম একাডেমি ভিয়েনা নামক ফিল্মস্কুলে চলচ্চিত্র পরিচালনা শেখান। – লেখক

স্পিগাল

আপনার সিনেমার পুরুষগুলো ডিস্টার্বড—অসৎ, নিষ্ঠুর আর দুর্বল। শৈশবে আপনি বাবাকে পান নি, আপনি বড় হয়েছেন আপনার মা, দাদি আর আন্টির কাছে।

হানেকে

বাবার অভাব আমি কোনোদিনই ফিল করি নি আসলে। উল্টো, ছোটোবেলা থেকেই পুরুষ জাতিকে আমার ঝামেলার মনে হতো। ফলে আমি যখন ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করা শুরু করি, অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় আমাকে। পুরুষ অভিনেতাদেরকে ডিল করতে আমার ঘাম ঝরত, ঝগড়া-হাঙ্গামা লেগেই থাকত।

স্পিগাল

এইজন্যই কি আপনার সিনেমায় নারীর আধিক্য?

হানেকে

এইটা সরলীকরণ, একটা আর্টকে তার আর্টিস্টের সাইকোলজি দিয়ে বিচার করার মত। যেমন, হানেকের মাথায় গণ্ডগোল আছে, সো তার ফিল্মকে গুরুত্ব দেয়ার দরকার নেই। এভাবে ভেবে দর্শক আসলে সিনেমার ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জটাকে মোকাবেলা না করে পালায়। যদিও আমি এটা শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তবুও বলি, পাবলিক বেশিরভাগ এরকম ভাবে, লাইক “হানেকে কী রকম মানুষ, যে এই রকম ফিল্ম বানায়?”

স্পিগাল

খুবই যুক্তিসংগত প্রশ্ন। হোয়াইট রিবনে তো বাচ্চাগুলো পর্যন্ত কী ভয়ঙ্কর রকমের ঠাণ্ডা মাথার নিষ্ঠুর।

হানেকে

বাচ্চারা নিষ্পাপ এটা আমি বিশ্বাস করি না। ইন ফ্যাক্ট, কেউই এটা সিরিয়াসলি বিশ্বাস করে না। বাচ্চারা যখন স্যান্ডবক্সে বালিঘর বানিয়ে খেলে, তাদের সাইকোলজি খেয়াল করবেন! বাচ্চাদের ব্যাপারে যে রোমান্টিক একটা ধারণা, সেটা আসলে তাদের বাবা-মায়ের ইচ্ছার একটা প্রতিফলন কেবল।

স্পিগাল

কিন্তু মানব সভ্যতার ভিত্তি যে ফ্যামিলি, আপনার সিনেমায় সেই ফ্যামিলিকেও আপনি কতগুলো বোবা বোবা নিষ্ঠুর জোম্বি-ভূতের যৌথতা হিসেবে দেখান। এটা কীভাবে আসলো?

হানেকে

আমার সাইকোলজিতে আবার উঁকি মারার আগে বলি শোনেন, আমার তিন-নারীর ফ্যামিলি নিয়ে আমি বেশ খুশি ছিলাম। কিন্তু বাচ্চা থাকতেই আমি মানুষে মানুষে যোগাযোগহীনতার সংকটটা ধরে ফেলি। আমি বলি নীল, আপনি শোনেন সবুজ, কারণ আপনার সেন্সরগুলা অন্যভাবে সেটআপ করা। এটা এমনকি কখনও কখনও ইন্টারভিউয়েও হয়, রাইট? সবারই এই অভিজ্ঞতা হয়, আর সেটার শুরু ফ্যামিলি থেকেই।

স্পিগাল

কঠোর প্রটেস্ট্যান্ট শাসনে বেড়ে ওঠা শিশুরা পরবর্তীতে অথরিটির দাস হিসেবে বেড়ে ওঠে, আপনার ফিল্মে আপনি এমনই দেখিয়েছেন।

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

হানেকে

ঠিক তাই, এই শিশুগুলিকে আদেশ পালনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে। অথরিটিকে মেনে নিতেই হবে, দাঁত কামড়ে সহ্য করে হলেও। এডুকেশনের অর্থ সবসময়ই ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বশ করে নেয়া যাতে করে সে সমাজের প্রতিবাদহীন নীরব অংশ হয়ে যায়। সিনেমার বাচ্চাগুলি তাদের বাবা-মার সন্তান লালনপালনের ধারণা এবং পদ্ধতিটাকে ধ্রুবজ্ঞানে পরিণত করে, যদিও সেটা তাদের কোনো খুশি বা আনন্দ দেয় না।

স্পিগাল

এবং ২০ বছর পরে যখন এই শিশুগুলি বড় হয়, তখন তারাই হয়ে ওঠে জার্মান ফ্যাসিবাদের ভিত্তি। এ রকম ইঙ্গিতই কি দিতে চান নি?

হানেকে

চাইলে সেভাবে দেখতেই পারেন। গ্রামটার নাম যে ইচওয়াল্ড, এটা কোনো কাকতাল না। যখন নিয়মের কঠোরতা তার চূড়ায় পৌঁছায় আর যখন একটা আইডিয়া আইডিয়োলজিতে পরিণত হয়, তখন সেটা—যারা সেই আইডিয়োলজি মানে না—তাদের জন্য ভয়ঙ্কর একটা জিনিস হয়ে ওঠে। সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বীজ কীভাবে বপণ করা হয়, জার্মান ফ্যাসিবাদকে একটা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে এই ফিল্ম সেটাই দেখিয়েছে; সেই সন্ত্রাসবাদ ডান কিংবা বাম যে কোনো পন্থা থেকেই আসুক, কিংবা সেটা ধর্মীয় বা পলিটিক্যালি যে কোনো ভাবেই মোটিভেটেড হোক। পাবলিক যখনই অসহায়, অখুশি এবং লাঞ্ছিত, তাদের হাতে আপনি যে খড়কুটাই দিবেন অস্তিত্বের জন্য তারা সেটাই আঁকড়ে ধরবে।

স্পিগাল

আপনার সিনেমা এই সংকটগুলির কোনো সমাধানও তো দেয় না। দর্শকদের আপনি একটা নৈরাশ্যের পরিণতিতে ঠেলে দিয়ে ভাগেন।

হানেকে

এটা আপনার ব্যক্তিগত অভিমত বা আবেগ। আবেগের সামনে সব যুক্তিই খোঁড়া। কিন্তু সব ইন্টারপ্রিটেশনও এক একটা আলাদা সত্য, কারণ সেটা গ্রহীতার চেতনায় সত্য—যেমন এই ক্ষেত্রে এটা আপনার চেতনায় সত্য। সো, এভাবে ভাবলে, এই ফিল্মে আপনিও কন্ট্রিবিউট করলেন।

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

স্পিগাল

এটা দাবির মত শোনালো।

হানেকে

কিন্তু দর্শক হিসেবে আপনার আর কোনো পথ খোলা নেই। তাবৎ দুনিয়ার সব ফিল্মেই আপনার অংশগ্রহণ আছে, এমনকি যে ফিল্মগুলি আপনার প্রিজুডিসগুলিকে আরো পাকাপোক্ত করে, সেগুলিতেও। ফিল্মের মাধ্যমে আমি কেবল আপনার ভেতরের মুক্তির ইচ্ছাটুকুকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করি। তবে আপনি চাইলে আমার ফিল্মের মাঝপথেই হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই। ফানি গেইমস এর আমেরিকান ভার্সনের প্রদর্শনী চলাকালীন সময়ে তো…

স্পিগাল

 

ফানি গেইমস (২০০৭)

…যেখানে ধর্ষকামী দুই তরুণ এক পরিবারকে নৃশংসভাবে অত্যাচার করে…

হানেকে

…অনেকেই ওয়াকআউট করে। আমি বুঝতে পারি আমার ফিল্ম সফল, কারণ সহিংসতার এক ধরনের নির্দিষ্ট রুচিতে অভ্যস্ত ভোক্তাদের মজাটা আমি নষ্ট করতে পেরেছি।

স্পিগাল

দর্শক হল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেই আপনি সেটাকে সঙ্গত বা আপনার সাফল্য ভাবেন? আপনার দর্শকদের প্রতি এটা তো অদ্ভুত বিচার।

হানেকে

ফানি গেইমস এর বিষয়টা একটু আলাদা। এটা কষে একটা চড় বসানোর জন্যই বানানো হয়েছিল।

স্পিগাল

আমরা মুভি দেখতে যাব কেন তাহলে, গালে এরকম একটা চড় খাওয়ার জন্য?

হানেকে

এটা একটা অস্বস্তি মাত্র! একটা চড় মানে দর্শককে চমকে দেয়া, যেন হঠাৎ করে সে সবকিছুকে একটু অন্য চোখে দেখা শুরু করে। আর তা না হলে সে তার প্রত্যাশায় অনড় থাকবে। এবং সেটা পূর্ণ না হওয়ায় হতাশ হবে এবং ওয়াকআউট করবে। আপনি যদি অস্বস্তিতে পড়তে না চান, তাহলে মূলধারার চলচ্চিত্র দেখতে পারেন।

স্পিগাল

যদি বলি মুভি থিয়েটার থেকে আমরা অস্বস্তি বোধ করে বাড়ি ফিরতে চাই না।

হানেকে

আমার বিশ্বাস ড্রামার উদ্দেশ্য কাউকে স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে দেয়া নয়। এটা কখনই এমন ছিল না, এমনকি সেই গ্রিক ট্র্যাজেডির সময় থেকেও না। প্রত্যেকটা সিনেমাই আসলে ম্যানিপ্যুলেটিভ, এবং তার দর্শককে ধর্ষণ করে। সো, প্রশ্নটা এমন: আমি কেন আমার দর্শককে ধর্ষণ করি? আমার ক্ষেত্রে, আমি তাকে আরো চিন্তার খোরাক জোগানোর জন্য ধর্ষণ করতে চেষ্টা করি, যেন সে চিন্তার দিক থেকে মুক্ত হয় এবং ম্যানিপ্যুলেশনের এই খেলায় তার রোলটুকু ধরতে পারে। তার বুদ্ধিমত্তায় আমার ভরসা আছে। একটা আদর্শ ফিল্ম আসলে হওয়া উচিত স্কি জাম্প এর মত। ওড়ার সুযোগটুকু তার করে দেয়া উচিত, এবং তার উচিত ঝাঁপ দেয়ার সিদ্ধান্তটা পুরোপুরিই তার দর্শকের উপর ছেড়ে দেয়া।

স্পিগাল

আপনার বেশিরভাগ সিনেমাতেই কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে না। মানে, গল্পের এইটা কে করল টাইপ প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। শেষপর্যন্ত আমরা একটা অমীমাংসিত গোলকধাঁধায় আটকা পড়ি। তো আর্ট যদি কিছু না করে কেবল গোলকধাঁধা পয়দা করে…

হানেকে

…তাহলে বলব আপনি সবকিছু খুব সহজেই পেতে চান। এই ফিল্মগুলোতে যা যা ঘটে তার সবকিছুরই একটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা অবশ্যই আছে। এখন সেটা কী কী, সেটা বলতে বললে তো আর…

স্পিগাল

তাহলে আপনি উত্তরগুলি জানেন বলছেন?

হানেকে

অফকোর্স জানি। কিন্তু উত্তরগুলো জেনে আপনার কী লাভ হবে? যদি আমার কথা বলেন, দর্শক হিসেবে আমি সহজ সমাধানগুলোর চাকচিক্যে ধোঁকা খেতে চাই না। আমি জানি এগুলি আসল সমাধান না। দুনিয়া অত সোজা না। সত্যি কথা বলতে কী, বইপত্র আর সিনেমা থেকে আমার মনে গেঁথে আছে এবং থাকে আসলে শুধু সেগুলি যেগুলি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল।

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

স্পিগাল

মানে ধরুন, শুধু রোগ নির্ণয় করাটুকুই কি যথেষ্ট আর্টের জন্য?

হানেকে

এই করাটাই তো অনেক করা। আমার ফিল্মগুলি আসলে একটা রিঅ্যাকশান। যে ছবিগুলো অলরেডি আছে সেগুলির। আর মূলধারার ছবিওয়ালারা সব গর্দভ, আমি সেটা বলছি না। আমি যে অন্ধকার খাদগুলি দেখি, তারাও সেগুলি দেখে, কিন্তু তারা সেগুলি ইচ্ছে করেই ইগনোর করে, কারণ এগুলি দেখিয়ে ঝামেলা করতে চায় না তারা। প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে সমর্থন করে যে ছবিগুলি সেগুলির বিক্রি ভালো, দর্শক সেগুলি ভালো খায়।

স্পিগাল

তাই! হালের কমার্শিয়াল হরর ফিল্মগুলিও তো অস্বস্তিকর আর ডিস্টার্বিং দৃশ্যে ভরা। এবং শয়তানগুলি সিনেমা শেষে বেঁচেও থাকে, যাতে পরের পর্ব বানানো যায়।

হানেকে

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

কিন্তু সেটা আলাদা। এই ছবিগুলো সহিংসতা, মানে ভায়োলেন্সকে অবাস্তব করে দেখায়, ফলে সেটা ভোগ্য হয়, লোকে খেতে পারে। এটা ধরুন, ঘোস্ট ট্রেন বা ভূতের ট্রেনে চড়ার মত। আমি আরাম করে নিজেকে ভয় পেতে দিচ্ছি, কিন্তু আমি জানি যে আমার কিচ্ছু হবে না। আমার মনে আছে যখন কুয়েনটিন টারানটিনোর পাল্প ফিকশন বের হয়, আমি ইয়াং পোলাপাইনে ভরা একটা ম্যাটিনি শোতে বসে ছিলাম। একটা ছেলের খুলি উড়িয়ে দেয়ার সেই বিখ্যাত দৃশ্যটা থিয়েটারের দর্শকদের মধ্যে তুমুল শোরগোল সৃষ্টি করে। তাদের কাছে সেইটা জোস্ একটা ব্যাপার লেগেছিল আর হাসতে হাসতে তাদের প্রায় মরে যায় যায় অবস্থা হয়েছিল।

স্পিগাল

আর আপনার?

হানেকে

আমার মন খারাপ হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে এটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। আমি ভায়োলেন্স সইতে পারি না। যে কোনো ধরনের ফিজিকাল ভায়োলেন্সে আমার অ্যালার্জি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। তো এটাকে কনজিউমেবল করে এভাবে পরিবেশন করাটা অন্যায়। মানে এই যে এটাকে সবার হাসির একটা ব্যাপার বানিয়ে খাওয়ানো।

স্পিগাল

 এটা আপনার মুখ থেকে শুনছি! আপনার ফিল্মগুলিও তো সহিংসতায় ভরা।

হানেকে

কিন্তু কখনোই সেটা দেখানো হয় না, এবং কখনোই সেটা আকর্ষণের মূল হয় না। এটা বীভৎস একটা ব্যাপার আসলে। বরং দর্শকের কল্পনা নিয়ে খেলাটা বেশি কঠিন আর বুদ্ধিবৃত্তিক লাগে আমার কাছে। দর্শকের এই ফ্যান্টাসি দৃশ্যমান যে কোনো দৃশ্যের চাইতে সবসময়ই বেশি পাওয়ারফুল। কাঠের মেঝে শব্দ করে ভাঙতে থাকাটা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যমান কোনো ভূতের চাইতে বেশি ভয়ঙ্কর।

স্পিগাল

অন্যভাবে বললে, যদি আমরা মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ থাকতাম এবং যদি আমাদের মনে কোনো ভয় না থাকত…

হানেকে

…তাহলে ওই মানুষটার সাথে যে কোনো ভাবেই হোক দেখা করতে চাইতাম আমি…

স্পিগাল

 …তাহলে কি আমরা আপনার সিনেমা নিঃসঙ্কোচে দেখতে পারতাম কারণ আপনি যেই ভয় ইশারা করছেন সেটা আমাদের মাঝে প্রকাশিত হতো না?

হানেকে

আপনি যে মানুষগুলোর কথা বলছেন বাস্তবে আসলে এ রকম কারও অস্তিত্ব নেই। আমি বিশ্বাস করি যে আমরা সবাই ভয়ের মোহে আচ্ছন্ন। মানুষের অস্তিত্বের একটা মৌলিক শর্ত এটা।

স্পিগাল

আপনার ভয়গুলি কী কী?

হানেকে

নির্দিষ্ট করে বললে সেগুলির কোনোটাই মৌলিক না। অসুস্থতার ভয়, ব্যথার ভয়। প্রিয় কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয়। মৃত্যুভয়।

স্পিগাল

তো মানুষের যদি অলরেডি এতগুলি ভয় থাকে পাওয়ার মত, সিনেমার কি তাদেরকে আরো কিছু অপশন হাতে ধরিয়ে দিতেই হবে?

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯)

হানেকে

শুনুন, পিয়ের পাওলো পাসোলিনির সালো, অর দি ১২০ ডেইজ অফ সডোম, যেটা ফ্যাসিস্ট ইতালির যৌন অবদমিত পিপলের গল্প, এটা আমাকে এমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিল যে আমি দুই সপ্তাহ অসুস্থ ছিলাম। পুরোই বিধ্বস্ত। আজ পর্যন্ত এটা দ্বিতীয়বার দেখার মত সাহস করে উঠতে পারি নি। এ রকম ভয় আর জীবনেও পাই নি আমি। এবং এ রকম এত গভীরভাবেও কখনো উপলব্ধি করি নি।

স্পিগাল

আপাতদৃষ্টিতে আধুনিক মধ্যবিত্ত সমাজেও তো এ রকম ভয় পাইয়ে দেয়ার মত শূন্যতা অনেক, যেখানে আপনি বারবার ফিরে গেছেন গল্পের রসদ খুঁজতে।

হানেকে

এটাই সবচেয়ে ভালো জানি আমি। নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি এই গল্পগুলি। তাছাড়া আমার ছবির দর্শকেরাও মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই, ফলে তাদের জন্যও এটা সহজ হয়। মানে আমার ফিল্মের চরিত্রগুলিকে আইডেন্টিফাই করাটা।

স্পিগাল

আমার মনে হয় না ব্যাপারটা অত সোজা, কারণ আপনার সিনেমার চরিত্রগুলি খুবই প্যাথেটিক। মধ্যবিত্তকে এত সাফার কেন করান আপনি? আপনার এক ছবিতে এক পরিবারের সবাই একসাথে সুইসাইড করে, আরেকটাতে খুন হয়। আর যখন আপনি কোনো সুখী মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি দেখান, শেষমেশ দেখা যায় তারাও একটা আতঙ্কের মধ্যেই থাকে, যেমন “ক্যাশ”-এ।

হানেকে

আমরা আসলে আমাদের সম্পদপ্রাচুর্য রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদেরকেই একটা জেলে পুরে রাখি। ‘ফানি গেইমস’-এর মূল চরিত্রগুলি যেমন তাদের নিজেদের দুনিয়ারই এক একজন কয়েদি। চোর-ডাকাতের হাত থেকে নিজেদের বিত্ত-বৈভব বাঁচানোর জন্য যে নিরাপত্তা দেয়াল গড়ে তোলে, শেষমেশ দেখা গেল সেই দেয়ালেই বন্দি তারা।

স্পিগাল

আপনার মধ্যবিত্ত সত্তা নিয়ে আপনি কি নাখোশ তাহলে? তেমনই শোনাচ্ছে কিন্তু!

কান উৎসব ২০০৯-এ সিনেমার প্রিমিয়ারে শিল্পী ও কুলাকুশলীদের সাথে মিখায়েল হানেকে

হানেকে

না না! এরকম সুবিধা অবঞ্চিত ভাবে বেড়ে উঠতে পারাটা সৌভাগ্যের। আমার সেই কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আমরা এরকম প্রচুর মানুষকে দেখি যারা তৃতীয় বিশ্ব থেকে এসেছে এবং তারা আমাদের মত হতে চাচ্ছে। আমরা কিন্তু তাদেরকে ঠেকাতে চাই। আমরা আসলে নিজেদের ভাগ কমাতে চাই না। বা তাতে ভয় পাই। আর ভয়টাই তো খুব দ্রুত সহিংসতার দিকে পা বাড়ায়। ‘ক্যাশ’-এর একটা চরিত্র বলে: “আমরা যা যা করি সেগুলি নিয়ে ভাবো যাতে কোনো কিছুই হারাতে হয় না আমাদের।” আমাদের সোসাইটির প্রেক্ষিতে এটা খুব ইমপোর্টেন্ট একটা কথা।

স্পিগাল

তো আপনি কি খুব ভালো? কিংবা অন্তত একটু আলাদা?

হানেকে

না। আর সবার মত আমি নিজেও আসলে খুব ভীতু আর আত্মকেন্দ্রিক। ধরেন, কোনো ইমিগ্রেন্ট যদি আমার দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, আমার তো অনেক খালি রুম, সে আমার এখানে থাকতে পারবে কি না। আমি কি তাকে থাকতে দিব মনে হয়? না। আমি তো মহাপুরুষ নই। আমার ফিল্মে আমি একধরনের স্কেপটিসিজম চর্চা করি আসলে—অপর মানুষের ব্যাপারে, আমার নিজের ব্যাপারে।

স্পিগাল

ইন্টারভিউ এর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

দি হোয়াইট রিবন (২০০৯) ছবির অফিসিয়াল ট্রেলার – ইউটিউব ভিডিও