শেয়ার করুন!

মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট থিকা নৌকা দিয়া দক্ষিণ-পূর্বে একটু আগায়া গেলে বেড়িবাধ। এই বেড়িবাধ ঘেইষা ধলেশ্বরীর একটা ছোট্ট শাখা ঢুইকা গেছে দক্ষিণে।

সেইখানে ধলেশ্বরীর তীরে ফরাজিবাড়ি ঘাটলা। ইচ্ছা করলে ঘাটলা থিকা নৌকা নিয়া ঘুরাফিরা করা যায়। নৌকায় না যাইতে চাইলে লঞ্চঘাটে নাইমা যে কোনো রিকশাওয়ালারে বললেই হইব… ফরাজিবাড়ি ঘটলার কথা। সেই ঘটলা থিকা নৌকা নিয়া একটু আগায়া গেলে বাইদ্যাগো সারি সারি নৌকা। ধলেশ্বরীর জলের উপরে বাইদ্যাগো সংসার।

নদীর এই পাড়ে উত্তর ইসলামপুর আর ওই পাড়ে মোল্লাপাড়া।

সরু নদীটার দুইপাড়ে বাইদ্যাগো নানান রকমের নৌকার বহর। নৌকার পাটাতনে মাটির চুলার আগুনের ছায়া গিয়া পড়ে পানিতে। দূর থিকা বাইদ্যানিগো শরীর সাপের মত চিক চিক করে। বাইদ্যাগো ছয়/সাত বছরের মাইয়াগুলি তরতরায়া নৌকা বায়। আট/নয় মাস বয়সী বাচ্চারে নৌকার ভিতরে হাপুড় পারতে দিয়া মা-খালারা চুলে বিলি দেয়। কেউ কেউ আবার ছোট ছোট বাচ্চাগুলিরে চিকন দড়ি দিয়া নৌকার ভিতর বাইন্ধা রাইখা হাতের কাজ সারে।

বিকালের দিকে বাইদ্যানিরা রান্ধা চড়ায়, এক নৌকা থিকা আরেক নৌকায় গিয়া পাড়া বেড়ায়। এই সময় বাইদ্যাগো খুব কমই চোখে পড়ে। দুইএকজন অবশ্য থাকে। বাইদ্যারা ওই সময় পোলাপাইন সঙ্গে নিয়া নৌকা কইরা ঘুরে। এক বাইদ্যারে দেখলাম… নৌকা বাইতে বাইতে গান আর ছড়া কইতাছে আর তার পোলা (বয়স চাইর হইব) বালিশে মাথা রাইখা উদাস হয়া শুনতেছে।

আমি আগে ভাবতাম, বাইদ্যানি মানে… চওড়া কোমারে বিছা, হাতে বাজু, নাকে নোলক-নথ, পায়ে মল আর চূড়ায় বান্ধা খোপা। কিন্তু বাইদ্যা বাড়ির দৃশ্য আরেক রকম। ওরা কয়, একমাত্র কাজে বাইর হইলেই এই রকম পোশাক পরে। এমনে নৌকায় তারা সেলোয়ার-কামিজই বেশি পরে।

বাইদ্যারা খালি সাপ পালে… এইটা সত্য না। তাগো নৌকার গলুইয়ে চন্দনা পাখির খাঁচা দেখছি। জয়নাল নামে এক বাইদ্যা আবার দুইটা কুত্তা পালে, সেই কুত্তা পানিতে বইসা বইসা মাছের খেলা দেখে।

বাইদ্যা পাড়ায় ঢুকলে, বেশিরভাগ বাইদ্যানি বিরক্ত হয়, কথা কইতে চায় না। বাইদ্যারা আবার উল্টা, এরা আবার খুব খোশালাপী । তবে, দুই একজন বাইদ্যানির সাথে আমার খুব খাতির, তারা আমার বাসা পর্যন্ত চিনে।

মতি নামে এক বাইদ্যানি আমারে কয়… “দিদি, তুমি আমগো এইহানে আইয়া থাকো, তুমি ডাঙ্গার মেয়ালোক না। মনে মনে তুমিও বাইদ্যানি।”

আমার মতই যারা জলের টানে নৌকা নিয়া বাইর হইয়া যান, তারা এইখানে আইসা ঘুইরা যাইতে পারেন। কিন্তু সন্ধ্যার পরে সাধারণ মাঝিরা বাইদ্যাপাড়ার দিকে যাইতে চায় না। এইটা খেয়াল রাইখা ঘুরনের সময়টা ঠিক রাখবেন। মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট থিকা নৌকা নিয়া গেলে ঘণ্টায় নিব একশো টাকা। এক ঘণ্টাতেই গিয়া আবার ফেরত আসা যায়। বেড়িবাধ বা ফরাজিবাড়ি ঘাটলা থিকাও অহরহ নৌকা ছাড়ে।

বাপে পুতেরে গল্প শোনায়, পোলা বড়ই উদাস।

বউ -শালী লইয়া এক বাইদ্যা।

এক নৌকা থিকা অন্য নৌকায় পাড়া বেড়ানি।

বাইদ্যাগো ছোট ছোট পোলাপান তরতরাইয়া নৌকা বায়।

নানা কারুকাজের নৌকা।

বাইদ্যার পালা কুকুর, মাছের দিকে খালি চাইয়া থাকে।

সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত ঐখানেই বসা, মাঝে-মইধ্যে ভাল্লুকের মতো থাবা মারে।

বাহারী ছাউনি।

বাইদ্যার বউ ভাত বাইড়া দিতেছে।

নৌকার কোনায় একা শিশু।

রান্দাবাড়া, পাটাতনে মাটির চুলায় আগুন।

কিশোরী বাইদ্যানি, মায় সমানে বকতাছে।

ইনারে সবে আম্মা ডাকে, বাইদ্যানিগো মইধ্যে উনি সবচে সাহসী।

সারি সারি নৌকা বান্ধা।

নৌকায় পর্দা দিয়া বিকালে আরামের ঘুম।

নৌকায় বইসা আলাপ সালাপ।

বাইদ্যা পাড়ায় ছুটা সাপ।

ধলেশ্বরীর বাঁকে বাইদ্যার নৌকা।

গোসলের আনন্দ।

অবসরে বইসা চুলে বিলি।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here