মোল্লা ওমরের মৃত্যুরহস্য

আফগানিস্তানের তালেবান নেতা চূড়ান্তভাবে মরার আগে মোল্লা ওমর বেশ কয়েকবার খবরে মরেছেন। প্রথম ২০০১ সালে তার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। তবে এরপরও তাকে আফগানিস্তানের বিভিন্ন মসজিদে নামাজ পড়তে দেখে বিশ্ব বুঝতে পারে ওমর বেঁচে আছেন।

মোটামুটি সেই সময় থেকে ওমর দেখা দেন নি খুব একটা। তিনি বেঁচে আছেন না মরে গেছেন তা জানার উপায় ছিল না। তার ঘনিষ্ঠদের বরাতে জানা যায়, ওমর খুব বেশি মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন না। তার ছবি তুলতে দিতেন না। এমনকি তার শরীরের অবস্থা জানাও দলটিতে নিষিদ্ধ ছিল।

salahuddins1

সেই ওমর অবশেষে মারা গেলেন। তাও প্রায় তিন বছর পর জানা গেল সেই খবর।

কীভাবে মরলেন তিনি, কোথায় মরলেন, এত পরে কেন তা জানা গেল এবং এরপর কী হবে তালেবানের—এমন প্রশ্ন উঠছে চারিদিকে।

সারাদিন জঙ্গীবাদের ভয়ে ভীত বাংলাদেশের প্রশাসন অথবা বুদ্ধিজীবী বা নাগরিকরা এ নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে আমি জানতে পারি নি। তবে ওমর পরবর্তী তালেবান দুনিয়া এবং আগ্রাসী আইএস-এর রাজনীতি নিয়ে আর সব দেশেই কমবেশি লেখালেখি হয়েছে।

আফগানিস্তানে নতুন সরকারের নেতৃত্বে বসেছেন মোহাম্মদ আশরাফ ঘানি। হামিদ কারজাইয়ের দীর্ঘ শাসনের পর বহুল আলোচিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আশরাফ ঘানি ক্ষমতায় বসেন। স্বভাবতই তার মূল লক্ষ্য ছিল তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা জোরদার এবং কার্যকর করা। কারজাইয়ের সময়ে যে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছিল।

নির্বাচনেও তালেবানরা বাধা দিতে চেয়েছিল। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সময়ে মোল্লা ওমরের মৃত্যুর খবর প্রচারকে তালেবানরা সঠিক সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

তাদের কথায় যুক্তিও আছে। কারণ তালেবানরা এমন একটি দল যাদের চারপাশেই রয়েছে শত্রু। পৃথিবীর ইতিহাসে তারা নজির সৃষ্টিকারী দল। এত বড় রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে ওঠার পরিকল্পনা তাদের ছিল কিনা কে জানে! তবে যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনের হামলার ঘটনার পর তাদের দায়ী করায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামলা তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে।

অস্ত্র হাতে তালেবান

অস্ত্র হাতে তালেবান

সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনামলেও তারা যুদ্ধ করেছে আগ্রাসী সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে তারা আক্রান্তই হয়েছে বেশি। আক্রমণ করতে সক্ষম হয়েছে নিজ দেশেই বেশি। তাদের ধ্বংসে ক্রমাগত উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাটোসহ বিশ্বের সব সংস্থা। এমন পর্যায়ে দলীয় নেতার মৃত্যুর খবর হুট করে প্রচার করলে তা দলটিকে অনিরাপদ করে তুলবে—এটা স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য যুক্তি।

নেতার মৃত্যুর খবর কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তা তাদের বিচলিত করবে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া তালেবানি আদর্শের কর্মীদের এই খবর বিভ্রান্ত করবে এবং তাদের ভিতর কোন্দলও তৈরি হতে পারে।

কোনও রাজনৈতিক দল এসব বিবেচনা করতেই পারে। বিশেষত যারা আন্ডারগ্রাউন্ডের রাজনীতি করে থাকেন। তালেবানদের অবস্থাও তেমন। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত তারা লড়েছে। যে মার্কিন বাহিনী একসময় তাদের বন্ধু ছিল তারা হয়ে উঠেছে ভয়াবহ শত্রু। এসব বিবেচনায় তারা ওমরের মৃত্যুর খবর গোপন রাখতেই পারে।

যখন আফগান সরকার এবং তালেবানদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে, দলটি তাদের নেতা নির্বাচনে সক্ষম হয়েছে এবং তারা কোন্দল মোটামুটি সামাল দিতে পেরেছে তখন তারা খবরটি প্রকাশ করেছে। এমন একটি সহজ হিসাব-এ বিশ্বাস করা যায়।

যদিও এই খবরের পর পর বিভিন্ন গ্রুপ থেকে নতুন নির্বাচিত নেতা মোল্লা মনসুরের বিরুদ্ধে ওমরকে হত্যার অভিযোগ আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে তালেবানকে ধ্বংস করতে ষড়যন্ত্র করে মোল্লা মনসুর নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আগের তালেবানকে বদলে দিবেন।

mansoor-56

মোল্লা মনসুর

ওমরকে মেরে ফেলার খবর সত্য না হলেও মনসুর যে তালেবানকে বদলে দিবেন তা অনুমান সম্ভব। বাস্তবিক সিরিয়ার আইএস আসার পর আফগানিস্তানের তালেবানদের গুরুত্ব কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ওদের একেবারেই ধ্বংস করে দিয়েছে। কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর উপায় নেই।

পাকিস্তানের তালেবান যদি হামলা করে কোথাও তো আফগান তালেবানরা দেখা গেছে তার নিন্দা করছে। সেখানেও বিরোধ শুরু হয়েছে।

পাক-আফগান সম্মতিও হয়েছে তালেবানদের নির্বংশ করার বিষয়ে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দলটি আগের মতো আর ‘সন্ত্রাস’ করতে পারবে না বলা যায়। সেই হিসেবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই তাদের কৌশল হওয়া বিনে উপায় দেখা যাচ্ছে না। আইএসকে ভালোভাবে মোকাবেলায়ও সরকারগুলি তালেবানদের বসিয়ে দিতে উদগ্রীব। সে জন্য কিছু ছাড়ও হয়ত দিবে বা দিয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে।

ওমর পাকিস্তানে গিয়ে কেন মরলেন এ নিয়েও তৈরি হয়েছে সন্দেহ। এর আগে ওসামা বিন লাদেনও দেশটিতে নিহত হয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তানি দূরভিসন্ধি অনুমান ছাড়া অন্য কিছু বোঝা যায় না।

আফগানিস্তানে স্যাবোটাজ করতেই তারা তালেবান প্রধানকে আশ্রয় দিয়েছে এমনটাই ভাবা হচ্ছে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নওয়াজ শরিফ নেতৃত্বাধীন এলিট পাকিস্তানি শাসকরা কিছুতেই তালেবানদের আর প্রশ্রয় দিবে না। দলটিও লাদেন এবং ওমরকে হারিয়ে অনেকটা এতিম। আইএসও তাদের ভয়ের কারণ।

যদি এমন হয় যে আফগান সরকারের সঙ্গে তাদের কোনও সমঝোতা হলো না তবে দেশটিতে আইএস গজিয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া পাকিস্তানেও আইএসের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিপদ না বাড়ানোর উপায় হিসেবে তারা শান্তিমূলক কর্মকাণ্ডের দিকেই ঝুঁকবে বেশি।

ওমর স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানের একটি হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। তাকে কেউ হত্যা করে নি। তিনি আফগানিস্তানের কান্দাহারে জন্ম নেন। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তার মা তাকে গাধার পিঠে চড়িয়ে কান্দাহারের রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চল পেরিয়ে কাজের জন্য বেরিয়ে যেতেন। গাধার পিঠেই দিন কাটত ওমরের। এরপর বড় হতে হতে যুক্ত হন রাজনৈতিক সংগঠনে। তার একটি চোখ ছিল কানা। তাকে বলা হয় সবচেয়ে রহস্যময় নেতা। তার দর্শন পেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা খুব কম।

ghani-34

কাবুলের বাসভবনে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি ও ফার্স্ট লেডি রুহা ঘানি

মোল্লা ওমরের লুকিয়ে থাকা, মৃত্যুর খবর তিন বছর পর প্রকাশিত হওয়া তালেবানদের রাজনৈতিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের টেক্সট, মিডিয়া, গণসংযোগের অভাব রয়েছে। পশ্চিমা আধিপত্যের মিডিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যে আদর্শিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ-আয়োজন দরকার তা তারা করতে পারে নাই। ফলে নিজের নেতার মৃত্যুর খবরও গোপন রাখতে হয়েছে। কর্মীদেরও তার জানাজায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় নি।

এটা তাদের নিয়ে একটা সমালোচনা। এছাড়া হামলা, রক্তপাতের যে উপায় তারা অবলম্বন করেছে তাও সমালোচনাযোগ্য। তাদের সঙ্গে পশ্চিমা আঁতাতের যে প্রচার তা মোকাবিলায়ও কার্যকর পাল্টা তৎপরতা নেই। এছাড়া এসব সংগঠনের উৎপত্তির সময়ে পশ্চিমা বাহিনীর সহযোগিতা রয়েছে। কোনও এক সময় তাদের সঙ্গে বিরোধিতা তৈরি হলে রক্তপাতের পরিমাণ যায় বেড়ে।

মোল্লা ওমর বলতে গেলে তালেবানি এই রাজনীতির পুরো সময়ের সৈনিক ও নেতা। তার মাথার দাম ধার্য করার পর থেকেই তিনি অনেকটা পালিয়েই বেঁচে ছিলেন। হয়ত কোনওভাবে পাকিস্তানে আশ্রয় পেয়েছিলেন। তবে নিজ দল, রাজনীতি ও কর্মীদের থেকে দূরে থাকার মধ্য দিয়ে তিনি কী প্রতিষ্ঠা করলেন সেই প্রশ্ন থেকে গেল।

তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইসলামি জিহাদি রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো। যা থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব খুব বেশি নয় বলেই তো মনে হচ্ছে।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।

Leave a Reply