page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

রামিন বাহরানির ইকোনমিক থ্রিলার ’99 হোমস’

একটা লোক বসে আছে কমোডের উপর। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। বাম হাতটা নেতিয়ে পড়া। পায়ের কাছে একটা রিভলভার পড়ে আছে মেঝের উপর। রিভলভারের পাশেই মেঝের অল্প অংশ জুড়ে লাল রক্ত। রক্তের স্বচ্ছ আবরণের নিচে মেঝের মোজাইকটা স্পষ্ট হয়ে আছে। গুলিটা নিশ্চয়ই মাথায় লেগেছে, আর হাতটা দেখে বোঝা যাচ্ছে রিভলভারটা ওখানেই ছিল। আত্মহত্যা।

ramin-1

পরিচালক রামিন বাহরানি (জন্ম. ইউএস ১৯৭৫ )

এই দৃশ্যটাই দুয়েক সেকেন্ড দেখিয়ে ক্যামেরা উপরে উঠতে শুরু করে। বাথরুমের আয়না, বেসিন আর টুথব্রাশের সারি দেখতে দেখতে ক্যামেরাটা বামে সরে এসে আটকে যায় মধ্যবয়স্ক এক লোকের মুখে। কমোডে বসে থাকা লাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। স্বাভাবিকভাবেই চোখে বিস্ময়। চেহারায় আতঙ্কের চিহ্ন নেই, বিরক্তি আছে হয়তো।

এভাবেই শুরু পরিচালক রামিন বাহরানি’র নতুন ছবি ‘নাইন্টি নাইন হোমস’। মনে হয় মার্ডার-মিস্ট্রি জাতের কোনও ছবি শুরু হলো। আসলে তা না। হালকা পাতলা খুনখারাবি থাকলেও “নাইন্টি নাইন হোমস” এর কাহিনীটা রিয়েল এস্টেট নিয়ে।

movie-review-logo

অবশ্য রিয়েল এস্টেট শুনলে যেমন কাঠখোট্টা কোট-প্যান্ট পড়া একদল লোকের টাকা-পয়সার কারবারের কথা মনে হয়, ওরকম কিছু নেই এখানে। যা আছে তা একদম পরিচিত—বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে থাকা আমাদের কাছে।

যা বোঝা যাচ্ছে, তাতে পরিচালক বাহরানি তার প্রতিটা চলচ্চিত্রে আমেরিকার না-দেখা সব অংশ দেখানোকে নিজেই নিজের কর্তব্য বানিয়ে ফেলেছেন।

99-homes-7

ছবির পোস্টার

১৯৫০ এর দিকে ইতালীয় নির্মাতারা তাদের ছবিতে শাসিতদের বিবর্ণ জীবন দেখানোর যে রেওয়াজ শুরু করেছিলেন (সবাই সেই ধারাকে বলে ‘নিও-রিয়েলিজম’), তা বাংলার সত্যজিৎ রায়ের হাত ঘুরে ব্রাজিল, ইরান পার করে এতদিনে এসেছে আমেরিকায়।

এ ধারার ছবি হলিউডে আগেও নাকি ছিল, কিন্তু এই শতকেই কিছু নির্মাতা যেন আয়োজন করে ব্যাপারটাকে সবার দৃষ্টিগোচর করা শুরু করেছেন। মধ্যবিত্ত ক’জন মানুষের দিনকে দিন কষ্ট পাওয়াই বলতে গেলে ‘নিও-রিয়েলিজম’ এর কাঠামো। তাই বলে এই কষ্টের সাথে ডিপ্রেশন মেলানোর দরকার নেই, ওটা যার যার ব্যাপার। আর ‘নাইন্টি নাইন হোমস’ প্রথম ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই সেই কাঠামোতে কিছু রঙচঙ মেরে দেয়।

ছবির মূল চরিত্র দু’জন হলো রিয়েল এস্টেট দালাল রিক কার্ভার ও নির্মাণ শ্রমিক ডেনিস ন্যাশ। যারা বাড়ি বন্ধক রেখে ব্যাংক লোন নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করতে পারে না, তাদেরকে উচ্ছেদ করাই রিক কার্ভারের কাজ। সে রোজ সকালে দুই তিনজন পুলিশ নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের ভদ্র ভাষায় বেরিয়ে যেতে বলে।

এরকমই এক সকালে সে পৌঁছে ডেনিসের বাসায়। দশ-বারো বছরের ছেলে ও নিজের মা’কে নিয়ে ডেনিস এই বাড়িটাতে থাকত। প্রথমে টাকার অভাবে লোন নিয়ে পরে চাকরির অভাবে তা চুকাতে না পারায় পৈতৃক বাড়িটা হাতছাড়া হয়ে যায় তার। সামান্য কিছু আসবাব আর মা ও ছেলেকে নিয়ে এক মোটেলে গিয়ে ওঠে সে।

99-hmes-4

99 হোমস (২০১৫) ছবির দৃশ্য

কাজের সন্ধানে বেরোনো ডেনিস ঘটনাচক্রে পরদিনই রিকের দেখা পেয়ে যায়। রিক তাকে কিছু কাজের সুযোগ করে দেয়। নিরুপায় ডেনিস রিকের সাথে ঘুরে ঘুরে প্রথম কয়েকদিন প্লাম্বার আর ইলেক্ট্রিশিয়ান এর কাজ করতে থাকে। ধীরে ধীরে রিকের ব্যবসায়িক ডেরার আরো ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। আইনের ফাঁক কেটে রিকের উপরি কামাই থেকে ভাগও পেতে শুরু করে। একসময় দেখা যায় রিকের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছে ডেনিস, একেবারে ডান হাত। অল্প দিনের মাঝেই ভালো শার্ট-প্যান্ট পরে ডেনিসও ঘুরতে থাকে বাড়ি বাড়ি, শুরু হয় উচ্ছেদ।

লেখায় যতটা বুজরুকি শোনাচ্ছে, দেখতে ততটাই চমকপ্রদ লাগে ব্যাপারটা। ডেনিসের ভাগ্যের এই উপর-নিচ আর এপাশে-ওপাশ দেখিয়েই গল্পের শুরুর ভাগ এগিয়ে যেতে থাকে। আর প্রায় সবসময় চলতে থাকা “দুম-দুম-দুম-দুম” আবহ সঙ্গীত সেই মুহূর্তগুলিকে ঝরঝরে করে। দখলের সময় বেচারা বাড়িওয়ালাদের দিশাহারা অসহায় অবস্থা দেখে ডেনিস বিব্রত হয় ঠিকই—আর এই কারণেই বোধহয় রিকের আশ্রয়ে থেকেও পুরোপুরি রিক হতে পারে না সে।

অন্যদিকে রিক অবশ্য নিজের ঠাণ্ডা উদাসীন চরিত্রকে মেনে নিতে বলে অতীতের কথা শুনিয়ে। কাউকে গৃহহীন করার কোনও ইচ্ছা তার ছিল না, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই নাকি তার কাজের ধরন উল্টে দিয়েছে—আগে মানুষকে বাড়ি বুঝিয়ে দিত, এখন বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া লাগে। আমেরিকাকে দোষও দেয়, আবার নিজের জমজমাট অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য সব মেনেও নিতে হয়। যেন দেশের সাথে বাল্যপ্রেম চলছে।


99 হোমস-এর অফিসিয়াল ট্রেইলার (২০১৫)

অভিনেতা মাইকেল শ্যানন তার কথা বলার ধরন দিয়েই সব গুছিয়ে নেন সবসময়। এখানেও যতবার বড় সাইজের সংলাপ ঝাড়ার সুযোগ এসেছে ততবারই মনোযোগ কেড়েছেন। বিশেষ করে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের বিখ্যাত অংশটুকু এমন দাঁত কিড়মিড়ে বলেছেন যে কোটেশন হিসেবে সাথে সাথে টুকে রাখার ইচ্ছা হয়।

রিক কার্ভারের কর্মব্যস্ততা দিয়ে ঢেকে রাখা অমানুষিক অংশটা ঘৃণার আক্রমণ থেকে বেঁচে যায় শ্যাননের ব্যক্তিত্বের চোটেই। “অ্যান্ড্রু গারফিল্ড” তার ডেনিস ন্যাশকে বরাবরই দ্বিধায় রেখেছেন। কিন্তু দেখার মতো ব্যাপার ছিল মাত্র ত্রিশ বছরের এই অভিনেতা—যিনি কিনা ক’দিন আগেই কলেজপড়ুয়া স্পাইডারম্যান সেজেছিলেন—কত সহজেই একজন বাবার চরিত্রে মানিয়ে গেছেন।

99-homes-1

ছবির দৃশ্য

রামিন বাহরানি তার পরিচালনার শুরুর সময়ে বিখ্যাত সমালোচক রজার ইবার্ট এর প্রশংসা পেয়েছিলেন। তাদের মাঝে বেশ ভালো বন্ধুত্বও হয়েছিল। ২০১৩ সালে ইবার্ট মারা যান। তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই নতুন এই ছবি ইবার্টকে উৎসর্গ করেছেন রামিন। সেই থেকে মনে পড়লো, ইবার্ট সাহেব তার এক লেখায় সাহসিকতার দুইটা ক্ষেত্র নিয়ে আলাপ করেছিলেন। একজন মানুষের নিজের জায়গা থেকে সব সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে সর্বোচ্চটুকু করা আর নিজের চারপাশের বাধাগুলিকে অন্যায় ভেবে তা দূর করার চেষ্টা— এই দুই ব্যাপারে দুইরকম সাহসিকতার সুযোগ আসে।

আর তাই এখানে মুখ্য প্রশ্নটা সঠিক ক্ষেত্র বাছাইয়ের। এই ছবিটি থেকেও নিও-রিয়েলিজম, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, ব্যাংকের চালবাজি—এসব সাজগোছ সরিয়ে নিলে ঐ প্রশ্নটাই থেকে যায়।

99-homes-6

ছবির দৃশ্য

কিছু চরিত্রে পেশাদার অভিনেতাদের বদলে সত্যিকার সাধারণ মানুষ দিয়ে অভিনয় করিয়ে নেওয়া নিও-রিয়েলিজমের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায়। এখানেও কয়েকজনকে তাদের বাস্তব জীবনের পেশায় অভিনয় করতে দেখা গেছে—যেমন পুলিশের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তিনি বাস্তবেও পুলিশ হিসেবে বহু মানুষকে বাড়ি থেকে উৎখাত করবার সাক্ষী।

বাড়ির কাজ সারতে বাহরানি নিজেও ২০১২ সালের দিকে ফ্লোরিডায় গিয়ে এরকম ঘটনা ঘটতে দেখে এসেছেন। যদিও তিনি সরাসরি কাউকে প্রতিহত করতে চান না—তার কাছে রিক কার্ভারের অমানবিক দৃঢ়তা আর ডেনিসের আবেগ—দুই দিকেই সমান উপযোগিতা আছে। তিনি কখনো ছবিতে কাউকে দোষের ভারে নির্দিষ্টও করেন না, তাই কার্ভারের মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছায়া থাকলেও নির্দ্বিধায় এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে এই ছবি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে দিয়েছেন।

কে জানে দেখেছেন কি-না, কিন্তু ট্রাম্পের কাছেও ছবিটা ভালোই লাগার কথা।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)