page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

রাস্তা পরিষ্কারে জাপানি এবং মধ্যবিত্ত হীনম্মন্যতার হাঁপানি

বাংলাদেশে রাস্তা পরিষ্কার করছে কয়েকটা জাপানি ছেলেমেয়ে আর বাংলাদেশীরা ছবি তুলতেছেন—এ রকম ছবি নিয়ে সমালোচনায় মুখর ফেসবুক। আমরা অকর্মা, নির্লজ্জ্ব ইত্যাদি বলে নিজেরা নিজেদের ধিক্কার দেয়া চলছে।

এটা একটা খারাপ বিষয়। এনজিও এই রাস্তা পরিষ্কারের কাজের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল বিদেশীদের অধিকতর সভ্য দেখানো। আমরা সেটা মেনে নিলাম।

muradul-islam-logo

এই ক্লিন আপ ঢাকা প্রজেক্ট কোন এনজিও দ্বারা পরিচালিত তা জানা গেল না। তাদের ফেসবুক পেজেও এনজিওর কোনো লিংক নেই বা তথ্য নেই দেখলাম। তাদের ছবির মাধ্যমে ফেসবুক গরম হয়ে উঠল তার স্ক্রীনশট:

clean-up-ss1

এই ছবি একটি অসাধারণ ছবি আমার বিবেচনায়। বিদেশী মেয়েটা করুণভাবে তাকিয়ে আছে, হাতে আবর্জনা আর পিছনে মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছেন কিছু লোক। পাবলিসিটির জন্য এর চেয়ে ভালো ছবি আর কী হতে পারে?

এই ছবি তোলার আইডিয়া যার মাথা থেকে এসেছে তিনি একজন ট্যালেন্ট।

ছবিটা ক্লিন আপ ঢাকা পেজ (Clean Up Dhaka: Non-Profit Organization) থেকে পোস্ট করা হয়। লক্ষ্য করে দেখুন তারা কী লিখে ছবিটা পোস্ট করেছিল। এই করুণ ছবি, মর্মস্পর্শী লেখা ফেসবুকের বাংলাদেশীদের মর্মে আঘাত করেছে।

এই ছবি যা প্রকাশ করে তা হল: “দেখো হে বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত! আমরা বিদেশী লোক তোমাদের সিটি পরিষ্কারে এসেছি। আর তোমাদের ছোটলোকেরা আমাদের সাহায্য না করে ছবি তুলছে। এরা এতই ছোটলোক। তা তোমরা কি ছোটলোক হবে না আমাদের হেল্প করবে? বলো হে মিডলক্লাস!”

এই ছবি এবং লেখা পোস্টের পেছনে তাদের যে উদ্দেশ্য ছিল তা পুরোপুরি সফল হয়েছে। মানুষেরা দলে দলে তাদের শেয়ার দিচ্ছেন আর হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। হীনম্মন্যতা খুব খারাপ জিনিস। মধ্যবিত্ত যেন এর থেকে কখনো বের হতে পারে না।

এই ছবির পর পরই তাদের লাইক বেড়ে গেছে। ডেইলি স্টার পত্রিকার একটা রিপোর্ট থেকে জানা গেল এই জাপানিরা ইউনিভার্সিটি অব জাপানের ছাত্র-ছাত্রী। তারা দুই সপ্তাহের জন্য ঢাকা পরিষ্কার মিশনে এসেছে ‘ক্লিন আপ ঢাকা’ প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। প্রজেক্টের ফাউন্ডার বলেছেন, সামনে আরো বিদেশী আসবেন পরিষ্কার করতে। তারা আসলে মানুষদের উৎসাহিত করছেন ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে।

এই বিদেশীরা প্রথম না। আরো বিভিন্ন সময়ে বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীরা এদেশে এসেছে দেশী-বিদেশী এনজিওর হয়ে কাজ করতে। এসব ভলান্টারি কাজকর্মে তাদেরও লাভ আছে। কর্ম-অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হল এবং ভারি হল সিভি। মাঝে মাঝে দেখা যায় ড্রাগ এডিক্ট পোলাপান তাদের পুনর্বাসনের একটা প্রক্রিয়া হিসেবে এদেশে এসে ভলান্টারি নানা কাজ করে যাচ্ছে। যেমন, এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে আয়ারল্যান্ডের কিছু ছেলেমেয়ে বাংলাদেশের এক গ্রামে স্কুল নির্মাণের কাজ করছে।

Untitled-1

ছবিটা ২০১০ এর শেষের দিকে। গ্রামের নাম এবং এনজিওর নাম ভুলে গেছি।

নিজেদের সভ্য এবং অন্যদের অসভ্য প্রমাণ করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা একটা কলোনিয়াল পলিসি। এভাবেই নিজেদের সভ্য প্রমাণ করে কলোনিয়ালিস্টরা দাস বানিয়ে রেখেছিল এদেশের মানুষদের। এদেশের মানুষেরাও সেটা মেনে নিয়েছিল। এখন দেখা যায় সে দাস মনোবৃত্তির তেমন কোনো পরিবর্তন হয় নাই।

নিজেদের সম্পর্কে আমরা অসচেতন। অবচেতনে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা বিদেশী লোক বিশেষত সাদা চামড়াওয়ালাদের প্রতি।

রাস্তা পরিষ্কার না করা এগুলো আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে। শহর যখন আরো উন্নত হবে, আইন-কানুন হবে, পর্যাপ্ত লোকবল থাকবে, দুর্নীতি কমে যাবে তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের উত্তরপুরুষেরা রাস্তা নোংরা করবে না।

আর ঢাকার মত বড় এবং জনবহুল শহরের আবর্জনা পরিষ্কার করা সহজ কথা না। এর জন্য কার্যকরী প্ল্যান এবং সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রকল্প নেয়া উচিত। ইনজিনিয়ারদের সমন্বয়ে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের কার্যকরী তরিকা বের করে সেটা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। হাতে হাতে একটা বড় শহরের আবর্জনা দূর করা যায় না। এরকম করে আবর্জনা পরিষ্কারের নামে কিছু ছবি তোলা যায়।

clean-dhaka-23

হাসিমুখে পরিচ্ছন্নতা দর্শন।

সিন্ধু সভ্যতা তো আমাদের থেকে বেশি দূরে না। সিন্ধু সভ্যতায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা ছিল অসাধারণ। প্রথম ফ্ল্যাশ টয়লেট সেখানে ছিল। একটা কমন সুয়ারেজ পাইপ ছিল, যেটা আধুনিক শহরে থাকে। সুতরাং, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে এই অঞ্চল একেবারে অনুন্নত ছিল বলা যায় না। সিন্ধু সভ্যতায় সেই প্রাচীনকালে উন্নতমানের স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকতে পারলে ঢাকা উন্নত হলে ঢাকায় উন্নত ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা হবে না কেন?

রাস্তা পরিষ্কারের বিষয়টা এখানে মুখ্য না। মুখ্য হল আমাদের প্রকৃতি। বিভিন্ন বিপর্যয়ে দেখা যায় আমাদের দেশের সাধারণ লোকজন প্রাণ হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন লোকদের বাঁচাতে। এসব আমরা স্বচক্ষে দেখলাম রানা প্লাজা যখন বিধ্বস্ত হল তখন। মানুষ কীভাবে উদ্ধারকাজ চালিয়েছে। সাধারণ মানুষ, ভাঙাচোরা মানুষ। এরা ভবিষ্যতেও কোনো বিপর্যয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে নিজের জীবন তুচ্ছ করে। কোনো ছবি, কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা সিভি ভারি করার জন্য না। এই যারা ছবি তুলছিল এদের মধ্যেই আছেন সেইসব মানুষ। জাতীয় বিপর্যয়ে এভাবে এগিয়ে আসতে আর কোন দেশের লোকদের দেখা গেছে?

clean-678

জাপানিদের ঢাকা পরিষ্কার অভিযান

দেশের গরীবীরে দুর্বলতা মনে করে নিজে উইক হয়ে যাওয়ার কিছু নাই।

গেম অব থ্রোনস দেখেন তো। আমি দেখি না। দুয়েক পর্ব দেখছিলাম। পরে দেখি নাই আর কারণ সব সময় এমন এক জায়গায় গিয়া শেষ হয় যে অন্যগুলো একসাথে দেখার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। এই কারণে এই সিরিয়াল আর দেখা হয় নাই। সিরিয়ালে টাইরন ল্যানিস্টারের একটা কথা ছিল:

“Let me tell you something, Bastard. Never forget what you are, the rest of the world will not. Wear it like armor and it can never be used to hurt you.”

সুতরাং, বিদেশী এনজিওওয়ালাদের মত সভ্য হবার কিছু নাই। অথবা দেশী এনজিও যদি বিদেশীদের ডেকে আনে পাবলিসিটির জন্য তাতেও বিগলিত হওয়ার কিছু নাই।

তারা তাদের মত সভ্য থাকুক। তারা তাদের মত এনজিওবাজি করুক। আমরা আমাদের মত সভ্য থাকি। তাদের সভ্যতা বিলানো দেখে নিজেরে বা নিজেদের অসভ্য ভাবারও কিছু নাই। আমাদের পয়সা থাকলে আমাদের স্কুল-কলেজের পোলাপান সামার ভ্যাকেশনের ছুটিতে গিয়া তাদেরও নানা কিছু শিখাইত। আমাদের ড্রাগ এডিক্ট ছেলে-মেয়েরা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাদের দেশে গিয়া শিখাইত যাত্রাপালা।

About Author

মুরাদুল ইসলাম

জন্ম. জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট। প্রকাশিত বই 'মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী', 'গ্যাডফ্লাই', 'কাফকা ক্লাব', 'রাধারমন এবং কিছু বিভ্রান্তি' ইত্যাদি। ওয়েবসাইট: muradulislam.me