page contents

রুনু খালামণি

শেয়ার করুন!

১.
আমি তখন মাতুয়াইল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ি ক্লাস সেভেনে। পাশেই আরেকটা স্কুল ‘মাতুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’। বহুমুখীর হেডটিচার ছিলেন রুনু খালামণি। অনেকদিন যাবৎ আমরা আর রুনু খালা প্রতিবেশী, তাই ছোট থেকেই যে খালামণি বলতাম স্কুলে উইঠাও খালামণিই বলতাম। আবার আম্মু গার্লসের টিচার হওয়ায়, দ্বিতীয় আরেকটা সম্পর্ক ছিল আমাদের পরিবারের​ সাথে।

বহুমুখী স্কুলটা অনেক পুরাতন। আমার বড় ভাই পড়ছে ওই স্কুলে। এছাড়া বান্ধবীদেরও বলতে শুনছি যে তাদের বাবা-চাচারাও নাকি ওই স্কুলে পড়ছে। প্রথমে​ ওই স্কুলে ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়ত। তাই নাম ছিল বহুমুখী। পরে যখন গার্লস স্কুল হইছে, তখন অনেক মেয়েরা এই স্কুলে ভর্তি হইছে। একসময় অঘোষিত ভাবেই শুধু ছেলে ভর্তি হওয়া শুরু হইল বহুমুখীতে কিন্তু নাম সেই বহুমুখীই থাকল।

জন্মের পর থেকেই​ আমি মাতুয়াইল​ থাকি। পাড়া পরিবর্তন হইছে কিন্তু মাতুয়াইল পরিবর্তন হয় নাই। তবে আমার আর ভাইয়ার জন্মের আগে আব্বু-আম্মু মালিবাগ থাকত, তখন শুধু আপু হইছিল। এখনো যখন মালিবাগ যাই কোনো কাজে, মনে হয় এখানেই কোনো এক কোয়ার্টারে আমার মা-বাবা থাকতেন আমার বড় বোনরে নিয়া।

২.
অনেকদিন এক এলাকায় থাকতে থাকতে রুনু খালামণি সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি এই জানতাম যে, উনি নিঃসন্তান, অনেক আগেই উনার স্বামী মারা গেছেন, কিন্তু বাচ্চা হয় নাই নাকি আগেই জামাই মইরা গেছে তা জানতাম না। এখন তানিয়া আপুদের বাসায় উনি ভাড়া থাকেন। সকালে স্কুলে যান, বিকালে বাসায় আসেন।

তানিয়া আপুদের এই বাড়িটা অনেকটা জায়গা নিয়া করা। কিন্তু এখন এত ভাড়াটিয়া হইছে যে সবসময় হট্টগোল লাগে আর কেমন ঘিঞ্জি মতন।

তানিয়া আপুদের বাসায় অনন‍্যা আর সানজীদারাও ভাড়া থাকত। ওদের সাথে যখন খেলতে যাইতাম কোনো কোনো দিন পর্দার ফাঁক গইলা ঢুইকা পড়তাম রুনু খালার ঘরে। আমরা গেলেই উনি নারিকেলের​ নাড়ু, তক্তি, মিষ্টি খাইতে দিতেন। নিজের সন্তান নাই বইলা আমাদের নাকি অনেক আদর করতেন, এমন বলত অনেকে, আমরাও শুনতে শুনতে তেমনই ভাবতাম। আর আদর করার সুযোগও দিতাম। প্রায় প্রায় তার খোঁজ নিতাম।

রুনু খালা কোথাও যাইতেন না বিশেষ, আত্মীয় স্বজন ছিল না হয়ত তেমন,মাঝে মাঝে শুধু শ্বাশুড়িরে দেখতে যাইতেন। আর এইখানে একা থাকলেও উনার বেশ সম্পত্তি আছে, উনি নাকি একবার কলিগদের নিয়া তার জমিতে ঘুরতেও গেছিলেন। তখন আম্মুও গেছে। আর এইখানে রুনু খালা যেই রুমটায় থাকতেন, সেখানে মোটামুটি ফার্নিচার ভরা থাকলেও রুম বড় তাই বোঝা যাইত না। এইরকম একটা রুমে ওই বিল্ডিংয়েই বাবা-মা’রা তাদের বাচ্চা নিয়া থাকত।

রুনু খালার রুমে একটা অনেক বড় কালো রঙের টেবিল ছিল। ওইখানে বইসাই উনি টেবুলেশনের কাজ করতেন, খাতা দেখতেন। একদিন আমি, সানজীদা আর অনন‍্যা খালামণির বাসায় গেছি, তখন এসএসসির খাতা আনা হইছে। খালামণি আমাদের খাতার প্রথম পৃষ্ঠার​ বৃত্ত ভরাট করতে দিলেন। আমার বৃত্ত ভরাট দেইখা বললেন, “মিলি মনে হয় ওর আম্মুর খাতা ভরাট করতে করতে হাত পাকা বানায় ফেলছে।”

আমার একটু লজ্জা লজ্জা লাগল।

৩.
ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মাত্র কয়েকদিন পাওয়া গেল ঘুরাঘুরির জন্য। তারপর এইটে উঠতেই আব্বু-আম্মু আইনা বসায় দিলেন পড়ার টেবিলে। সামনে জেএসসি পরীক্ষা, জানুয়ারি থেকেই মোটামুটি জেএসসি, জেএসসি শুরু হইয়া গেল। আমিও ধীরে ধীরে পড়াশোনায়​ মানায় নিলাম নিজেরে। আবার সানজীদা, অনন‍্যারাও প্রিপারেশন নিতেছে পরীক্ষার​ জন্য। সবাই বেশ ব‍্যস্ত। তখন পড়াশোনার ব‍্যস্ততায় আমরা খেলতামও না বেশি, রুনু খালামণির বাসায়ও অনেক দিন হইছে যাওয়া হয় নাই।

পরে হঠাৎই​ একদিন মনে হইল রুনু খালারে দেইখা আসি। কিন্তু সানজীদা বলল, “রুনু খালা তো তার বোনের বাসায় গেছে, একটা ছেলে আসছিল, মাথায় চুল নাই, উনি নাকি তার বোনের ছেলে, নিয়া গেছে আজকে দুপুরবেলা।”

আমি বেশ অবাক হইলাম, বললাম, “রুনু খালার বোন আছে?”

সানজীদা বললো, “হুঁ, কিন্তু কেউ জানত না, অনেক দিন পর নাকি রুনু খালারে দেখতে আসছে। এর মাঝে তিনদিন আসছে, একদিন একটা মহিলাও আসছিল, বোন মনে হয় ওইটা।”

শুধু আমিই​ না, সবাই রুনু খালারে এত বছর একা দেখতে দেখতে এত অভ্যস্ত ছিল যে হঠাৎ এই বোনের ছেলের উপস্থিতি সবারই বেশ অবাক লাগল। আর রুনু খালাও ঠিকঠাক বলতেন না তাদের ব‍্যাপারে, তাই অবাক হওয়া ছাড়া কিছু হওয়ারও ছিল না। অনন‍্যার আম্মু নেহা আন্টিকে শুধু বলছিলেন​ যে তারা অর্থাৎ তার বোন আর তার ছেলে নাকি তারে নিয়া তাদের কাছে রাখতে চান।

এরপর একদিন সুযোগ হইছিল রুনু খালার বাসায় যাওয়ার। উনিও বাসায়ই ছিলেন। অনেক দিন পরে সেদিন গেলাম রুনু খালার বাসায়। অনেকক্ষণ গল্প করলাম আর রুনু খালা আপ‍্যায়নও করলেন সেদিন একটু বেশি। আমাদের প্রিপারেশন কেমন হইতেছে তাও জিজ্ঞাসা করলেন।

ওইটাই আমার রুনু খালার বাসায় যাওয়ার শেষ দিন। আর কখনো যাওয়া হয় নাই ওই বাসায়।

এর প্রায় এক সপ্তাহ পর যখন তার বোনের ছেলে আইসা নিয়া গেল, তখন আমরা স্কুলে ক্লাস করতেছি। বাসায় আসার পর শুনলাম রুনু খালাকে নিয়া গেছে আর নিজেরাও দেখলাম, ওই রুম খালি করতেছে একটা টাকমাথা মাঝারি বয়সের ছেলে। রুনু খালারে আগেই পাঠায় দিছে।

৪.
জেএসসি পরীক্ষা নিয়া আব্বু-আম্মুর যে এত বাড়াবাড়ি ছিল, শেষ পর্যন্ত কিন্তু তারা আপুর এনগেজমেন্টের তারিখও পিছাইতে পারল না। আমার পরীক্ষার​ আগে আগেই আপুর কাবিনের তারিখ ঠিক হইল। প্রথম কয়দিন একটু রাগ দেখাইলাম, কিন্তু কাজের ব‍্যস্ততায় তা আব্বু-আম্মুর​ চোখেও​ পড়ল না। আর এরপর কাজিনরা সব আসার পর হৈ-হুল্লোড়ে অনেক আনন্দে কাটল তিন চার দিন। কাবিন যখন পড়ানো হইতেছে ড্রইং রুমে, তখন ওইখানে শুধু বড়রা। ভাইয়া আর অর্ণব ভাইয়া থাকল শুধু ফটোসেশনের জন্য। আর বাকি ছোটরা সব ছাদে চইলা গেছে। আর নেহা আন্টি, মিথিলা আপু, তানিয়া আপু, মেরী আন্টি সবাই আমার রুমে বইসা গল্প করতেছে। আমিও আইসা বসছি ক‍্যামেরা নিয়া, উল্টাপাল্টা ছবি ডিলিট করতেছি। এই সেই বলতে বলতে নেহা আন্টি তখন হঠাৎ বললেন, উনি নাকি গেছিলেন রুনু খালার বাসায়, ঘিঞ্জি এক গলির ভিতর দিয়া যাইতে হয়, বাসাও নাকি আবার পাঁচ তলায়। কোনার দিকে যেই রুমে থাকেন, ওইখানে নাকি ইলেকট্রিসিটিও নাই, তার উপর সন্ধ্যা পর্যন্ত যে ছিল নেহা আন্টি, কেউ বাতিও দিয়া যায় নাই। আর রুনু খালার কোনো মেহমান আসছেন, তারে কিছু আপ‍্যায়ন করা, সেইসবও কিছু নাই​।

এরপর কাবিন শেষ হইলে সবাই যখন চইলা গেছে, আম্মুকে গিয়া জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি রুনু খালামণিকে দাওয়াত দাও নাই?”

আম্মু বললো, “তোর রুনু খালাকে স্কুলে গিয়া দাওয়াত​ দিয়া আসছি। কিন্তু আসলেন না তো। দেখি কালকে সকালে ফোন করবো নে একবার।”

আমার মনে হইলো, রুনু খালার কি ফোন আছে? তার রুমে তো ইলেকট্রিসিটিই নাই!

৫.
এর পরের বছরই​ রুনু খালা রিটায়‍্যারমেন্টে গেলেন আর আমরা জঙ্গলবাড়ির সেই ভাড়া বাসা ছাইড়া নিউ টাউন আবাসিক এলাকায় নিজেদের বাড়িতে উঠলাম। আমি ততদিনে স্কুল শেষ করছি। কিন্তু আম্মু তখনো ওই স্কুলে পড়ায়। আম্মু কবে রিটায়‍্যারমেন্টে যাবে, আমি আর ভাইয়া বইসা বইসা সেই হিসাব করতাম। নতুন বাড়ি থেকে স্কুল বেশ দূরে আর রাস্তাও খারাপ।

৬.
এরপর কলেজে ভর্তি হইছি সামসুল হক খানে, ক্লাসও মোটামুটি শুরু হইয়া গেছে। আম্মু একদিন স্কুল থেকে ফিরা বলল, “মিলি তোর রুনু খালার কথা মনে আছে? তানিয়াদের বাসায় থাকতেন, পরে বোনের ছেলে আইসা যে নিয়া গেল হঠাৎ?”

আমি বললাম, “হুম আছে তো, মনে থাকবে না কেন?”

“তোর রুনু খালামণি কালকে রাতে মারা গেছেন। দেখতে গেছিলাম আজকে আমরা। লায়লা আপা, ইরা আপা, জাহাঙ্গীর স‍্যারদের সাথে। বয়েজের স‍্যাররাও আসছেন দেখলাম অনেকেই। আসবেই তো, এতদিন ছিলেন ওই স্কুলটায়।”

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

শৈলী নাসরিন
শৈলী নাসরিন

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৮। শিক্ষার্থী, স্নাতক, প্রথম বর্ষ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস।

Leave a Reply