কিন্তু খালি কর্তব্য কাজ করতে করতে আমি বড়ই বিরক্ত হইয়া পড়ছিলাম।

জাহানারা ইমাম হলের ক্যান্টিনে এক খালা বাসন ধুইতেন, উনাকে একদিন দেখলাম হলের স্টোর থাইকা বানরুটি কিনছেন দুইটা। এইটা নাকি উনার রাতের খাবার।

জিগাইলাম, ক্যান্টিন থাইকা তারে খাবার দেওয়া হয় না কেন।

উনি জানাইলেন খাবার দেওয়া হয়, কিন্তু অনেকক্ষণ এঁটো বাসন ধোয়ার পরে সেইসব খাবার খাওনের রুচি থাকে না ।

সেইদিন আমি সেই খালার প্রতি তীব্র মমতা বোধ করছিলাম, কষ্টে আমার চোখে পানি আইসা গেছিল।

আমি এত নরম মনের মানুষ না যে শ্রমজীবী লোকের কোনো স্বাভাবিক বাস্তবতা দেইখা আমার কান্না আইসা পড়বে। এই খালার জন্যে সমবেদনা অনুভব করার কারণ হইল বাসন মাজাটা আমার কাছেও খুব কঠিন কাজ মনে হইত। এর চাইতে বাথরুম ধোয়াও সহজ। হারপিক ছিটায়া ব্রাশ দিয়া ঘইষা পরিষ্কার করার পরে নিজে গোসল কইরা ফালাইলাম, দুই তিন দিনের জন্যে নিশ্চিন্ত। কিন্তু জুঠা বাসনের ক্ষেত্রে সেইটা সত্যি না। দিনের যে কোনো সময়ে বাসন ধুইতে হইতে পারে, প্রতিবার গোসল করাও সম্ভব না। কিন্তু বাসন থাইকা যে পানির ছিটা আইসা গায়ে লাগে সেইটারেও ঘিন্নাই লাগে। তাই বাসন মাজা আমার জন্যে একটা শাস্তির মতন।

মোবাইল ফোনের বাক্স দিয়া জুয়েলারি বক্স আর সফট ড্রিংকের ক্যান দিয়া ফুলদানি। আজাইরা কাজ তো বটেই।—লেখক

বাসন মাজা সম্পর্কে এতটা বিরাগ এখন আর নাই আমার। মাক্সিম গোর্কি উনার আত্মজীবনীতে লিখছেন উনার কিশোর বয়সে জাহাজের বাসন ধোয়ার কাজ কইরা জীবিকা নির্বাহ করার কথা। গোর্কির কথা ভাইবা আমি লোকের চাবাইন্না সজনার ডাঁটা, আধাখাওয়া মুর্গির রানের হাড্ডি, আর মাছের কাটাকুটা ডানহাত দিয়া ময়লার বাসনে ফালায়া ডজন ডজন থালি ধুইয়া ফেলতে পারি।

ইদানিং কোন একটা আর্টিকেলে পড়লাম থালাবাসন ধুইলে নাকি অবসাদ আর বিষণ্ণতা কাটে। যদিও সকল রিসার্চের সকল ফলাফল চোখ বন্ধ কইরা বিশ্বাস করার কারণ নাই, কিন্তু গোর্কির প্রতি অতিমুগ্ধ হইবার কারণে আমি এই আর্টিকেলের বক্তব্য বিশ্বাস কইরা নিছি। গোর্কির তিনখণ্ডের জীবনী পইড়া যে কোনো মানুষের, যে নিজেকে আগে ভাগ্যাহত ভাবত, নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হইব। আমি যতবারই পড়ছি, অনেক ইনস্পায়ার্ড হইছি। কাইন্দা বুক ভাসানের মতন মেলোড্রামাটিক করুণ রস সেইখানে নাই। কিন্তু জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ কইরা যাইবার সাহস আর শক্তি কত বেশি থাকতে পারে মানুষের তা ঠিক বোঝা যায়।

পেন্টাগন স্টার। —লেখক

অবসাদ বা বিষণ্ণতা কাটানের জন্যে মানুষ আরো অনেক কাজ করে যেগুলার সত্যিকার অর্থে কোনো উপযোগিতা নাই। কিংবা শখের বশেও মানুষ নিজের প্রধান কাজের বাইরে অপ্রধান অনেক কাজে সময় দেয়, থেরাপি হিসাবে না।

যেমন আমার বান্ধবী ডক্টর লাইসা ইয়াসমিন লিজা একজন শিশু বিশেষজ্ঞ। সে ছাদে ফুলের বাগান করে। প্রতি শীতে তার বাসার ছাদে প্রচুর চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া আর গোলাপ ফুটে। তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া আমিও কয়েকবার টবে গাছ লাগাইছিলাম। তবে এই ফুলগাছগুলা শীত শেষ হইলেই মইরা যায়। তাতে অবশ্য আফসোসের কিছু নাই। রবি ঠাকুর বলছেন, “ফাগুনের ফুল যায় ঝরিয়া ফাগুনের অবসানে, ক্ষণিকের মুঠি দেয় ভরিয়া আর কিছু নাহি জানে।” যে কয়দিন ফুলগুলা ফুইটা থাকে সেই কয়দিনই মনে আনন্দ হয়। এইটাও কম কিছু না।

ভোদকার বোতল দিয়া বানানো ল্যাম্প ।—লেখক

মানুষ আকামে সময় নষ্ট করারে প্রকাশ করার জন্যে প্রবাদ বানাইছে, “নাই কাজ তো খই ভাজ।” অথচ খই কোনো খারাপ জিনিস না, দুধ দিয়া খই খাইতে আমার খুবই ভাল লাগে। এমন অনেক কৃষক পরিবার নিশ্চয়ই আছে যারা খই বিক্রি কইরা অর্থ উপার্জন করেন। আমাদের মতন যে সকল পরিবারের গ্রামে জমিজমা নাই, তারা তো খই বাজার থাইকা কিন্নাই খান। তাইলে খই অদরকারী হইব কেন? যদি তর্কের খাতিরে ধইরাও নেই যে খই ভাজাটা অপ্রয়োজনীয়, তাইলেও তো যে কাজ নাই বইলা ঘুমাইতাছে তার চাইতে যে খই ভাজতেছে সে বেশি কাজের লোক।

প্রকৃতির জন্য স্যান্ডেল, কুরুশের কাজ করা —লেখক

আমি এ রকম অনেক খই ভাজি যার আসলেই কোনো উপযোগিতা নাই। আমার কন্যার অনুরোধে অরিগ্যামি শিখছিলাম, বেশ কিছু জিনিস বানাইছিলাম ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়া। যারা জানেন না তাদের জন্য তথ্যটা দেই—অরিগ্যামি একটা জাপানি শব্দ । ‘অরি’ মানে ভাঁজ আর ‘কামি’ মানে কাগজ। কাগজ ভাঁজ কইরা কইরা বিভিন্ন জিনিস বানানোর শিল্পকে আধুনিক টার্মে অরিগ্যামি বলে।

অরিগ্যামি ক্রেন দিয়া ঘর সাজাইছিলাম, এক ঝড়ের রাতে বাতাসে পুরাই লন্ডভন্ড হইয়ে গেছিল। —লেখক

ছোটকালে বৃষ্টির পরে জমা পানিতে ভাসানের জন্যে আমরা যে নৌকা বানাইতাম সেইটাও অরিগ্যামি। এই নৌকা নিয়া একটা অতি জনপ্রিয় গানও আছে, জগজিৎ সিং এর গাওয়া, ‘কাগজ কি কাশতি’ আর ‘বারিষ কা পানি’র বিনিময়ে উনি উনার সকল ধনসম্পদ আর যৌবন দিয়া দিতেও রাজি আছেন। আসলে এই নৌকাটা শৈশবের সিম্বল এইখানে। ছোটকালে আমি তা বুঝি নাই। ভাবতাম কাগজের নৌকা লইয়া গান গাওনের কী আছে?

সাধারণত কোনো আঠা বা অন্য কিছু ব্যবহার করা হয় না এই জিনিস বানাইতে। নৌকা থাইকা শুরু কইরা ড্রাগন হেন জিনিস নাই যা জাপানি এবং কোরিয়ানরা কাগজ দিয়া বানাইতে পারেন না। আমি এই অরিগ্যামি দিয়া এতই মুগ্ধ যে বিভাগের শেক্সপিয়ার ফেস্টিভ্যালে করিডোর সাজানের জন্যে পুলাপানরে দিয়া শ’খানেক অরিগ্যামি বক বানাইয়া ঝুলানের ব্যবস্থা করছিলাম, ওই অনুষ্ঠানের আহবায়ক ছিলাম, পুলাপান অনেক প্যারা খাইয়া গেলেও কনভেনারের কথা অমান্য করতে পারে নাই।

আমার বানানো মোমবাতি। প্যারাফিন ওয়াক্স স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জাইনা এখন বানানো বাদ দিছি। —লেখক

আমার এই রকম আরো কিছু ক্রাফট করার শখ চড়ছিল কিছুদিন আগে। দড়ি প্যাচাইয়া ল্যাম্প বানানো, প্রিংগলসের খালি প্যাকেট দিয়া ফুলদানি বানানো, ভোদকার বোতল রঙ কইরা তাতে টুনি বাতি ভইরা বাত্তি বানানো, প্যারাফিনের লগে ক্রেয়ন গলায়া মোমবাতি বানানো ইত্যাদি। এসব কাজের কোনো মনিটারি ভ্যালু নাই বইলা এরে সময়ের অপচয় হিসাবে গণ্য করা যাইতেই পারে।

এমন যদি হইত যে বাসন মাজা বা বাথরুম ধোয়ার জন্যে আমার অন্য লোক আছে তাইলে এই সকল লাগজারিরে ইনডালজ করা কোনো ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আসলে তো তা না। অফিস থাইকা আইসা গৃহস্থালি কাজ শেষ করার পরে আমার আবার খাতা দেখতে বসতে হয়, পরের দিনের ক্লাসের জন্যে পড়তে হয়, শিশুদের খাওয়ানো ঘুম পাড়ানোর মতন অবশ্য কর্তব্যগুলি সারতে হয়। সেই হিসাবে এই সকল কুটির শিল্পে সময় দেওয়া মানে সময়ের অপচয় তো বটেই।

কিন্তু খালি কর্তব্য কাজ করতে করতে আমি বড়ই বিরক্ত হইয়া পড়ছিলাম। আমার আরেক বান্ধবী ডক্টর হোমায়রা শবনম সিঁথি, যিনি পেশায় একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, তার কাছ থাইকা একটা মাফলার উপহার পাইছি এই শীতে। সেইটা বানাইতে নাকি তার মাত্র এক রাত লাগছে। শুইনা উৎসাহিত হইয়া আমিও ক্রশের কাজ শিখতে শুরু করছি। আমার আরেক বান্ধবী রোজানা রহমান প্রিমাণি, যে নিজেও এই কাজ পারেন, আমার ছেলের জন্যে টুপি বানায়া পাঠাইছেন, বললেন যে চেষ্টা করলে আমিও পারব।

এইগুলারে কেন নিনজা স্টার বলে আমি জানি না, এই স্টারগুলা বানাইতে আমার সবচে ভাল লাগে। —লেখক

শুরু করার পরে এই নিয়া আমারে অনেক তিরষ্কার শুনতে হইছে। সময় নষ্ট করার জন্যে যারা আমারে বকা দিছেন তারা আমার শুভাকাঙ্খী, তারা আমাকে ভালোবাসেন বইলাই চাইছেন যেন আমি এসব হাতের কাজে সময় না দিয়া লেখাপড়া করি, একাডেমিক লেখা হইলে চাকরির কাজে আসবে, নন একাডেমিক লেখা হইলে লেখক হিসাবে আমারে দুই এক ধাপ আগাইয়া নিবে। সাহিত্য ডটকমে আমার একটা ধারাবাহিক লেখা যায়—‘লৌহিত্যের ধারে’। অন্তত গোটা বিশেক পাঠক আমার সেই লেখাটা আগ্রহ নিয়া পড়েন। কুরুশ/কুশির কাজ করতে গিয়া আমি সেই সিরিজটাও কয়েকমাস ধইরা লিখতেছি না।

কিন্তু এই ক্রশের ব্যাপারটাও জগজিৎ সিঙের কাগজ কি কাশতির মতন। ছোটকালে আব্বার এক পরিচিত ভদ্রলোকের বাসায় গিয়া দেখছিলাম উলের সুতা দিয়া বানানো কুকুরের পুতুল। ওই লোকের বোনেরা নাকি সেগুলি বানাইছেন। দেইখা আমি খুবই মুগ্ধ হইছিলাম। তখন জানতাম না যে এই পুতুল বানানের কৌশলটারে ‘আমিগুরুমি’ বলে। ‘ক্রশে’ শব্দটা ফরাসি হইলেও ‘আমিগুরুমি’ জাপানি শব্দ। আর আমিগুরুমির জিনিসগুলা ক্রশের হুক দিয়াও বানানো যায় আবার দুই কাঁটা দিয়াও বোনা যায়। ভিতরে তুলা দিয়া স্টাফ কইরা দিতে হয়।

আমার বান্ধবী সিঁথি আমারে একটা পুতুল বানাইয়াও পাঠাইছেন। আমি ভাবলাম, সিঁথিও ডাক্তার, তারও দুই বাচ্চা, তারও বাসায় কাজের লোক নাই আর স্বামী ব্যস্ত। সে যদি পারে আমিও চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই পারব, যত কঠিন মনে হইতেছে তত কঠিন নাও হইতে পারে ব্যাপারটা।

তারিকুল স্যারের ছেলের জন্য বানানো নিনজা টারটল ক্যাপ। ছোটকালে শুক্কুরবার দুপুরে আমরা টিনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টারটল নিয়মিত দেখতাম।—লেখক

আমি নেটে ঘাইটা দেখলাম যে আমিগুরুমির বেশ কিছু প্যাটার্ন ফ্রিতে পাওয়া যায়। আবার কয়েকটা কিনতে হয়। আমার কাছে সবসময়ই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের চাইতে বই বেশি সুবিধাজনক লাগে। ইউটিউবে রেসিপি দেইকখা আমার মাও অনেক কিছু রান্না করেন, কিন্তু আমার ভরসা হইল সিদ্দিকা কবিরের বই। তাই আমিগুরুমির জন্যে বই কিনাইলাম বিলেতে পিএইচডি করতে যাওয়া আমার সহকর্মী তারিকুল ইসলামকে দিয়া। উনি গত মাসে দেশে আসছেন,তখনই আমি দুইটা আমিগুরুমির বই পাইলাম। একটা বইয়ের নাম ‘অ্যাডওয়ার্ডস মিনেজারি’। কেরি লর্ড নামের এক মহিলা তার অ্যাডওয়ার্ড নামের পুত্রের জন্যে ৪০টা পশুর খেলনা বানাইছেন, তাদের নাম দিছেন, তাদের প্রত্যেকের গল্পটা লিখছেন। এই বইতে সেই চরিত্রগুলারে বানানোর কৌশল বিশদভাবে দেওয়া আছে।

রুফুস, সিংহ, সে একজন ছুতোর মিস্ত্রী।—লেখক

রুফুস নামের সিংহ দিয়া আমি শুরু করছি। কেরি লর্ড একটা নাম করা ইয়ার্ন কোম্পানির মালিক, উনার ফার্মের আলপাকাদের থাইকা পাওয়া উল দিয়া উনি আমিগুরুমি বানান। আমাদের এইখানে অত ভালো উল পাওয়া যায় না। যে ইন্ডিয়ান উল পাওয়া যায় সেইখানে রুফুসের গায়ের রঙের কাছাকাছি কোনো সুতা পাই নাই। অবশেষে সেকেন্ড হ্যান্ড সুতার গোল্লা কিনলাম দুইটা চল্লিশ টাকা দিয়া। তাই দিয়া রুফুসরে বানাইলাম।

অরিগ্যামি প্রজাপতি। —লেখক

রুফুস একজন প্লাম্বার যে নিজের কাজ ভালো পারে না,তার চেহারা দেখলে যত মায়া লাগে তার ট্যাংকি ঠিক করতে গিয়া ভিজ্যা যাওয়া বা দরজা ঠিক করতে গিয়া ল্যাজ আটকাইয়া ফেলার কথা শুনলে আরো বেশি মায়া লাগে।

মানানসই সুতার জন্যে অপেক্ষা করতেছি। পাওয়া মাত্রই ব্রিজিত, আলেকজান্ডার, পিয়োত্র, হ্যামলেট, জর্জিনা, বরিস, ব্লেইক, ব্র্যাডলি সবাইরেই বানাব।

বিষণ্ণতা কাটানের জন্যে থালিবাসন ধুইবার চাইতে অনেক ভালো উপায় আমিগুরুমি। উলের সুতাও জুঠা থালবাসনের চাইতে অনেক ভাল জিনিস, হাতে ধরতেই কত ভাল লাগে।

কভারের ছবি: “এইগুলারে গ্র্যানি স্কয়ার কেন বলে আমি জানি না, কিন্তু বানাইতে মাত্র ২০ ২৫ মিনিট লাগে, বেগুনিটা সুতা শেষ হওয়াতে অসমাপ্ত।”—লেখক

কমেন্ট করুন

মন্তব্য