page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

রূপম ইসলাম, ইউ হ্যাভ মাইলস টু গো

কলকাতার ব্যান্ড ফসিল্স-এর গায়ক দেশপ্রেমিক ভারতমৌলবাদী রূপম ইসলাম গোস্বা হইছেন। এমনি রাগ হইছেন যে বলছেন ধ্যাত্তেরিকা, হামিন শাফিন, অরা স্টেজে উঠলে গামুই না আমি। এইডা আজাদি কনসার্ট, কড়া দ্যাশপ্রেমের ডোজ দিতে হইব। কিছু বুঝস তোরা? রক’এর মায়েরে বাপ, অনলি দ্যাশপ্রেম ইজ রিয়েল, ইউ বিচেস!

বাংলাদেশের রক মিউজিকের একজন শ্রোতা হিসাবে রূপমের এই আস্ফালন দেখে আমি খালি হাসি আর হাসি।

sharmee-logo

আসুন রূপম ইসলাম প্রথমে আপনাকে রক গানের ইতিহাসটা একটু জানাই। রক গানের সবচেয়ে দামি দিকটা কি জানেন? এই গানগুলোর মধ্যে দিয়ে দেশ ও সমাজের সকল রেস্ট্রিক্টিভ নিয়মের প্রতি বিদ্রোহ ও বুড়ো আঙুল দেখানো হয়।

রকগান সুশীলসমাজের ড্রয়িংরুমে বসে পিড়িং পিড়িং করে গাওয়ার জন্য নয়। ৬০ ও ৭০ দশকের রক স্বর্ণযুগে এই ধারা এম্ব্রেস করে নিয়েছিল সকল অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষের গানকে, ও হয়ে উঠেছিল আমেরিকান তারুণ্যের মিথস্ক্রিয়ার এক দুর্দান্ত ক্ষেত্র।

বর্ণবাদ, ভোগবাদ, পুঁজিবাদ যখন আমেরিকার সমাজকে ভিতরে ভিতরে ফাঁকা করে দিচ্ছিল, তখন রক মিউজিক হয়ে উঠেছিল সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের এক তীর্থস্থান। সাদা চামড়ার হলিউডি ঝাঁ-চকচকে ফ্যাশনকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল খেটে খাওয়া মানুষের পোশাক ছেঁড়া জিনসের প্যান্ট পড়া ভিন্ন ভিন্ন বর্ণগোত্রের প্রথাবিরোধী একদল বেয়াদ্দপ ছেলেপুলে।

ইলেকট্রিক গিটার হাতে সেই অল্পবয়সী সেই কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটাকে মনে করতে পারেন?

ছেলেটি বলেছিল “গান কখনো মিথ্যা বলে না। এই পৃথিবীতে পরিবর্তনযোগ্য কিছু যদি থেকে থাকে, একমাত্র গানের মাধ্যমেই তার পরিবর্তন সম্ভব।”

rupom-sumon-1

কবীর সুমনের সঙ্গে রূপম ইসলাম।

সিয়াটলে জন্মানো দুনিয়া উথালপাথাল করা রক আইকন হয়ে ওঠা সেই কালো ছেলেটির নাম ছিল জিমি হেনড্রিক্স। থোড়াই কেয়ার করত সে যুদ্ধবাজ আমেরিকান সরকারকে। ভিয়েতনামে যখন একের একের পর এক আমেরিকান যুদ্ধবিমান হামলা করছে, বিখ্যাত উডস্টক মিউজিক ফেস্টিভালে সেদিন সে অদ্ভুতভাবে বাজিয়ে ছিল আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত। গানের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল বোমারুবিমানের রকেট ও বোমার তাণ্ডবের শব্দ। শুধু সরকার কেন, সকলেই তাজ্জব বনে গিয়েছিল তার অভিনব এই প্রতিবাদ দেখে। জিমি জানত শান্তি সেদিনই আসবে যেদিন ক্ষমতার মোহের চাইতে, ভালবাসার শক্তি বেশি হবে।

আপনি সেটা এখনো জানেন না। গোস্বা করে বসলেন। ক্ষমতা দেখালেন। দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার ঘৃণার কাদা ছোঁড়াছোঁড়ির মধ্যে একটি দিক বেছে নিলেন।

একজন প্রকৃত রক মিউজিসিয়ান গানকে এসব নোংরামির উর্ধ্বে রাখেন, এমন সব সময়ে তারা সেতুবন্ধন গড়েন। গানের সীমানা বেঁধে দেন না।

মনে আছে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ? বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত সমর্থন দেবার বহু আগে অগাস্ট মাসে আমেরিকার ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও তার শিষ্য জর্জ হ্যারিসন আয়োজন করেছিলেন পৃথিবীর প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট। আমেরিকা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাপোর্ট করে নি, কিন্তু বব ডিলান, জোয়ান বায়েজ, এরিক ক্লাপ্টন সহ সেসময়ের সকল রক শিল্পী সেই কনসার্টে গেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের দালালি করেন নি। নড়াইলের ছাওয়াল ভারতের রবিশঙ্কর ধ্রুপদী সেতার বাজালেও মননে ও মেজাজে তিনি ছিলেন রকস্টার। সেদিক থেকে ভাবলে আপনি আর যাই হোন না কেন, রক মিউজিসিয়ান এখনো হয়ে উঠতে পারেন নি। তাই প্রিয় রূপম ইসলাম, ইউ হ্যাভ মাইলস টু গো…।

আবার কোথায় জানি পড়লাম রূপম ইসলাম ও তার ফসিল্স নাকি বাংলা রক গানের পাইওনিয়ার! এইটা পড়েও আমি খালি হাসি আর হাসি।

rupom-56

রূপম ইসলাম (জন্ম. ১৯৭৪); কলকাতার ফসিল্স (ব্যান্ড) এর লিড সিঙ্গার।

আমরা যারা ঢাকায় বেড়ে উঠেছি নব্বইয়ের তারা জানি বাংলা রক মিউজিক কাহাকে বলে। আর্মি স্টেডিয়ামে, কিংবা শাহীন স্কুলের বিশাল মাঠে আমরা যারা জেমস, আইয়ুব বাচ্চুর কনসার্ট দেখেছি তারা জানি বাংলা রক মিউজিক কত প্রকার ও কী কী। যদিও তার অনেক আগেই আজম খান রক গান গেয়ে দেশে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন, তবু জেমস-বাচ্চুর সময়টাই রক গানের সুবর্ণযুগ।

ঈদের দিনে পাড়ার মোড়ে, বিয়েশাদিতে, পূজামণ্ডপে তখন বাংলা রক ব্যান্ডের গানগুলোই বাজত।

রূপম, আপনি কখনো ১০-২০-৫০ হাজার লোকের কনসার্টে বাংলা রক গান গেয়েছেন? বা শুনেছেন? আপনি কখনো দেখেছেন মাইলস যখন গায় “ফিরিয়ে দাও, আমার প্রেম” তখন শাহীন স্কুলমাঠের হাজার হাজার রকশ্রোতার সম্মিলিত কণ্ঠ যে মিরপুর থেকে শোনা যায়? অথবা জেমস যখন গেয়ে উঠেন “সুন্দরীতমা আমার তুমি নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলতে পার ঐ আকাশ আমার” তখন হাজার হাজার মানুষের শরীর মন কী এক জাদুমন্ত্রে ঐ আকাশ ফুঁড়ে ছুটে যায়? জেমস স্টেজে উঠলেই মূহুর্মূহু তালি ও অভিবাদন চলত অন্তত ১৫ মিনিট ধরে। সারা শহরের সব ১৫ থেকে ৩০ এর ছেলেমেয়ে একসাথে হবার সেই অসাধারণ মুহূর্তগুলো আসলে আপনি দেখেন নি, রূপম ইসলাম।

বাংলা রক মিউজিক কীভাবে একটি জেনারেশনকে উদ্দীপিত করেছিল বাংলা গানের সেই অহঙ্কারের সময়গুলিতে, সেটা আসলেই ঢাকায় সেই সময় না থাকলে আপনি বুঝবেন না। কবীর সুমন আসার আগ পর্যন্ত কলকাতার ওই পূজা স্পেশাল অ্যালবামের প্যানপ্যানে গানগুলো শুনে বড় হয়েছেন, আপনাকে দোষ দেয়া যায় না। অনেক পিছিয়ে আছেন আপনি। ইউ হ্যাভ মাইলস টু গো, প্রিয় রূপম ইসলাম…।

মাইলস গান গাইলে আপনি গা’বেন না বলেছেন। ভালই করেছেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সারির ব্যান্ডগুলো গান করলে আপনাদের ফসিলড রক মিউজিকের পক্ষে সেখানে কল্কে পাওয়া কঠিন। বলে রাখি যে আমি মাইলসকে এমন কোনো সাংঘাতিক রক ব্যান্ড মনে করি না, তবে তারা প্রথম সারির এ ব্যাপারে সন্দেহ নাই। একজন প্রকৃত রক মিউজিসিয়ান হলে আপনি এটাকে চ্যালেন্জ হিসাবে নিতে পারতেন। কনসার্টে প্রমাণ করে দিতেন আপনি কত মহৎ, কত স্কিল্ড, কত জনপ্রিয়। আপনি গোস্বা করে বসলেন রূপম ইসলাম। নাকি ভয় পেলেন? মাইলসেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বাচ্চু-জেমস থাকলে তো আপনি কান্নাকাটি শুরু করতেন।

ভালই করেছেন। জান বাঁচানো ফরজ কাম। মান বাঁচানোও। আপনাদের তাজমহল আছে, বলিউড আছে, দেব, জিত, প্রসেঞ্জিত, গঙ্গা, ফারাক্কা সবই আছে, তবে রক মিউজিকটা আমাদের। ওইটা আপনাদের হয়ে উঠলো না।

মাইলস।

মাইলস।

একটা গল্প বলি। বেনসন অ্যান্ড হেজেসের কনসার্টে গান গেতে এসেছিলেন পাকিস্তানের ব্যান্ড স্ট্রিংস। তাদের লিলিপুটীয় রক গানের যে কী অবস্থা হয়েছিল গালিভার সদৃশ বাংলা রক ব্যান্ডগুলোর সামনে সেটা যে কোনো বাংলাদেশীকে জিজ্ঞেস করে নিবেন। পাত্তা তো পায়ই নি বরং তাড়াতাড়ি স্টেজ থেকে নেমে গিয়েছিলেন তারা। জেমস স্টেজে উঠে বলেছিলেন, “অতিথির সাথে তোরা এ কেমন ব্যবহার করলি। নাহ আজ আর গাইতে ইচ্ছা করছে না।”

স্টেডিয়ামের মানুষের খালি জেমসের পা ধরে কান্না বাকি ছিল। আবার উঠেছিল স্ট্রিংস। তারপর গেয়েছিলেন জেমস।

এই হল রকস্টার। আশা করি আপনিও একদিন রকস্টার হয়ে উঠবেন, বাট ইউ হ্যাভ মাইলস টু গো…।

পড়ুন: সাম্প্রতিক ডটকমে প্রকাশিত আরো ব্লগ

About Author

মুশাররাত শর্মি হোসেন

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক ও অ্যামেচার সংগীতশিল্পী।