বিশ্বব্যাংকের মতে, রক্তে লৌহ বা আয়রনের অভাবে ওয়ার্ল্ড জিডিপি ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

২০০৮ সাল। কানাডার ছাত্র ক্রিস্টোফার চার্লস তখন কাজ করেন কম্বোডিয়ার এক গ্রামে। গতানুগতিক পিলারঅলা একটা বাসায় তিনি থাকেন।  সেখানে না আছে ইলেক্ট্রিসিটি, না কোনো পানির উৎস।  কম্বোডিয়ার গ্রামের মানুষদের সমস্যা নিয়ে ভাবেন তিনি।

তার কথায়, রক্তশূন্যতা এবং ব্যাকটিরিয়া ঘটিত সংক্রমণ ওই অঞ্চলের বড় একটা সমস্যা। কেউই এ নিয়ে কিছু করছিল না। আমি রক্তশূন্যতার প্রাদুর্ভাবের কারণ বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

রক্তে লোহা বা আয়রনের পরিমাণ কমে যাওয়ার সাথে রক্তশূন্যতার সম্পর্ক আছে। কম্বোডিয়ার অর্ধেক মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত। বিশ্বব্যাংকের মতে, রক্তে লৌহ বা আয়রনের অভাবে ওয়ার্ল্ড জিডিপি ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইউকে’র লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিকাল মেডিসিনের রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ইমেল্ডা বাতেস জানান, আয়রন ট্যাবলেট এ ব্যাপারে সহায়তা করতে পারে। এবং গর্ভবতী নারীদের প্রায়ই আয়রন ট্যাবলেট গ্রহণের জন্যে বলা হয়, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে আয়রন ট্যাবলেট গ্রহণের হার ভালো না।

তিনি বলেন, “আয়রন ট্যাবলেট কাজের। কিন্তু মানুষ এর স্বাদ পছন্দ করে না। ট্যাবলেটগুলি খেলে এমনিতে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পেট ব্যথা হয়ে থাকে। তা ছাড়া আয়রন ট্যাবলেট খেলে পায়খানা গাঢ় সবুজাভ, কালো এবং শক্ত হয়ে যায়। মানুষ তাই এগুলি খেতে চায় না।”

কম্বোডিয়ায় গিয়ে চার্লস কিছু করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। বছরের পর বছর মানুষ লোহার পাত্রে রান্নার মাধ্যমে খাবারে আয়রন যুক্ত করেছে। আবার কেউ আয়রন গ্রহণ করেছে সম্পূরকভাবে। চার্লস খুবই সরল এবং বিকল্প পন্থা নিয়ে হাজির হলেন। তিনি গ্রামবাসীকে আয়রনের ছোট্ট একটা ব্লক দিলেন এবং তা রান্নার পাত্রে ফেলার নির্দেশ দিলেন। পানি গরম হওয়ার সাথে সাথে ব্লকের আয়রন তাতে গলে যায় এবং খাবারে মেশে। এভাবেই খাবার রান্না হলো।

চার্লস জানান, প্রথমদিকে মানুষজন এটা ঘৃণা করত। তারা কুৎসিত মনে করত এভাবে লোহার ব্লক খাবারের মধ্যে রাখতে। এবং রান্নার পাত্রগুলিও তারা নষ্ট করে ফেলত।

পরে তিনি কম্বোডিয়ার নিজস্ব কালচার থেকে একটা আইডিয়া খুঁজে বের করলেন। তিনি দেখলেন, কম্বোডিয়ার গ্রামে যা কিছু হয় তার সবই মাছকে ঘিরে। মাছ ধরে তারা উপার্জন করে। তাদের খাদ্য, লোককাহিনি, এমনকি মুদ্রাতেও মাছ। কম্বোডিয়ার মুদ্রা ‘রিয়েল”ও এসেছে মাছের নাম থেকে।

চার্লস বলেন, আমি ট্রাই কানট্রপ নামের একটা মাছের সন্ধান পেলাম। গ্রাম্য লোককাহিনি অনুযায়ী এই মাছ মানুষের ভাগ্যের সাথে সম্পর্কিত। মানুষের ভাগ্য, সুস্বাস্থ্য এবং মঙ্গলার্থে এই মাছটি সুবিধা করে দিল।  আমার প্রকল্প বাস্তবায়নে এই মাছ সহায়তা করল। অর্থাৎ, সৌভাগ্যের লৌহ মাছটি জন্ম নিল।

‘লাকি আয়রন ফিশ’ নামের একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই লৌহ মাছ উৎপাদন এবং বাজারজাত করছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী গেভিন আর্মস্ট্রং দাবি করেন প্রতিষ্ঠানটি ২৩০ জন মানুষ নিয়ে যে পরীক্ষা করেছে তা উৎসাহব্যাঞ্জক। আর্মস্ট্রং বলেন, লোহার মাছটি ৯ মাস ধরে প্রতিদিন খাওয়ার পর রক্তে লৌহের বা আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা কমেছে ৫০ শতাংশ। তা ছাড়া মাছ গ্রহণের পরে গ্রাহকের রক্তে লৌহের পরিমাণ বেড়েছে।

কম্বোডিয়ার রাজধানী নম পেনের পাশ্ববর্তী গ্রামে থাকেন ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সট মট। তিনি এই মাছ ব্যবহার করেন। স্থানীয় খেমের মুরগীর স্যুপ তৈরির জন্য রসুন, আদা এবং লেবুর পাতা সিদ্ধ করার মতো এই মাছটিও গরম পানিতে সিদ্ধ করেন তিনি। তিনি বলেন, আগে আমার শরীর দুর্বল লাগত এবং ক্লান্ত হয়ে যেতাম। ক্লান্ত হয়ে গেল আমার বুক কাঁপত। কিন্তু এই মাছটি দিয়ে রান্না করা খাবার গ্রহণের কারণে শক্তি, বল পাই আমি এবং ভালোভাবে ঘুমাতেও পারি।

তার এটুকু শক্তি খুব দরকার। কেননা তিনি অনেক নাতি-নাতনি সামলান। বাবা-মা পার্শ্ববর্তী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অথবা মাঠে কাজ করতে গেলে এতগুলি নাতি-নাতনিকে একাই সামলান তিনি। বৃদ্ধার ১৫ বছরের নাতনি দানাইর কথা, “স্কুলে গেলে আগে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। অংকে ভালো করতে পারতাম না। ক্লাসে সিক্সথ হতাম। কিন্তু আমি এখন ক্লাসে প্রথম।”

আমস্ট্রংয়ের জন্য এটি খুবই ভালো সংবাদ। ২৮ বছর বয়সী আমস্ট্রং ৩৩০ জন মানুষ নিয়ে কম্বোডিয়াতে থার্ড স্টাডি করছেন। এই সফলতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সংশয়বাদীদের সন্তুষ্ট করতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি। তা ছাড়া তার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও সহায়তা করতে পারবেন তিনি। এদিকে ‘লাকি আয়রন ফিশ’ প্রতিষ্ঠানটি তাদের মাছ কম্বোডিয়া সহ বহির্বিশ্ব এবং অনলাইনে বাজারজাত শুরু করেছে।

ক্রিস্টোফার চার্লস।

নম পেনের রাজপ্রাসাদের পাশ্ববর্তী রাস্তার ধারের ট্রাঙ্খ নামের দোকানের মালিক মারিয়ান হুইলার জানিয়েছেন, মাছগুলি স্টকে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। কেননা এগুলির প্রচুর চাহিদা। পর্যটকদের জন্য প্রতিটি লোহার মাছের দাম রাখা হচ্ছে ২৫ মার্কিন ডলার। তিনি বলেন, “অনেক পর্যটকই মাছ কিনছেন কারণ এগুলি কম্বোডিয়ার ছোট্ট সুন্দর উপহার। এ মাছগুলির পিছনে গল্প আছে। তবে রক্তস্বল্পতায় ভোগা পরিবারের সদস্যদের জন্যেও এটি কিনছে মানুষ।”

অনেক মাছ বিক্রি হয়েছে। কম্বোডিয়ার বাজারে ছাড়াও অনলাইনেও এগুলির যথেষ্ট চাহিদা। প্রতিষ্ঠানটি এখন আর সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও মাছ দিচ্ছে। বেটস মনে করেন, ভাগ্য ফিরিয়ে আনা লোহার মাছগুলি কিছু একটা তো দিয়েছে। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, আমরা প্রকৃতিবাদী হতে পারি। কোনো কিছু শুরু করার আগে আপনার মনে সব প্রমাণ সঠিকভাবে থাকা উচিত, কিন্তু অভ্যাস করাটা কঠিন। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবমুখী হতে হবে।”

আমস্ট্রং বলেন, প্রতিটা রান্নার পাত্রে একটা করে মাছ থাকবে এটাই লক্ষ্য। অথবা সেই পাত্র যেখানে একটা মাছ দরকার।

 

কমেন্ট করুন

মন্তব্য