page contents

শত্রু শত্রু খেলা

শেয়ার করুন!

আমার মেয়ে নানান জায়গায় শত্রু দেখে হাতের মধ্যে শয়ে শয়ে জীবাণু—“মা, হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে এদের মারতে হবে।” আমিও দেখি—লাইফবয় হ্যান্ড ওয়াশের বিজ্ঞাপনের আতশি কাচের ফাঁকে ১০০% জীবাণু কীভাবে ১% জীবাণু হয়ে যায়—সেটা দেখি ঘষে ঘষে হাত ধুই কী ভীষণ আক্রোশে আমি আর আমার মেয়ে জীবাণু মারি!

যেহেতু আমরা ‘ডাকাত মারা ভিডিও গেইম’ খেলি না তাই আমাদের শত্রুরা ঐ চারকোণা বাক্সে থাকে না থাকে আরও অন্য জায়গায় যে কোনো দোকানে বা অফিসে গেলেই মেয়ে আমার সি সি ক্যামেরা খোঁজে আমাকে দেখায় উত্তেজনায় টগবগ করতে থাকে। এই ক্যামেরায় কীভাবে ছবি উঠবে, কীভাবে চোরকে ধরা হবে, পুলিশ এসে চোরকে নিয়ে যাবে, তার বিচার হবে—এইসব বলতে বলতে আর ভাবতে ভাবতে ছয় বছরের একটা বাচ্চা মেয়ের কী উত্তেজনা কেউ একজন হেনেস্তা হচ্ছে এই ভেবে!

এক দিন স্কুল থেকে এলো এক চিঠি নিয়ে। তাদের প্রিন্সিপ্যাল সব বাবা মাকে দিয়েছে ভয়ঙ্কর এক শত্রু কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে তার বিভিন্ন উপায় বাতলানো আছে সেই চিঠিতে সেই শত্রুর নাম—উকুন দীর্ঘ দুই পৃষ্ঠার সেই চিঠির কিছু কথা এখনও মনে পড়ে: Its epidemic; can grow all kind of hair—black, white or brown; consult with the local chemist; use special shampoo; brush again and again after bath…

আরও একগাদা কথা লেখা পড়তে পড়তে মনে হল আল-কায়াদার মত কোনো একটা শক্তি স্কুলে হানা দিয়েছে আমাদের সবাইকে একযোগে এই শত্রু মোকাবিলা করতে হবে আমার বাংলাদেশী এক্সপউজার দিয়ে কিছুতেই বুঝলাম না উকুনকে এত ভয়াবহ করে দেখার কী আছে

আমি মেয়েকে বললাম, “জানস, আমাদের উঠানে উকুন দেখা নিয়া সেরকম আড্ডা হইত পাড়ার মেয়েরা আসত, গল্পগুজব হইত, আর ফাঁকে ফাঁকে উকুন বাছা চলত। আর আমাদের ভাইদের খুব দুঃখ ছিল ওদের মাথায় উকুন ছিল না, তাই কেউ মাথা হাতাইয়া দিত না তখন ওরা লম্বা চুলের উকুনয়ালা মাথা থিকা উকুন নিয়া নিজেদের মাথায় ছাড়ত তারপর আম্মুর কাছে গিয়া ঘ্যান ঘ্যান করত—মাথা হাতাইয়া দেও

মেয়ে বলে, “শ্যাম্পু করত না মা? উকুন মারার শ্যাম্পু?”  

আমি বুঝি, এইভাবে হবে না সে তার এক্সপিরেন্স দিয়ে আমার ছোটবেলা বুঝবে না স্কুলে তাকে ‘এনজেক ডে’ (বিভিন্ন যুদ্ধে, বিশেষত দুই বিশ্বযুদ্ধে যেসব অস্ট্রেলিয়ান-নিউজিল্যান্ডের সেনারা মারা গেছে তাদের স্মরণে পালিত দিন) সম্পর্কে অনেক কথা বলছে। ভাবলাম সেইটার সাথে রিলেট করে বুঝাই। No Man’s Land নামের একটা ফিল্ম আছে না? ছোট বেলায় দেখছিলাম ওইখানের গল্পটা ওরে বললাম যুদ্ধ চলছে—দুই দেশের সীমান্তবর্তী একটা জায়গায় মাইন পোঁতা আছে সেই মাইনের উপরে এক দেশের সৈন্য—নড়তে চড়তে পারছে না, তার পাশে শত্রুপক্ষের সৈন্য সে বেচারা শত্রুকে মারছেও না, আবার মন থেকে শত্রুকে মেনেও নিতে পারছে না সেই দুইজনের একটা কথোপকথনের দৃশ্য ছিল

“যুদ্ধ চলছে—দুই দেশের সীমান্তবর্তী একটা জায়গায় মাইন পোঁতা আছে। সেই মাইনের উপরে এক দেশের সৈন্য—নড়তে চড়তে পারছে না, তার পাশে শত্রুপক্ষের সৈন্য।”—নো ম্যানস ল্যান্ড (২০০১) ছবির দৃশ্য।

যতদূর মনে পড়ে, একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছিল, কেন সে যুদ্ধ করছে? আরেকজন বলল, কারণ তার শত্রুপক্ষ যে দেশ তারা খারাপ। কী খারাপ করছে সেটা ব্যাখ্যা করতে তার অনেক ঝামেলা হচ্ছিল। সে শুধু জানে যে শত্রু খারাপ, তাকে মারতে হবে আর সেটাই দেশপ্রেম কেন শত্রু খারাপ, কীভাবে সে শত্রু হল সেটা সে জানে না

মেয়েরে বললাম, বুঝলি? কে যে কী প্রক্রিয়ায় শত্রু হয়! মেয়ে দেখি আমার গল্পের Morale এর লাইনেই নাই খালি মাইন নিয়ে তার প্রশ্ন—কীভাবে মাইন বানায়, কীভাবে মাইন রাখে, যারা মাইন রাখে তারা এত খারাপ কেন ইত্যাদি ইত্যাদি সবশেষে সে জানায়, “যে দুষ্ট লোক মাইন রাখছে ওদেরকে পুলিশে দিতে হবে মা

পোড়া কপাল আমার! আবার শত্রু!

 

অনেকদিন আগে—ইউনিভার্সিটির ডেইরি গেটের সামনে দুই ছেলেকে পিটাচ্ছে ছেলেরা ঐ ১২-১৪ বছর আগে একটা সময় ছিল না? গনপিটুনিতে প্রায়ই লোক মারা যেত? ঐ সময়ের কথা একটু দূরেই আমার এক বান্ধবী দাঁড়ানো ছিল তাকে জিজ্ঞেস করলাম কী ঘটনা সে জানালো, ক্যাম্পাসের বাইরের দুইটা ছেলে ওরে টিজ করছিল আর যায় কই? যারা ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন তারা তো শত্রু নির্ণয়ের ফর্মুলাটা জানেনই—একটা বলয়ের বাইরে থাকলেই সে শত্রু প্রথম বলয়ে কাছের বন্ধুরা। এদের কোনো দোষ নাই এরপর নিজের ক্লাশ, নিজের ডিপার্টমেন্ট, নিজের হল, নিজের ফ্যাকাল্টি, নিজের ইউনিভার্সিটি যে কোনো মারামারি লাগলেই আমরা আগে নিজেরা কোন গ্রুপে বিলং করি তা ঠিক করে ফেলতাম। আর উল্টা পক্ষ মানেই তো শত্রু! তাদের শায়েস্তা করা তখন আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ত যাই হোক, আমি আর আমার  বন্ধু মারামারি অগ্রাহ্য করে সামনের দিকে যেতে লাগলাম একটু পরে দেখি আরেক বন্ধু হাঁপাতে হাঁপাতে জটলা থেকে বের হল এসে আমাদের বলল, “ক্যাম্পাসের একটা মেয়েরে টিজ করছে, দিছি মাইর।” আমরা জানালাম, কে সেই মেয়ে আমার বন্ধু আবার ছুট! আগেরবার না জেনে মারছে—এইবার তো মারা গুরুদায়িত্বের মধ্যে পড়ে!

আরেকবারের ঘটনা। খাগড়াছড়িতে বেড়াতে গেছি আলুটিলার গুহা থেকে খুবই আপ্লুত হয়ে ফেরার পথে একটা দোকানে কেনাকাটা করতে ঢুকলাম বাঙালী দোকানদার আমাদের গল্পে চট করে ঢুকে গেল খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, “আলুটিলার গুহা কীভাবে হইছে জানেন?” আমাদের ভাবে-টাবে নিশ্চয় পাল্টা আগ্রহ ছিল খুব আয়েশ করে বলা শুরু করলেন, “এইটা কিন্তু ন্যাচারাল না। ‘উপজাতি’রা এই গুহা বানাইছে ওরা বাঙ্গালিদের উপরে আক্রমণ করত, আর পুলিশের ভয়ে ঐ গুহায় গিয়ে লুকাইত

আমি বেকুবের মত শুনতে লাগলাম আমাদের দলেই আদিবাসী একটা ছেলে ছিল দোকানদার তাকে থোড়াই কেয়ার করছে আমি খালি আল্লা আল্লা করছি, “দুনিয়াটা ফাঁক কইরা দেও আল্লা—আমাদের বন্ধুটা এইসব ফালতু কথা যেন না শুনে আল্লা।” একটু ধাতস্ত হয়ে বললাম, “আপনারা কবে আসছেন পাহাড়ে? বাঙালীরা কবে থিকা পাহাড়ে আসা শুরু করছে?” বলল, ২৫-৩০ বছর তো হবেই “তার মানে আলুটিলা এর পরে শাবল দিয়া খুইদা বানাইছে? কত সালে? ৯০ সালে?” মেজাজ খারাপ হলে, বেশি কথা বলতে পারি না। একটা চিরচিরানি রাগ নিয়ে গেস্ট হাউজে ফিরলাম।

যাই হোক কথা হচ্ছিল মেয়ের শত্রু শত্রু খেলা নিয়ে। ওর কথাতেই ফিরি। ওকে যখন গল্প পরে শোনানোর বয়স হল, তখন আমার এক বন্ধু উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরীর বাচ্চাদের জন্য লেখা ১৮-২০ টা বই গিফট করেছিলএই রায়চৌধুরী সাহেবে, যাদের গুষ্টির সবার প্রতিভায় আমি মুগ্ধ, তার লেখা পড়েও আমার মন ও মেজাজ ভীষণ খারাপ হল। ‘বাঘের দুই বাচ্চারে মেরে গাছে ঝুলাইছে। তাদের শরীর থিকা টপ টপ করে রক্ত পড়তেছে গরম কড়াইয়ে। বাঘ বাড়িতে এসে সেই ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দ শুনে ভাবছে—আহা কী মজার পিঠা বানানো হচ্ছে!”

আমি কোনো ভাবেই মানতে পারি না এটা ছোটদের জন্য লেখা (এমনকি এটাকে বড়দের জন্যও ভাবতে পারি না আমি)সেই গল্পগুলার মধ্যে একটু কম শত্রুওয়ালা গল্পগুলা শুনাতাম বাচ্চাকে। সেই ধরনের নিরীহ একটা গল্পে একটা চোর থাকে আর প্রতি রাতে পান্তা বুড়ির পান্তা চুরি করে খায়। পান্তা চুরি করার ভয়ঙ্কর অপরাধে লেখক তাকে অনেক সময় নিয়ে শাস্তি দিলেন। গল্পের প্রায় পুরোটাই তার শাস্তির বর্ণনা। পান্তা চুরি করতে এসে চোর গোবরে পিছল খায়, হাতে শিং মাছ তার শিং ফোটায়, চোখে পোড়া বেল ফেটে এসে লাগে, ক্ষুর দিয়ে পা কেটে দেয়া হয় এবং সব শেষে পুরো গ্রামবাসী মিলে চোরকে ধাওয়া করেএকটা ভয়ঙ্কর চোর মারতে রাজ্যের সব আয়োজন হয়—গোবর, ক্ষুর, শিং মাছ, বেল, গ্রামবাসী সবাইকে লেখক নিয়ে আসেন। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর চোরের একবেলার পান্তার আয়োজন কেউ করে না।

মেয়েরে সিনামা দেখাতে গিয়েও একই বিপত্তি। শিশুতোষ সিনামাওয়ালাদের বিশ্বাস যে, বাপ-মা বা আত্মীয় স্বজনকে শত্রু বানিয়ে বাচ্চাকে অনেক কষ্টে ফেলে সারাক্ষণ বাচ্চা এবং দর্শক কাঁদানোই হল বাচ্চাদের জন্য সিনেমা। পুতুল থেকে শুরু করে ছুটির ঘণ্টা, তারে জামিন পার, চলো পাল্টাই, দিপু নাম্বার টু এমন কি পথের পাঁচালী পর্যন্ত। বাচ্চাগুলাকে ভিক্টিম বানাও, আশে-পাশের মানুষগুলাকে অকারণে শত্রু বানাও, পুরা সিনেমা জুড়ে বাচ্চাকে একটা কান্না কান্না ভাবে উপস্থাপন করো—ব্যাস এইটাই শিশু চলচ্চিত্র। এইবার দর্শকের নাকের পানি চোখের পানি এক করে সিনেমা হিট

জাহাঙ্গীরনগরের একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করি। ইউনিভার্সিটিতে মাত্র ভর্তি হয়েছি। লেফট পলিটিক্সে  যোগ দিলাম। মুহূর্তেই অনেক লোক শত্রু হয়ে গেল। নেহায়েতই বড় ভাই ছিল, পরে দেখা গেল বিএনপি করে— সুতরাং আজকে থেকে আমরা শত্রু। বড় আপুর রুমে গেলাম আড্ডা দিতে—”জানস, কম্যুনিস্টরা নাকি নাস্তিক হয়?” ব্যাস কেমন একটা শত্রু শত্রু ভাব। দুঃসম্পর্কের বন্ধু বলে—”বামের মেয়েরা নাকি সিগেরেট খায়?” বলে আর ঘেন্না ঘেন্না ভাবে তাকায়। এসব নিয়ে সেরকম যন্ত্রণার মধ্যে আছি

ফাস্ট ইয়ারে, এক বিএনপি করা ভাইয়ের সাথে “আপু, কেমন আছ? ভাইয়া, ভাল আছি” টাইপের একটা সম্পর্ক ছিল। যখন যেখানে তার সাথে দেখা হত সে “আপু, কেমন আছ?” বলে মুখ চওড়া করে একটা হাসি দিত। আমিও তৎক্ষণাৎ “আমি ভাল আছি, আপনি কেমন আছেন ভাইয়া” বলে বিগলিত একটা হাসি দিতাম। এভাবে করেই আমাদের এক বছর কেটে গেল। একদিন তার সাথে আমার দেখা যুদ্ধক্ষেত্রে, শত্রু হিসেবে। আমরা পুরো ক্যাম্পাসে অনেকগুলা চিকা মেরেছিলাম। ওরা ওগুলো মুছে ফেলছিল। এটা নিয়ে আমরা কয়েকদিন ধরেই চিল্লাপাল্লা করছিলাম। ঐদিন ছিল আমাদের মারার দিন। মানে ওরা আমাদের মাইর দিবে পুরান কলাভবনের সামনে আমাদের রণক্ষেত্র আমরা আর ওরা মুখোমুখি। আমি ঐ প্রথম এত কাছ থেকে মারামারির মধ্যে আছি। ওরা শাসাচ্ছে, আর আমাদের লোকজনও পাল্টা চেচাচ্ছে। এর মধ্যে হঠাৎ দেখি আমার সেই ভাইয়াটা। ছাত্রদলের যে ছেলেটার হাতে পিস্তল ছিল ঠিক তার পাশের দাঁড়ানো; মারমুখী ভঙ্গি। হঠাৎ করেই আমরা দুজন দুজনকে দেখলাম। মুখ প্রসারিত হাসি দিয়ে বললেন, “আপু, কেমন আছো?” আমারও মুখে হাসি “ভাল আছি ভাইয়া, আপনি কেমন আছেন?” এতদিনের অভ্যাসে… শত্রু শত্রু খেলা ভুলে গেলাম।    

কমেন্ট করুন

মন্তব্য

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক

Leave a Reply