অন্যান্য কোষের তুলনায় ক্যান্সার কোষের শর্করার প্রয়োজন হয় বেশি।

সম্প্রতি একটি গবেষণায় শর্করা ও ক্যান্সার কোষের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বের করতে পেরেছেন কীভাবে ক্যান্সার কোষ প্রাণিদেহে উপস্থিত শর্করা থেকে শক্তি সংগ্রহ করার মাধ্যমে টিউমার সৃষ্টি করে।

ক্যান্সার কোষ সাধারণ কোষের মত শক্তি সংগ্রহ করে না। কোষের সাধারণ শ্বসন প্রক্রিয়ার বদলে এগুলি গ্লুকোজকে ল্যাকটেটে পরিণত করার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে থাকে।

বেঁচে থাকার জন্যে শরীরের প্রতিটি কোষেরই শর্করার প্রয়োজন। কিন্তু অন্যান্য কোষের তুলনায় ক্যান্সার কোষের শর্করার প্রয়োজন হয় বেশি। এছাড়াও ক্যান্সার কোষ শর্করাকে দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে। যার কারণে দ্রুত শক্তি সংগৃহীত হয়। ক্যান্সার কোষের মাধ্যমে শর্করার এই মেটাবোলাইজিং প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ওয়ারবার্গ ইফেক্ট’। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন থেকেই বুঝতে চেষ্টা করছেন ক্যান্সারের কারণে যে টিউমার সৃষ্টি হয় তার দ্রুত বেড়ে ওঠার সাথে ওয়ারবার্গ ইফেক্টের কোনো সংযোগ রয়েছে কি না।

প্রফেসর জোহান থেভেলিন

বেলজিয়ামের ভিআইবি-কেইউ লিউভেন সেন্টার ফর ক্যান্সার বায়োলজির প্রফেসর জোহান থেভেলিন জানান, ক্যান্সার কোষ অতিরিক্ত সক্রিয়তা এবং দ্রুততার সাথে শর্করা শোষণ করে থাকে। নতুন এই গবেষণা থেকে জানা যায় শর্করার এই হাইপার অ্যাকটিভ কনজাম্পশন কীভাবে ক্যান্সার ও টিউমার সৃষ্টির সাথে জড়িত।

তিনি আরো বলেন, “এটি ওয়ারবার্গ ইফেক্ট ও টিউমার সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে। শর্করার সাথে ক্যান্সারের এই সম্পর্কের সুদূরপ্রসারী ফলাফল রয়েছে। আমাদের প্রাপ্ত ফলাফল এই বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে দিবে। যার ফলে গবেষণাগুলি আরো যথাযথ ও প্রাসঙ্গিকভাবে পরিচালনা করা যাবে।”

এই গবেষণাটি পরিচালিত হওয়ার আগে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না যে ওয়ারবার্গ ইফেক্ট ক্যান্সারের সিম্পটম নাকি টিউমারের। গবেষণাটি প্রমাণ করে যে ওয়ারবার্গ ইফেক্ট ক্যান্সারের ফলে যে টিউমার সৃষ্টি হয় তার বৃদ্ধিতে কাজ করে। যদিও এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে শর্করার কারণে ক্যান্সার হয়।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার কম্যুনিকেশন নামের একটি জার্নালে।

গবেষণাটি করার জন্যে বিজ্ঞানীরা মডেল অর্গানিজম হিসেবে ইস্ট ব্যবহার করেছেন। ক্যান্সার কোষের মতই ইস্টও শর্করা থেকে শক্তি গ্রহণ করে। এছাড়াও এগুলিতে ‘রাস প্রোটিন’ রয়েছে যা ক্যান্সার কোষেও থাকে।

আমাদের শরীরে রাস প্রোটিনের অন্যতম কাজ হল কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। যে জিনগুলি কোষের বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলির যদি পরিবর্তন ঘটে তাহলে রাস প্রোটিন স্থায়ীভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে অতিরিক্ত কোষের সৃষ্টি হয় যা ক্যান্সার কোষের বিস্তার ঘটায়।

তাই ইস্ট ব্যবহার করে গবেষকেরা রাস এবং শর্করার মধ্যে সংযোগটি পরীক্ষা করে দেখেছেন।

প্রফেসর থেভেলিন জানান, ইস্ট ব্যবহার করার প্রধান সুবিধা হল এতে অনেক জটিলতা এড়ানো যায়। স্তন্যপায়ী প্রাণিদের কোষের গঠন বেশ জটিল যা গবেষণার ক্ষেত্রে বেশ বাধার সৃষ্টি করে। তাই বিজ্ঞানীরা ইস্ট কোষ নিয়ে পরীক্ষাটি করেছেন এবং স্তন্যপায়ীদের কোষের সাথে এর সাদৃশ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে ক্যান্সার বিষয় যে কোনো গবেষণার ক্ষেত্রেই এই গবেষণার ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা শর্করার সাথে ক্যান্সারের সংযোগটি এখন আরো ভালভাবে জানি। কিন্তু গবেষণার ক্ষেত্রে একটি নতুন আবিষ্কার অনেক সময়েই চিকিৎসা শাস্ত্রের নতুন আবিষ্কারের সাথে সমান গতিতে চলে না।

অধিক শর্করা কি ক্যান্সারের জন্ম দেয়, অথবা শর্করা থেকে ক্যান্সার কোষের শক্তি সংগ্রহের প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায় নি।