শান্তিনিকেতনের অধিকাংশ বাড়ি সারাবছর খালি পইড়া থাকে। বাড়ির মালিকেরা থাকেন কলকাতায়।

বাইবেলের হিসাব অনুযায়ী মানুষের নাকি বাঁচার কথা ৭০ বছর। কাজেই ৩৫ হইল তার মধ্যবয়স। মধ্যবয়সে পৌঁছাইয়া গেলে কেউ যত সুস্থ, কর্মক্ষম আর দেখতে জোয়ান থাকুক না কেন, আসলে তার জীবনের অর্ধেক চইলা গেছে। ‘লাইফ বিগিনস আফটার ফরটি’ বইলা নিজেদেরে আমরা যতই সান্ত্বনা দেই না কেন, আসলে জীবনে যতগুলা উপভোগের ব্যাপার আছে সেইগুলা কঠিন হইয়া যায় এই বয়সে।

যেমন ধরেন, বেড়াইতে যাওয়ার মতন যথেষ্ট টাকা থাকলেও আপনার ক্যারিয়ার পিকে পৌঁছাইয়া যাওয়াতে সময়ের টানাটানি থাকবে। বিবাহিত এবং সন্তানসহ লোকজনের জন্য অবস্থা আরো জটিল। আপনার ছুটির সঙ্গে বাচ্চার স্কুলের ছুটি মিলাইতে হবে। সব কিছু মিলায়া সময় যদি বাইর কইরা ফেলতেও পারেন তাইলেও অ্যানার্জি অতটা থাকবে না যা ছাত্রজীবনে, আর্লি বা মিড টোয়েন্টিজে আপনার ছিল।

ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন, যারা নিয়ম মাইনা খাওয়া-দাওয়া করেন, ঠিক মত ঘুমান, ব্যায়াম করেন তারা নিশ্চয়ই পঞ্চাশ বা ষাট বছর বয়সেও অ্যানার্জেটিক থাকেন। আমি কখনোই নিয়ম মানাদের দলে ছিলাম না। কাজেই ৩০ বছর পার হইয়া যাওয়ার পরে প্রতি বছরেই একটু একটু কইরা বয়সের বোধ আমারে কাবু কইরা ফালাইতে থাকল।

আমার বোন আর তার ননদের সঙ্গে শান্তিনিকেতন যাওয়ার প্ল্যান করলাম আমি, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’ জাতীয় অনুভূতিতে আক্রান্ত হইয়াই মূলত। সাত বছর যাবত মাস্টারি করতে করতে, খাতা মূল্যায়ন আর পরীক্ষার ইনভিজিলেশন করতে করতে জীবন চইলা যাইতেছে বইলা আজিব এক ডিপ্রেশনে পায়া বসছিল আমারে।

শুধু বেড়ানের উদ্দেশ্যে যদিও যাই নাই, কিন্তু যাওয়ার সময় বুঝলাম আসলেই আমার মাঝবয়স চইলা আসছে।

ফলপট্টিতে জান্নাতি আর ববি আপার সঙ্গে দেখা, ববি আপার মেয়ে উজানিয়াও ছিল।

যেহেতু মুমু আর প্রকৃতির (আমার বোন মুমুর খুড়তুতো ননদ) সঙ্গে যাব, তাই তাদের ব্যবস্থা অনুযায়ী সব ঠিক হইল। আমার নিজের কিছুই করতে হইল না। আমি ত্রিশালে বইসা নিজের কাজ করতে থাকলাম।

দেশত্যাগের আগে রেজিস্ট্রার অফিস থাইকা এনওসি নিতে হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের মতন শুধু ছুটি নিলেই চলে না। দিনতারিখ মিলায়া এনওসি পাওয়ার জন্য আবেদন কইরা সেইটা হাতে পাওয়ার প্রক্রিয়া যথেষ্টই সময়সাপেক্ষ।

আমি অবশ্য বিনা ঝামেলায় এনওসি পায়া গেলাম। এক প্রাক্তন ছাত্র ইদানীং কর্মকর্তা হইছেন, উনিই আমাকে দ্রুত এনওসি পাইতে সাহায্য করলেন।

কিন্তু শেষ সময়ে আইসা দেখা গেল যাওয়ার দিন (৬ ফেব্রুয়ারি) একটা মাস্টার্স পরীক্ষার ভাইবার দ্বিতীয় দিন, সেই কমিটির একজন সদস্য আমি। আর আমার এক অতিপ্রিয় সহকর্মী লিটন কুমার বিশ্বাসের কন্যার প্রথম জন্মদিনও। লিটন বলল পরদিন যাইতে, কিন্তু তখন টিকেট কেনা হইয়া গেছে। শেষ সময়ে ট্রেনের বদলে বাসে যাওয়া ঠিক করার পর বাসের তিনটা টিকেট এক সঙ্গে পাওয়া গেছে এই বেশি, পাল্টানের কোনো উপায় নাই।

আমি ভাইবা নিয়া বাসায় আইসা একই শাড়ি পরিহিত অবস্থায় ঢাকা রওনা দিলাম। দুই ঘণ্টায় ঢাকা পৌঁছাইয়া তিন ঘণ্টা বনানীর জ্যামে বইসা থাকলাম। অবশেষে প্রকৃতিদের কলাবাগানের বাসায় যখন পা রাখলাম তখন বাসের সময় প্রায় হইয়া গেছে। কোনো রকমে কাপড় পাল্টায়া বাস ধরার জন্য গেলাম কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড।

প্রকৃতি আমারে বলল, আগামি ২৪ ঘণ্টা জার্নিতে থাকতে হবে, কাজেই শাড়ি না পরাই ভাল বুদ্ধি ।

তখন মিরপুর রোডে বেদম জ্যাম। একটা পিচ্চি বাস আমাদেরে কলাবাগান থাইকা নিয়া কল্যাণপুর দিয়া আসলো। নয়টার মধ্যে আসল বাসটা আসার কথা থাকলেও সেইটা আসলো রাত বারোটায়।

যতক্ষণ আমরা কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডে বইসা থাকলাম, সময়টা খুব খারাপ কাটে নাই। মুমুর বন্ধু কল্যাণ, শাশ্বতী আর আনহা আসলো আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। সঙ্গে আনহার পোষা কুকুর মাম্বা। মাম্বা আবার যে কোনো কারণেই হোক মুমুরে খুব ভাল পায়। দেখা হইবার সঙ্গে সঙ্গে সে মুমুর কোলে উইঠা পড়ার চেষ্টা করে, যদিও তার সাইজ কোলে ওঠার মতন না। মাম্বা একজন মুডি ধরনের কুকুর, যখন তার ইচ্ছা হয় সে গুটিশুটি মাইরা পছন্দের মানুষের সঙ্গে বইসা বা শুইয়া থাকে, আবার মুড হইলে অস্থির ভাবে হাঁটাহাঁটি করে।

সেইদিন মাম্বার শুইয়া-বইসা থাকার মুড ছিল না। কাজেই কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডের লোকজনরে তটস্থ কইরা ফালাইল সে, অস্থিরভাবে পায়চারি কইরা। কিছু লোকজন মাম্বার কারণে তাদের অজু নষ্ট হইতেছে বইলা বিরক্তি প্রকাশ করলেন।

বাস চলা শুরুর পর থাইকা তেমন কিছু করার থাকল না। বাসা থাইকা আনা রুটি-মাংস দিয়া আমরা রাতের খাওয়া সাইরা নিলাম। ফেরিতে বাস ওঠার পর আমরা বাস থাইকা নাইমা হাঁটাহাঁটি করলাম আর বাথরুমেও গেলাম। বাথরুম কইরা আসার সময় আমি খাইলাম একটা সিদ্ধ ডিম। শান্তিনিকেতনে পৌঁছার পরে যখন আমার স্টমাক আপসেট হইল তখন বুঝলাম যে ফেরিতে সিদ্ধ ডিম খাওয়াটা বিরাট বেকুবি হইছে।

বেনাপোল বর্ডার, ঐতিহাসিক এই জায়গা দেইখাই আমার সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতার কথা মনে পড়ছে।

বাস বেনাপোল পৌঁছাইল সকালের দিকে। ময়মনসিংহ থাইকা আরো কম সময়ে বেনাপোল যাওয়া যায় কিন্তু আমি যেহেতু পথঘাট চিনি না, আর একা একা যাইবার সাহসও আমার নাই, তাই অতখানি এক্সট্রা জার্নি কইরা আমারে বেনাপোল পৌঁছাইতে হইল।

যশোর রোড দেইখা বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করলাম—অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতার কারণে নাকি সম্প্রতি যশোর রোডের রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য গাছ কাইটা ফেলার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে লোকজনের পোস্টানো ছবি দেইখা তা বলতে পারব না। মহীরুহ ধরনের গাছ তো বটেই, সাধারণ কাঠগোলাপ কিংবা কমবয়সী টিংটিঙা বকুল গাছ কাইটা ফেলতে দেখলেও আমার প্রচণ্ড রাগ লাগে আর কষ্ট হয়। যশোর রোডের গাছগুলা কেউ কাটতে চাইতে পারে কেমনে সেইটাই আমার মাথায় ঢোকে না।

বর্ডার ক্রস করার জন্য আমাদের অনেকক্ষণ দাঁড়াইতে হইল। বিরাট লম্বা লাইন ছিল। অনেকে চামে লাইনের ভিতরে ঢুইকাও যাইতেছিল। বিতিকিচ্ছিরি একটা মিসম্যানেজমেন্ট চলতেছিল সেইখানে। অবশেষে যখন বর্ডারের বিরাট গেইটের ছোট অংশ দিয়া ভারতে ঢুকতেছি তখন প্রকৃতি এক অফিসারের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলতেছিল। ও যেহেতু বিশ্বভারতীর ছাত্রী তাই আশা করা গেছিল যে লাইনে এর একটা সুবিধা পাওয়া যাবে। রেগুলার যাতায়াত করার অভিজ্ঞতা থাইকা ও জানত যে ইন্ডিয়ার ট্রেইনের টিকেট আগে থাইকা কাটা থাকলে স্টুডেন্টদের ছাইড়া দেওয়া হয়। সেই অফিসার তা দেন নাই দেইখাই কথাবার্তা।

আমি কথাবার্তার বিষয় তখন কিছু বুঝতেছিলাম না। অফিসার আমার চেহারা দেইখা বুঝল যে আমি আলাপটা বুঝতেছি না। খুব বিজ্ঞের মতন একটা হাসি দিয়া কইল, “কুছ সামাঝ মে নেহি আয়া?”

আমি না সূচক মাথা নাড়াইলাম। তখন সে আবার হাইসা কইল, “থোড়া হিন্দি সিখো, সিরিয়াল দেখো।”

আমি বিড় বিড় কইরা কইলাম, “সিরিয়াল দেখা লাগবে কেন? ভার্সিটির হিন্দি ডিপার্টমেন্টেই দলে দলে ভর্তি হমু আমরা এখন।”

পার হইয়া গ্রিনলাইনের কাউন্টার থাইকা টাকা ভাঙাইলাম আমরা। আগের বার শিলং যাইবার সময় যে রেট পাইছিলাম এইবার তার থাইকা কম ইন্ডিয়ান টাকা পাওয়া গেল। শিলং থাইকা আসবার সময় আমার কাছে অনেকগুলা ইন্ডিয়ান টাকা রইয়া গেছিল, সেই ভরসায় আমি আর টাকা পালটাইয়া আনি নাই। কিন্তু আসবার আগে ব্যাগ খুইলা দেখলাম যত টাকা আছে ভাবছিলাম আসলে তত নাই। হয় আমার হিসাবে ভুল হইছিল কিংবা চুরি হইছে। ইন্ডিয়ান টাকা যেহেতু খরচ হইয়া যাওয়ার সম্ভাবনা নাই, ধইরা নিলাম প্রথমটাই। কেউ চুরি করলে তো আর খাতির কইরা কিছু টাকা রাইখা দিবে না ব্যাগে।

একটা ভোডাফোনের সিম কিনলাম বাংলাদেশ প্যাকেজসহ। ভারতের ইন্টারনেট আর মোবাইল সেবার যে সুনাম বহুদিন ধইরা শুইনা আসতেছিলাম এই সিম ব্যবহার কইরা আমার সেই সশ্রদ্ধ ধারণা মাঠে মারা গেল। পরে আমারে একজন কইল বর্ডার থাইকা সিম কিনতে নাই। সেইখানে সব উলটাপালটা জিনিস গছায়া দেয় লোকজন। আমি তড়িঘড়ি সিম কিনছিলাম কারণ আগেরবার শিলং গিয়া ফোন না থাকাতে বাসার সঙ্গে যোগাযোগ করা মুশকিল হইয়া গেছিল।

একটা অটোরিকশা ভাড়া কইরা আমরা গেলাম বনগাঁ স্টেশনে। এতই টায় টায় সময়ে পৌঁছাইলাম যে স্টেশনটা কেমন দেখতে সেইটাই আমার মনে পড়তেছে না এখন।

দৌড়াইয়া ট্রেইনে উঠলাম। ইন্ডিয়ায় সব ট্রেইন ঘড়ি ধইরা চলে এই কথা আগেই জানা ছিল। অঞ্জন দত্তের গানে শুনছি, “বোকা কোকিলটার গলা শুকিয়ে কাঠ, গাড়ি আজ লেটে দৌড়োচ্ছে।” আমাদের দেশে গাড়ি সবসময়ই লেটে আসে, লেটে ছাড়ে। এই দেশের ফেরিওয়ালার জবানিতে গান হইলে কইত, “গাড়ি আইজকা টাইমে যাইতেছে।”

গাড়িতে কোনো বসার জায়গা ছিল না। আমরা বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকলাম। কয়েক স্টেশন পরে কিছু লোক নাইমা গেলে বসার জায়গা পাওয়া গেল। যাগর লগে বসছিলাম তারা আমাদের কথোপকথন শুইনাই বুঝলেন যে আমরা বাংলাদেশ থাইকা আসছি। এক ভদ্রলোক বললেন যে উনার খুব বাংলাদেশে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু উনি শুনছেন বাংলাদেশে হিন্দুদেরে পাইলেই মাইরা ফেলা হয়, তাই ভয়ে যান নাই। উনার এই কথা শুইনা আমার রাগ ক্ষোভ দুঃখ হতাশা অনেক কিছুই বোধ করার কথা। কিন্তু আমি উনার ভুল ধারণা ভাঙাইতে এতই ব্যস্ত হইয়া পড়লাম যে এই সব অনুভব করার সময়ই পাইলাম না। পরে ভাইবা দেখলাম, দেশটা যে হিন্দু (বা মুসলমান বাদে অন্য যে কোনো) সম্প্রদায়ের জন্য অনিরাপদ হইয়া উঠছে সেইটা তো আর ভুল না।

শিয়ালদা স্টেশনে নাইমা ছবি তোলার জন্য পোজ দিলাম, মুমুরে বললাম স্টেশনের নামসহ তোলো।

শিয়ালদা স্টেশনে আইসা আমি মুমুরে বললাম দুইএকটা ছবি তুইলা দাও। শিয়ালদা স্টেশনের নাম এতবার এত বইতে পড়ছি, সেইখানে গেলাম, তার স্মৃতি রাখা দরকার। প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়া শিয়ালদা থাইকা হাওড়া স্টেশনে যাইবার পথে বিকালের আলোয় এক ঝলক দেখতে পাইলাম স্বপ্নের শহর কলকাতার একাংশ। ছোটকাল থাইকা পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য অনেক পড়ার কারণে কলকাতা সম্পর্কিত এক ধরনের মুগ্ধতা আমার ছিল। এইটা অবশ্য ‘দ্য গ্রাউন্ড বিনিথ হার ফিট’ পড়ার পরে বম্বে নিয়াও হইছে, অসংখ্য বলিউডি ছবি দেখার পরেও বম্বে শহরে যাইতে কোনোদিন ইচ্ছা করে নাই, কিন্তু রুশদির ন্যারেটর উমিদ মার্চেন্ট সেই শহরকে ‘ব্রেকার অফ মাই হার্ট’ বলার পর আমার মনে হইছে মরার আগে একবার বম্বে আমি যাইতে চাই।

হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুইকাই আমার মনে পড়লো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আছে ও নেই’ কবিতার কথা। কবিতার প্রথম লাইনেই সম্ভবত ‘হাওড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে’ শব্দগুলি ছিল। একজন নগ্ন পুরুষ পাগলকে দেইখা কয়েকজন হিজড়ার প্রতিক্রিয়া নিয়া সেই কবিতা। কবিতার একটা লাইনে ছিল সূর্য থাইকা গল গল কইরা কালি ঝইরা পড়ার কথা, সেইটা একটা আজব কনসিট, অন্তত অল্প বয়সে তেমনি মনে হইছিল আমার, তাই মনে আছে। হিজড়াদের নিয়া সেই কবিতা সম্ভবত কবিতা হিসাবে খুব উন্নত মানের না। হিজড়াদের হিজড়া হওয়া নিয়া যদি কোনো হতাশা থাইকাও থাকে তারা সম্ভবত সেইটা এইভাবে প্রকাশ করে না। সম্প্রতি অরুন্ধতী রয়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ (যে উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র আনজুম নামের একজন হিজড়া) পড়ার পরে আমার মনে হইছে মেলোড্রামাটিক সেই কবিতাটা সম্ভবত সুনীলের দেখা কোনো ব্যতিক্রমধর্মী বিচ্ছিন্ন ঘটনার রোমান্টিসাইজড বর্ণনা।

হাওড়া স্টেশন থাইকা আমরা ট্রেইনের যে বগিতে চাপলাম সেইটা মহিলা কম্পার্টমেন্ট, উপরের বাংকে আমরা জায়গা পাইলাম। ৬৫ কেজি ওজন নিয়া সেই বাংকে উঠার সময় যে ডিফিকাল্টি হইল তাতে কইরা বুঝলাম আমার বেশ বয়স হইছে। আমার মেয়ের জন্মের পরেও আমি বাসের ছাদে উইঠা ধোবাউড়া গেছি। কোনো রকম দুর্ঘটনা না ঘটায়াই সফলভাবে নামতেও পারছি। কিন্তু বাংকে ওঠা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য মনে হইল।

পরে বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা আসলে অভ্যস্ততার। আমাদের উল্টা দিকের বাংকে এক মেয়ে এক লাফে উইঠা গেল, তার ওজন আমার চাইতে এক কেজিও কম হবে না। বরং দুই এক কেজি বেশিও হইতে পারে। সে সুন্দরমত বাংকে উইঠা ব্যাগ থাইকা কী একটা খাবার বাইর কইরা খায়া, লগের বোতল থাইকা পানি খায়া ব্যাগে হেলান দিয়া ঘুমায়া গেল।

এই মেয়েটা আইসাই বাংকে রাখা লাগেজগুলা সরাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়ছিল নিজের বিশাল বপুটার জায়গা করার জন্য। তখন আমাদের নিচের সিটে বসা আরেকটা মেয়ে জিনিসপত্র রিঅ্যারেঞ্জ কইরা জায়গা কইরা দিল। কয়েক স্টেশন পরে জায়গা খালি হওয়াতে আমরা যখন নাইমা আসলাম তখন দেখা গেল মেয়েটা শুধু পরোপকারী আর উদ্যমীই না, খুব মিশুকও। সে আমাদের কথার টান শুইনা জিগাইল, “আপনারা বাঙাল? মুমু বলল, “আমরা বাংলাদেশের লোক।” তখন মেয়েটা বলল, “আবার মুশলমান টুশলমান নয় তো?”

বনগাঁ থাইকা আসার সময় যে ভদ্রলোকের লগে আলাপ হইছিল তিনি ভাবতেছিলেন যে বাংলাদেশে হিন্দু নাই, শাঁখাসিঁদুর পরা দেখলেই মাইরা ফেলবে, এরা আবার হয়ত ভাবছেন বাংলাদেশে শুধু হিন্দুরাই বাঙালি (উনাদের ভাষায় বাঙাল), মুসলমানরা উর্দু বলে।

আমাদের পুরা নাম জিজ্ঞেস করল মেয়েটা। আমি আর মুমু যমজ বইলা চেহারা দেইখাই বোঝা যায় দুই বোন, প্রকৃতি আমাদের কী হয় জিজ্ঞেস করাতে মুমু যখন বলল ননদ হয় তখন সেই মেয়ের আক্কেল গুড়ুম। প্রকৃতির নামে চট্টোপাধ্যায় শুইনা ওর আর ওর মায়ের মনে একটু সম্ভ্রম জাগছিল, ব্রাহ্মণ বইলা কথা। কিন্তু ব্রাহ্মণ বাড়ির বউ কেমনে মুসলমান হয় সেইটা আর তারা মিলাইতেই পারতেছিল না।

তারপরে তারা জিগাইল আমরা শান্তিনিকেতন কই যাইতেছি। প্রকৃতি ওইখানে পড়ালেখা করে আবার ওর শ্বশুরবাড়িও ওইখানে শুইনা ওদের চোখ কপালে উইঠা গেল। প্রকৃতির হাতে শাঁখা আর কপালে সিঁদুর নাই দেইখা সেই মেয়ের মা আপত্তির সুরে বললেন, “কিন্তু লোহাটা পরতে হ’তো।”

উল্টা দিকে বসা এক ভদ্রমহিলা প্রশ্রয়ের হাসি হাইসা এমন ভাবে মাথা নাড়াইলেন যে তাতে স্পষ্টই বোঝা গেল যে প্রকৃতির বিবাহিত হবার তথ্যটা উনি বিশ্বাস করেন নাই। প্রকৃতির মা কৃষ্ণা কাকিমাও যে সব সময় শাঁখাসিঁদুর পরেন না সেইটা শুনলে হয়তো হার্ট অ্যাটাক হইয়া যাইতে পারে—আমরা সেই তথ্য তাদেরে দিলাম না।

বোলপুর স্টেশনে নাইমা আমাদের আর তাড়াহুড়া করা লাগল না। রবীন্দ্রনাথের বিরাট ম্যুরালের সামনে দাঁড়াইয়া ছবিও তুললাম যদিও সবাই খুব ক্লান্ত। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির মাঝামঝিও শীত শীত লাগে। বোলপুরে তখন মাঘের শেষেই বসন্ত চইলা আসছে, শীত নাই বললেই চলে। টোটো ভাড়া কইরা আমরা প্রকৃতির বাসায় গেলাম, এলাকাটার নাম রতনপল্লী। আমাদের এখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশারে নসিমন বলে, কোথাও কোথাও ময়ূরী বলে। শান্তিনিকেতনে বলে টোটো।

প্রকৃতি আর বুশরার বাসার ভিতর থাইকা তোলা ছবি।
রতনপল্লীতে ‘শেষের কবিতা’ নামে এই বাড়ির একদিকের গেইটে বাংলায় অন্যদিকের গেইটে ইংরেজিতে বাড়ির নাম লেখা, আমার ধারণা এই নামে আরো কিছু বাড়ি শান্তিনিকেতনে থাইকা থাকতে পারে।

মুমুর কাছে প্রকৃতির বাড়ি আর কোপাই নদীর বর্ণনা শুইনা কল্পনায় একটা ছবি দেখছিলাম। বাস্তবে সেই বাড়ির সঙ্গে আমার কল্পনার বাড়ির কোনো মিল নাই। তবে এত সুন্দর বাড়িতে আমি আগে কখনো থাকি নাই। এত সুন্দর বাড়ি আমি আগে দেখিও নাই আসলে।

 কোপাই নদী দেখতে যাইতেছিলাম, আমি, প্রকৃতি আর বুশরা; মুমুর তোলা ছবি।

ঢাকার ধানমণ্ডিতে আগে এই ধরনের অনেক বাড়ি ছিল। ছোটবেলা আমার খালাত ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি গেছি, অল্প অল্প মনে আছে। মমেনসিঙ শহরেও এই ধরনের উঠানওয়ালা গাছপালাওয়ালা কিছু বাড়ি আগে এক সময় ছিল। ‘লৌহিত্যের ধারে‘র প্রথম পর্বে আমি কালীবাড়ি বাইলেনে বড়খালামনির বান্ধবি রুকু খালামনির বাপের বাড়ি ‘জঙ্গলবাড়ি হাউজে’র কথা লিখছিলাম। সেই বাড়িটা সুন্দর ছিল, প্রকৃতি আর বুশরার বাড়ি ‘সুখনীড়ে’র চাইতে অনেক বড়ও ছিল, কিন্তু সেইটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আশেপাশের ঘরবাড়ির সঙ্গে টোটাল মিসম্যাচ সেই বাড়ি। কিন্তু রতনপল্লীর সব বাড়িই এত সুন্দর। একতলা, দোতলা, বেশি হইলে তিনতলা। প্রকৃতির শাশুড়ির বাড়ি ‘মমতা’ তিনতলা। সব বাড়ির সামনে ফুল ফুইটা আছে, গেইটেও ফুলের ঝাড়। সুন্দর সুন্দর নামওলা সেই বাড়িগুলার হোল্ডিং নাম্বার লেখা নাই। কিছু কিছু বাড়িতে নেমপ্লেটে তিনচারজনের নাম লেখা। সম্ভবত স্বামী স্ত্রী এবং তাদের সন্তানদের নাম—মানে পরিবারের সবার নাম বাড়ির বাইরে লেখা।

প্রকৃতি আর বুশরা (প্রকৃতির বন্ধু) অবশ্য বলল শান্তিনিকেতনে আরো অনেক পাড়ায় আরো সুন্দর সুন্দর বাড়ি আছে। কিন্তু আমি রতনপল্লী দেইখাই মুগ্ধ। প্রকৃতিদের বাড়িটার সঙ্গে একই কম্পাউন্ডে দুইটা বাড়ি, আরেকটাতে সম্ভবত বাড়িওয়ালা থাকেন। শান্তিনিকেতনের অধিকাংশ বাড়ি সারাবছর খালি পইড়া থাকে। বাড়ির মালিকেরা থাকেন কলকাতায়। বড় শহরের ব্যস্ত জীবনে হাঁপাইয়া উঠলে শান্তিনিকেতনে আইসা রেস্ট নিয়া যান। অনেকে বাড়ি ভাড়া দেন, অনেকে দেন না।

আমরা যেদিন পৌঁছাইলাম তার পরদিন বৃহস্পতিবার। বিশ্বভারতীতে সবকিছু বন্ধ থাকে বৃহস্পতিবারে। আমরা ছিলামও খুব ক্লান্ত, তাই মোটামুটি সারাদিন আমরা ঘুমাইলাম। পরদিন প্রকৃতিদের কলাভবনে গেলাম। সেইখানে ওদের মামির দোকানে নাশতা খাইলাম। প্রকৃতিদের বন্ধু ঊর্ণা আর জয়িতার সঙ্গে আলাপ হইল। আরো কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হইছিল, বাংলাদেশের আরেকজন ছাত্র, সঙ্গীতে পড়ে, নাম রিপন, তার সঙ্গে সঙ্গীত ভবন ঘুইরাও আসলাম।

কাসাহারা নামের ক্যাফে।
কলাভবনের একটা বিল্ডিং, এইটা যে কোন বিভাগের তা এখন আর মনে পড়তেছে না।

আমাদের এইখানে মানবিক শাখার বিভাগগুলা যেইখানে থাকে সেই অনুষদগুলাকেই কলাভবন বলা হয়। ঢাকা ভার্সিটির কলাভবনে তো এই সেইদিন পর্যন্ত সামাজিক বিজ্ঞানের বিভাগগুলাও ছিল। কিন্তু শান্তিনিকেতনে ইংরেজি বাংলা হিন্দির মতন বিভাগগুলা কলাভবনের মধ্যে না, সেইগুলা আলাদা, ভাষাভবন বলে সেই অনুষদকে। আর বাংলা হিন্দি চিনা সব বিভাগের জন্য আলদা আলদা বিল্ডিং আছে। কলাভবনে শুধু ফাইন আর্টস আর পারফর্মিং আর্টসের বিভাগগুলাই । একটু দূরে দূরে অনেকগুলা বিল্ডিং, ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র বিল্ডিং। সবকয়টা বাড়ির ইউনিক ডিজাইন। মুমুর মতে, দূর থাইকা দেখলে মনে হয় খেলনা বাড়ি।

এই সেই বিখ্যাত ব্ল্যাক হাউজ।

ব্ল্যাকহাউজ বইলা একটা বাড়ি আছে সেইখানে চারুকলার মাস্টার্সের ছেলেরা থাকে আর কাজ করে। সেই বাড়িটাও দেখতে চমৎকার। আসলেই কালো একটা বাড়ি। দুপুরে আমরা খাইলাম ‘কাসাহারা’ নামের ক্যাফেতে। সেইটা একজন জাপানি শিল্পীর নামে করা খাবারের দোকান। লেমোনেড বইলা অতি মিষ্টি যে লেবুর শরবত দিছিল সেইটা খাইতে তেমন ভাল না লাগলেও দুপুরের খাবার বেশ ভাল ছিল। দাম অনুযায়ী পরিমাণ যথেষ্ট। আমরা তিরিশ পার হইয়া খাওয়া দাওয়া কন্ট্রোল করি, কমবয়সী ছাত্রছাত্রীদের তো অনেক খাইতে হয়, ওদের মতন বয়সে আমরাও প্রচুর খাইতাম। থালিতে যে খাবার দেওয়া হয় সেইটা সেট মেনু। পাঁচজনে খাবার জন্য পাঁচটা থালি নিতে হয় নাই।

শান্তিনিকেতন গেলেই আমার খুব ভাল লাগবে এই কথা মুমু আমারে আগেই বলছিল। ওইখানে অনেক কিছুই জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের মতন। আবাসিক থাকতে হয় বইলা সবাই সবাইরে চিনে। আমরা যেমন প্রান্তিকে আড্ডা দিতাম, বিশ্বভারতীর ছেলেমেয়েরাও অনেকে আড্ডা দেয় নবদ্বীপ বইলা একটা জায়গায়। সম্ভবত কোনো একটা দোকানের নাম থাইকা পুরা জায়গাটার নাম নবদ্বীপ হইয়া গেছে।

সঙ্গীত ভবন থাইকা ফেরার সময় এক জায়গায় মাঠের মধ্যে দাঁড়াইয়া চোখ বন্ধ করলাম আমি। গন্ধ আর শব্দে আসলেই মনে হইল জাহাঙ্গীরনগর চইলা আসছি, কিছু গাছপালা কমন বইলা প্রাকৃতিক পরিবেশে খুব একটা পার্থক্য নাই।

বোলপুরের আবহাওয়া নাকি অনেক গরম। ফেব্রুয়ারির সেই সময়টাতে গরম একেবারেই ছিল না। আর মে-জুন মাসে জাহাঙ্গীরনগরেও চান্দিফাটা গরম পড়েই। নবদ্বীপেই সুবোধের একটা গ্রাফিতি দেখতে পাইলাম। সামনে থাইকা দাঁড়ানো সুবোধের ছবিতে শিরোনাম—“সুবোধ তুই তৈরি হ।” শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগরের এই জায়গাটায় প্রচুর অমিল। স্থায়ী উপাচার্য না থাকলে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে বিরাট আন্দোলন হইত। বিশ্বভারতীতে তেমন কোনো আওয়াজ নাই।

স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগের দাবিতে ব্যানার ।

বাসায় আসার পর মুমু একটা ঘুম দিল। আমি বিকালবেলা ঘুইরা না বেড়ায়া ঘুমানের কোনো অর্থ খুঁইজা পাইলাম না। একা একাই ঘুরতে বাইর হইলাম। যদিও বেশিদূর যাওয়ার সাহস হয় নাই। রতনপল্লী থাইকা বাইর হইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে সুবর্ণরেখা নামে যে বইয়ের দোকান আছে সেইখানে গেলাম, দুই একটা বই কিনলাম। ফলপট্টি বইলা একটা বাজার মতন জায়গা আছে, সেইখানে মাটির ভাঁড়ে চা খাইলাম। সন্ধ্যাবেলা প্রকৃতি আর বুশরা কাজ সাইরা ফিরলে আমরা গেলাম মাঘমেলায়।

শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা বিখ্যাত। বিখ্যাত হইতে হইতে এমন অবস্থা হইছে যে কলকাতার বিখ্যাত ব্র্যান্ডরা তাদের মালপত্র বেচতে পৌষমেলায় চইলা আসে। গ্রাম্য মেলার অ্যাপিল আর নাই তাতে। প্রকৃতির মতে ‘বেলাশেষে’ ছবিটা হিট হইবার পরে শান্তিনিকেতন খাঁটি টুরিস্ট স্পট হইয়া উঠছে কলকাতার মানুষের কাছে। আগে যাদের বাড়ি ছিল তারা ছুটি কাটাইতে শান্তিনিকেতন যাইতেন, এখন যাগর বাড়ি নাই তারাও যান। প্রকৃতি গত চার বছর ধইরা শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া করতেছে। কাজেই পরিবর্তনগুলা ওর চোখে পড়ছে। পৌষমেলা আর দোল হইল শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী ব্যাপার। বাঙালীরা এই দুইটারে অনেক বেশি উদযাপন করতে চাইলে তাদেরে নিশ্চয়ই দোষ দেওয়া যায় না।

মাঘমেলা পৌষমেলার মতন অত জাঁকজমকের কিছু না। তবু সেই মেলা থাইকা আমি একগাদা জিনিসপত্র কিনলাম। আগের বার শিলং গিয়া পরদিন ফিরা আসছিলাম, কারো জন্য কিছু কিনতে পারি নাই। ভাবলাম এইবার কিছু না কিছু স্যুভেনির নেওয়া দরকার। মুমু অবশ্য বার বারই বলতেছিল, যতই জিনিস কিনি সবার জন্য কেনা সম্ভব হবে না। আত্মীয়বন্ধুর সংখ্যা অনেক। একজনরে দিলে আরেকজনরেও দেওয়া লাগে উপহার। কয়েকজন বন্ধু আর সহকর্মী আছেন যারা আমারে কোনো উপলক্ষ্য ছাড়াই উপহার দিয়া থাকেন, তাদের জন্য কিছু না নেওয়া অন্যায় হবে, তাই ছোট ছোট অনেকগুলা জিনিসপত্র কিনতে হইল।

প্রকৃতি বলল যে শনিবারের হাটে এইসব জিনিসপত্র পাওয়াই যায়, মেলা থাইকা কিনলে বরং দাম বেশি পড়ে। মেলায় ঘুইরা পিঠা খায়া আইসা পড়লাম আমরা। শনিবারে দিনের বেলা আমরা আরো দুয়েকটা ভবনে গেলাম। বাচ্চাদের যে ইশকুল আছে, ‘পাঠভবন’, সেইটাও দেখলাম। সামাজিক বিজ্ঞান ভবনে দেখলাম বালতিতে পানি নিয়া একজন মহিলা সিঁড়ি মুছতেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলা ঝাড়ু দিলেই আমরা খুশি হইয়া যাই, ত্যানা লইয়া মুছতে জীবনে দেখছি বইলা মনে পড়ে না।

শান্তিনিকেতনের ডাকঘর, এইখানে অমল নামের কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হইয়া গেলে মজা হইত।

ভবনের সামনে দেখলাম সাইকেল রাখার জন্য আলাদা জায়গা আছে। আমাদের দেশে সাইকেলের এত ব্যবহার নাই। জাহাঙ্গীরনগর বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অনেক বড় আর ঘুরতে বেশ রিকশাভাড়া খরচ হয়, তবু পোলাপান সাইকেল চালায় বেশ কম। শান্তিনিকেতনে টোটো ব্যাপারটা নতুন। আগে যানবাহন তেমন ছিলই না। তাই সাইকেল ছাড়া যাতায়াতের উপায় ছিল না।পায়ে হাঁইটা যাইবার পক্ষে এক জায়গা থাইকা আরেক জায়গার দূরত্ব অনেক বেশিই। কমবয়সী মেয়েরাই শুধু না, বেশিবয়সী মহিলারাও সাইকেল চালায়, মনে হইল ওয়ার্কিং ক্লাসের মহিলাদের আসলে সাইকেল ছাড়া গতি নাই। আপারক্লাস নারীদের মতন তাদের তো আর গাড়ি নাই।

আমি শান্তিনিকেতন আসব শুইনা আমার সহকর্মীরা যারা শান্তিনিকেতনে পড়ালেখা করছেন তাদের মধ্যে একজন, নগরবাসী বর্মন, (যাকে আমরা ডাকনামে পার্থদা ডাকি) বলছিলেন, “যান, দেখবেন দিদিরা কেমন সাড়ি চালিয়ে সাইকেল পরে আসচে।” বইলাই খুব হাসতেছিলেন। সম্ভবত কেউ কখনো চালানো আর পরা উলটাপালটা কইরা বলছিলেন, সেই থাইকা এইটা একটা জোক হইয়া গেছে। আর পশ্চিমবঙ্গের উচ্চারণে এস এইচের জায়গায় এস সাউন্ড তো আছেই।

ঘটিরা যেমন বাঙালদের ভাষা নিয়া হাসে, বাঙালরাও যে ঘটিদের ভাষা নিয়া হাসে—এইটা হয়ত পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই জানে না। অবশ্য আমাদের দেশেও এমন অনেক মানুষ আছেন যারা ঘটিদের ভাষাকে স্ট্যান্ডার্ড ভাবেন। মাগুরা বা যশোরের দিকের ভাষা তাদের কাছে অনেক ‘শুদ্ধ’। ক্রিয়াপদের ব্যবহারে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে মিলের কারণেই হয়তো তাদের এহেন ধারণা। তবে প্রকৃতির বন্ধু ঊর্ণা বলল যে সে জানে দুই পাড়ের লোকই পরস্পরকে নিয়া জোক বানায়, যেভাবে আমেরিকায় কালোরা সাদাদের নিয়া আর সাদারা কালোদের নিয়া জোক বানায়া থাকে।

আমার আর এক সহকর্মীরে দেখছি শান্তিনিকেতনের মানুষদের সম্পর্কেও অতি উচ্চ ধারণা। কালচারালি যতই আলাদা হোক, শান্তিনিকেতন নিশ্চয়ই পৃথিবীর বাইরের কোনো জায়গা না। তাই সেইখানেও কিছু মানুষ নিশ্চয়ই পিএনপিসি করে, কিছু পরশ্রীকাতর লোক সেইখানেও থাকার সম্ভাবনা আছে। একাডেমিক পরিবেশ হয়ত অনেক বেশি ফ্রেন্ডলি, কিন্তু তাতে প্রমাণ হয় না যে সেইখানে খারাপ লোক নাই।

শনিবারের হাটটা ভালই। তবে আসল হাট শুরু হওয়ার বহু আগে থাইকাই ফেরিওয়ালারা বইসা আছে, আর ভিড় একেবারে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরির মতন। একটু বেখেয়াল হইলেই দলছুট হইয়া যাওয়ার সম্ভাবনা। আমি আম্মার জন্য শাড়ি কিনলাম, আর কিছু ছোট ছোট জিনিস কিনলাম। টাকাপয়সা একটু বুইঝা খরচ করতে হইল। কারণ কলকাতায় গিয়া আমাদের হোটেলে থাকতে হবে, সেইখানে তো আর এমন আত্মীয়বাড়ি নাই। তাই দুইএকদিন কলকাতায় থাকার মতন পয়সাকড়ি হাতে রাইখা খরচ করতে হইল।

 

আসবার সময় আমরা কোপাই নদী দেখতে গেলাম। যাইবার পথে বুশরা আর প্রকৃতি আফসোস করতেছিল যে কী কী জানি কন্সট্রাকশন কইরা জায়গাটারে নষ্ট কইরা ফেলার পাঁয়তারা চলতেছে। ওদের কথা শুইনাই আমার পাড় বাঁধানের আগের ব্রহ্মপুত্রের চেহারা মনে পড়ল আর মনটা খারাপ হইয়া গেল। উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করার চর্চা ভারতেও আছে বুঝতে পারলাম। আসবার সময় প্রকৃতির শাশুড়ির সঙ্গে দেখা কইরা আসলাম। আমাদের দুইবোনকে এক ধরনের দুইটা শাড়ি উপহার দিলেন তিনি। তার বাড়ির বাইরেটার মতন ভিতরটাও খুব সুন্দর আর সাজানো গোছানো।

শনিবারের হাট, এইটা খাঁটি টুরিস্ট স্পট।

রবিবার সকালেও আমি যথারীতি একা একা ঘুরতে বাইর হইলাম। রবীন্দ্র মিউজিয়ামের ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ। বাইরেই দুইএকটা ছবি তুইলা আমার মামাতো ভাই বিনির জন্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আইনস্টাইনের ফটো স্যুভেনির হিসাবে কিন্যা নিয়া চইলা আসলাম। কাচমন্দিরে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ মনে হয়, সেইখানে ঢুকার চেষ্টা করি নাই, বাইরে থাইকা দেইখা ছবি তুইলাই চইলা আসছি।

একা ঘুরতে বাইর হইয়া শান্তিনিকেতনের রাস্তায় একা একা যে সেলফি তুলছিলাম সেইটার শিরোনাম দিছিলাম—’আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো’। রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান আমার মুখস্থ আছে। তখন মাথায় কী ফিলোসফি উঁকি দিছিল যে ওই গান মনে পড়ছিল তা এখন আর মনে নাই। পরে ভাইবা দেখলাম, সম্ভবত শান্তিনিকেতনের পথঘাট লাল মাটির আর মোরাম বিছানো তাই ওই গানটাই মনে পড়ছে। কিংবা এমনও হইতে পারে যে একা একা ফলপট্টি পাড় হইয়া বোলপুর পর্যন্ত যাইতে পারার সাহস হইল না বইলাই এহেন উপলব্ধি। রবীন্দ্রনাথের গান আমি শুনছি আর শুনছি। শুনতে শুনতে মুখস্থ হইছে প্রচুর গান। আসলে হয়ত ভিতরে ধারণ করতে পারি নাই। তা না হইলে ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ মনে পড়লো না ক্যান?

রবিবার বিকালে আমরা বোলপুর থাইকা কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার সেইটা শেষ দিন। আমরা কলকাতা গিয়া বইমেলাটা ধরতে চাইতেছিলাম। বুশরা আর প্রকৃতি আমাদেরে ট্রেইনে তুইলা দিল। শান্তিনিকেতনে আবার ফিরা যাওয়ার ইচ্ছা নিয়া আনন্দনগরের দিকে রওয়ানা করলাম আমরা।