page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কেবল টার্ডিগ্রেডরা

মূল. ডানা ভারিন্সকি

অনুবাদ. আয়মান আসিব স্বাধীন

বৈশ্বিক উষ্ণতা, পারমাণবিক যুদ্ধ কিংবা ভয়ানক রোগবালাইয়ের কবলে পড়ে মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কোনো এক ভবিষ্যতে। এমনকি এ রকমই কোনো কারণে নিশ্চিহ্ন হতে পারে পৃথিবীর বাকি সব জীব। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে, ছোট্ট একটি জীবসত্তা হয়তো টিকে থাকবে এতসব ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও!

কেউ কেউ বলেন ‘ওয়াটার বিয়ার’ (‘পানির ভাল্লুক’), আবার অনেকে ডাকেন ‘মস পিগলেট’ নামে—০.৫ মিলিমিটার আকৃতির এই প্রাণীর আসল নাম ‘টার্ডিগ্রেড’। বিচিত্রধর্মী আবহাওয়াতেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম এরা।

নতুন একটি গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, প্রায় -৪৫০ ডিগ্রি বা ৩০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রাতেও কয়েক মিনিটের জন্য বেঁচে থাকতে পারে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী। মাইনাস ৪ ডিগ্রী তাপমাত্রায় তারা বেঁচে থাকতে পারবে বছরের পর বছর; অথচ মানুষেরা উপযুক্ত নিরাপত্তা ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না ১০ ঘণ্টাও!

‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে মহাজাগতিক যেসব ধ্বংসাত্মক ঘটনায় পৃথিবী থেকে সকল প্রাণি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে—তা নিয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির তিনজন বিজ্ঞানী গবেষণা করেছেন।

যেহতু অস্তিত্ব রক্ষায় টার্ডিগ্রেডরা পৃথিবীর সবচাইতে বলিষ্ঠ প্রাণী, তাই বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীকেই তাদের ব্যারোমিটার হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন।

প্রাণের বিনাশ

পৃথিবী থেকে সব রকম প্রাণীর উপস্থিতি মুছে ফেলার জন্যে খুবই সহজ একটা উপায় হল, আমাদের সমুদ্রগুলির সমস্ত পানি উত্তপ্ত করে দেওয়া। কিন্তু তার জন্যে প্রায় ৫.৬ x ১০^২৬ জুল শক্তি প্রয়োজন! যা কিনা বর্তমান সময়ের অনুপাতে মানুষের উৎপাদিত সর্বমোট ১০ লাখ বছরের শক্তির সমান।

বড় কোনো উল্কাপিণ্ডের সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ হলে অথবা সুপারনোভা বা গামা-রে বিস্ফোরণ ঘটলে—এই তিন রকম পরিস্থিতিতেই কেবল এ পরিমাণ শক্তির উৎপাদন সম্ভব বলে অনুমান করা যায়।

এক্ষেত্রে সেই উল্কাপিণ্ডের আকার হতে হবে প্রকাণ্ড। যার ভর হবে ১.৭ x ১০^১৮ কেজি! সৌরজগতে সব মিলিয়ে মাত্র সতেরোটা প্রার্থী পাওয়া গেছে যাদের ভর এর কাছাকাছি—এদের মাঝে একটা আবার প্লুটো। এগুলির কোনোটিরই কক্ষপথ পৃথিবীর সাথে মিলে যায় না। ফলে পৃথিবীর সাথে তাদের ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা একেবারেই কম।

অন্যদিকে, গামা রে বিস্ফোরণ প্রচুর পরিমাণ শক্তিকে সঙ্কীর্ণ শিখার মাঝে কেন্দ্রীভূত করে। যদি এ রকম কোনো শিখা রশ্মি ৪২ আলোকবর্ষ দূর থেকে সরাসরি পৃথিবীর দিকে তাক করে এগিয়ে আসে—তাহলে সেই আঘাতে টার্ডিগ্রেডদের ধ্বংস হয়ে যাবার ভাল সম্ভাবনা আছে। তবে স্বাভাবিকভাবেই, এ রকম কোনো ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও বেশ অল্প।

আবার সুপারনোভা হল কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নক্ষত্রের বিস্ফোরণ। এতে পৃথিবীর সকল সমুদ্রের পানি উত্তপ্ত করে তোলার মত শক্তি পাওয়া যাবে খুব সহজেই। কিন্তু সেই বিস্ফোরণের উত্তাপ পৃথিবীতে আসার জন্য বিস্ফোরিত নক্ষত্রটির অবস্থান হতে হবে পৃথিবীর কাছাকাছি।

পৃথিবী থেকে ৩৯ আলোকবর্ষ দূরে ‘ট্র‍্যাপিস্ট- ওয়ান এফ’ নামক এই গ্রহটির বৈশিষ্ট্য অনেকটা পৃথিবীর মতই। (ছবিটি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে সেই গ্রহের কাল্পনিক চিত্র)

সূর্য বাদে অন্য যে নক্ষত্রটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছে তার নাম ‘প্রক্সিমা সেন্টাউরি’। কিন্তু এটি অনেক বেশি দূরে। সেখানে সুপারনোভা বিস্ফোরণ হলে (যদিও সুপারনোভা বিস্ফোরণের জন্য ওই নক্ষত্র উপযুক্ত না) তার প্রভাবে আমাদের ভূপৃষ্ঠে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে মাত্র ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

যেহেতু এই তিন রকম ঘটনাতেই পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাবার আশঙ্কা একেবারে নিম্ন পর্যায়ের, কাজেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন সূর্য ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকবে টার্ডিগ্রেড। যা কিনা আজ থেকে কয়েক বিলিয়ন বছর পরের ব্যাপার।

টার্ডিগ্রেডদের সহ্যক্ষমতা

টার্ডিগ্রেডদের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ‘এক্সট্রিমোফাইল’। যেসব প্রাণীদের এমন সব পরিবেশে খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে সচরাচর কোনো প্রাণী টিকতে পারে না—তাদের জন্যই এই নাম বরাদ্দ থাকে। প্রায় ৩০ বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকার শ্যাওলায় জমে থাকার পর তাদেরকে আবার জাগিয়ে তোলা হয়েছে। টার্ডিগ্রেডরা এমনকি মহাকাশেও বেঁচে থাকতে পারে।

‘দ্য কনভার্সেশন’ ওয়েবসাইটে টার্ডিগ্রেডের স্থিতিস্থাপক গুণাবলি নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছে। লেখাটিতে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলেছেন দুইজন লেখক।

তারা বলেন, “ভূ-পৃষ্ঠের চাপ ১০০০ অ্যাটমোস্ফিয়ার বাড়িয়ে দিন বা কমিয়ে একেবারে মহাকাশের শূন্যতায় নিয়ে যান—তারপরও তারা বেঁচে থাকে। খাবার বা পানি ছাড়াও তারা টিকে থাকতে পারবে ৩০ বছর। কয়েক হাজার গ্রে রেডিয়েশনেও তাদের কিছু হয় না, যেখানে ১০ গ্রে রেডিয়েশনই বেশিরভাগ মানুষের জন্য মারাত্মক বলে প্রমাণিত।”

আণুবীক্ষণিক প্রাণী ‘টার্ডিগ্রেড’ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় পৃথিবীর সবচাইতে বলিষ্ঠ প্রাণীদের একটি।

বর্তমানে টার্ডিগ্রেডের প্রায় ১,০০০ এরও বেশি প্রজাতি আছে যারা পৃথিবীর নানা রকম পরিবেশে বাস করছে। তাদের এই সহনীয়তার প্রাথমিক কারণ হল ‘ক্রিপ্টোবায়োসিস’ নামের একটি শারীরতাত্ত্বিক অবস্থা। এই অবস্থায় প্রাণীর বিপাকীয় কার্যক্রম একেবারেই শনাক্ত করা যায় না। ফলে তাদেরকে প্রায় মৃত বলে মনে হয়। শরীর একদম সংকুচিত হয়ে মাত্র তিন পারসেন্ট পানি অবশিষ্ট থাকে, দেহ হয়ে যায় সম্পূর্ণরূপে পানিশূন্য।

বিজ্ঞানীরা এখনো ক্রিপ্টোবায়োসিস নিয়ে ঘাটাঘাটি করছেন। অনেকে বলছেন এটা নাকি “জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি তৃতীয় একটি অবস্থান”।

সেই সাথে টার্ডিগ্রেডের অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় অনুষঙ্গ নিয়েও গবেষণা চলছে। ২০১৫ সালে এদের জিনোম সিক্যুয়েন্সিং করার সময় গবেষকরা জানতে পারেন, তাদের ডিএনএ’র ছয় ভাগের এক ভাগই এসেছে বহিরাগত প্রাণিসত্তা থেকে। যা কিনা বাকিসব প্রাণীদের ডিএনএ’তে মাত্র ১% এর মত থাকে। ধারণা করা হয়, ব্যাপক প্রতিকূলতার মাঝে টার্ডিগ্রেডদের ডিএনএ ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ হয়ে যায়। যেমন প্রচণ্ড শুষ্কতায় এমনটা হতে পারে। এরপরে যখন কোষগুলি পুনরায় পানি শোষণ শুরু করে, তখন সেগুলির ঝিল্লি ও ডিএনএ’কে ঘিরে থাকা নিউক্লিয়াস সাময়িকভাবে ছিদ্রযুক্ত হয়ে যায়। ফলে সেখান দিয়ে বড় বড় অণু প্রবেশ করতে পারে।

টার্ডিগ্রেডরা পুনরায় পানি গ্রহণের সময় এভাবেই নিজেদের ডিএনএ মেরামত করে আর একই সাথে বহিরাগত ডিএনএ শোষণ করে ফেলে।

আবার ২০১৬ সালে টোকিও ইউনিভার্সিটির কয়েকজন বিজ্ঞানী টার্ডিগ্রেডদের শরীরে এমন কিছু প্রোটিনের সন্ধান পেয়েছেন যা কিনা তাদেরকে ক্ষতিকারক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে।

এসব নানাবিধ ক্ষমতার আবিষ্কার বিজ্ঞানীদেরকে নতুন আঙ্গিক থেকে বিবর্তনের প্রক্রিয়ার দিকে তাকানোর সুযোগ করে দেয়। সেই সাথে এমন কিছু সূত্র আমাদের সামনে এনে দেয়, যার সাহায্যে আমরা মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলতে পারি।

ভিনগ্রহে প্রাণির অস্তিত্ব সন্ধানে এই গবেষণার প্রয়োগ

টার্ডিগ্রেডরা কতটা অসাধারণ তা প্রমাণ করা এই গবেষণার মুখ্য উদ্দেশ্য না। বরং বৃহৎ পরিসরে ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধানে তাদের এসব তথ্য অনেক সাহায্য করবে আমাদের। অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা তাই জানতে চান যে, যদি পৃথিবীর মত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ঘটে তাহলে সেখানে তা বিকশিত হবার সম্ভাবনা কতটুকু।

যদি পৃথিবীর মত অন্যান্য গ্রহে প্রাণের আগমন ঘটে থাকে—আর সেখানে যদি টার্ডিগ্রেডদের মত দৃঢ় প্রাণীর উদ্ভব হয়—তাহলে সেই গ্রহগুলিতে এখনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকার খুব ভাল সম্ভাবনা আছে।

এই সম্ভাবনা আমাদেরকে এলিয়েনদের সন্ধানে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। হয়ত আমরা পৃথিবীর মতই কোনো গ্রহে একদিন প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে পারি।

কিন্তু এই সুখবর ও আশ্বাসের পেছনে কিছু শর্ত আছে। টার্ডিগ্রেডদের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের মত প্রতিক্রিয়ামূলক ঘটনার প্রভাব বিবেচনা করেন নাই। ফলে এমন পরিস্থিতিও দেখা যেতে পারে যে, আকস্মিক কোনো বিপর্যয়ের পর সময়ের সাথে সাথে জটিলতর পরিবেশের সৃষ্টি হল—যা অবশেষে টার্ডিগ্রেডদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

আবার বিজ্ঞানীরা এমনটা ধরেই নিয়েছেন যে, পৃথিবীর মত বৈশিষ্ট্য আছে এমন গ্রহের প্রাণীগুলিও পৃথিবীর প্রাণীদের মতই হবে।

যাই হোক, গবেষকরা মনে করেন—মানবজাতির জীবন যতটা ভঙ্গুরই হোক না কেন, পৃথিবীর সকল প্রাণীর সামগ্রিক অস্তিত্ব অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু ও দৃঢ়।

 

সূত্র. বিজনেস ইনসাইডার, ১৪/৭/২০১৭

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বই : সিনে-লয়েড (২০১৭, চৈতন্য)