page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

“সম্পর্কের জ্ঞান হচ্ছে রাজনীতি এবং এখান থেকে মানুষের বন্ধুত্ব শুরু হয়।”—রিফাত হাসান

[রিফাত হাসানের বই সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি বের হয়েছিল ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলায়। সে সময় লেখকের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল তখনকার বাংলা ওয়েব পোর্টাল ডটকমে। এখানে সে ভিডিওর লিখিত রূপ প্রকাশ করা হলো। উল্লেখ্য রিফাত হাসানের এই বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ একই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে এ বছরের মেলায় পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয় ঢাকার আজিজ মার্কেটের দোতলায় ‘অন্তরে’ রেস্টুরেন্টে, মেলা শেষ হবার পরদিন, মার্চের ১ তারিখে। সাক্ষাৎকার নেন আশরাফুল আলম শাওন।]

আশরাফুল আলম শাওন

সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি, বইটা—এক কথায় জানতে চাই—কী ধরনের?

রিফাত হাসান

বইটার ব্যাপারে, যদি ধরন বলতে চান, তাইলে বলব যে এইটাতে পলিটিক্যাল ফিলসফি এবং সমকালীন রাজনীতি নিয়ে অ্যানালাইসিস করা হয়েছে।  তারপরে এইটার কনটেন্টের ব্যাপারে বলতে গেলে, আমার দীর্ঘদিনের লেখালেখিগুলোর একটা সংকলন করার চেষ্টা হইছে এখানে।

শাওন

এই বইতে যতগুলো লেখা আছে, প্রবন্ধ ধরনের লেখাই তো? টাইম পেরিয়ড, মানে কবে থেকে কবেকার লেখা এই বইতে রাখছেন?

রিফাত

সংকলনের ক্ষেত্রে অবশ্যই টাইম পেরিয়ডটারেই আমরা মনে রাখি নাই।  তবুও, ধরা যাক, পাঁচ ছয় বছর হবে—এরকম আর কি!

shamporko_rifat

সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি। রিফাত হাসান। দ্বিতীয় ও পরিবর্ধিত সংস্করণ। ফেব্রুয়ারি ২০১৬। প্রকাশক: দুয়েন্দে পাবলিকেশন্স, বারিধারা, ঢাকা। পরিবেশক: বাতিঘর, চট্টগ্রাম। প্রচ্ছদ: শফিক শাহীন। পৃষ্ঠা. ২৩২। দাম: ৫০০ টাকা।

শাওন

পাঁচ-ছয় বছরে আপনার রাজনীতি নিয়ে যত লেখা সব এই বইতে আছে?

রিফাত

পাশাপাশি আরো কিছু লেখাও আছে—যেমন কিছু লেখা আছে সাহিত্য ধরনের—গল্প।

শাওন

এই বইতে গল্পও আছে?

রিফাত

গল্প আসছে কয়েকটা। তিনটা বলতে পারেন। গল্প ঠিক বলা যায় না, গল্প ধরনের লেখা বলতে পারেন।  লেখাগুলোকে আমি রিলেট করছি এই বইতে একটা নাম প্রবন্ধ আছে—সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি।  আমি চেষ্টা করছি কী—আমার যাবতীয় লেখালেখি এবং এখানে যতগুলো লেখালেখি করছি—এই লেখালেখিগুলোকে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতির জায়গা থেকে বিচার করার চেষ্টা করছি—এমন কি গল্পগুলোকেও।  সেই জায়গা থেকেই গল্পগুলোকে রিলেট করছি।

রিফাত হাসান

সাক্ষাৎকারে কথা বলছেন রিফাত হাসান, ২০১৪

শাওন

গল্প যেগুলো আছে—গল্প ধরনের লেখা—এগুলোর বিষয় কি—মানে, রাজনীতিকেন্দ্রিক গল্পগুলো?

রিফাত

নাহ। ঠিক রাজনীতি বলা যায় না। কিন্তু আমি তো রাজনীতিকে, বা অন্য একটা জিনিসকে আলাদাভাবে ভাবতে চাই না। এখানে, আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে। আমি মনে করি কী, আমি যখন বলি, সম্পর্ক, তখন মনে করি যে আসলে মানুষের সম্পর্কের জ্ঞানই রাজনীতি। আমার লেখালেখি বা চিন্তার ফ্রেমওয়ার্কটা সেই জায়গা থেকে। এখন, আপনি যখন রাজনীতি করবেন এইটার একটা মোরাল গ্রাউন্ড হচ্ছে সম্পর্ক। সম্পর্কের জ্ঞান হচ্ছে রাজনীতি এবং এখান থেকে মানুষের বন্ধুত্ব শুরু হয়—আমি যেভাবে এখানে দেখার চেষ্টা করেছি। আর, বন্ধুত্ব হচ্ছে, আমি বলি যে, এইটা বন্ধের মুক্তি। আমার সঙ্গে যখন আপনার বন্ধুত্ব হবে, তখন বন্ধের মুক্তি ঘটবে।  এইটার মাধ্যমে মানুষের যেইটা রাজনীতি সেই ব্যাপারটা শুরু হয়। এই জিনিসটাকেই একটু বুঝার, মানুষের, সমকালীন রাজনীতিগুলোর সাথে, এমন কি বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেও রিলেট করে, আর সব ধরনের ঘটনা-অঘটন যেগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে জড়িয়ে আছে, আমাদের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে, আমাদের জাতীয়তা নিয়ে যেসব প্রশ্ন হাজির আছে—আবার, কবিতা থেকে শুরু করে নানান প্রশ্ন যেভাবে হাজির আছে—ওগুলোকে আমি রিলেট করার চেষ্টা করেছি এইসব লেখালেখির মধ্যে। শুধুমাত্র সীমিত অর্থের রাজনীতি নিয়ে লেখা বললে ভুল হবে।

শাওন

বাংলাদেশ কেন্দ্রিক রাজনীতি আসছে। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী আসে নাই?

রিফাত

সেই অর্থে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ততটুকুই আসছে যতটুকু বাংলাদেশের আলাপে প্রাসঙ্গিক হইছে।  তো, আমাদের এখানে, ধরেন, ভূমিকাতে আমরা একটা কথা বলেছি। সেইটা হচ্ছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গণমুক্তিযুদ্ধের দিক থেকে দেখা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘৭১-এ যে ঘটনাটা ঘটেছে, আমরা বাংলাদেশ বিপ্লব বলেছি।  এবং এই বিপ্লব বলাটা হচ্ছে, ইতিহাসে আমাদের এখানে একটা গণমুক্তিযুদ্ধ ঘটেছিল। গণমুক্তিযুদ্ধের দিক থেকে বাংলাদেশ বিপ্লবটাকে দেখার ব্যর্থতা হচ্ছে পুরো বাংলাদেশের ‘৭১-এর পরের ঘটনাগুলোর ব্যর্থতা। আমি মনে করি, যেমন ধরেন, ‘৭১-এর পরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে বা যে নেতৃত্ব ছিল, তাদের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে দুইটা ঘটনা ঘটেছে।  একটা হচ্ছে, হঠকারী নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশে একটি প্রতিবিপ্লবী নাগরিক সমাজ তৈরি হয়ে গেল।  এই নাগরিক সমাজ তৈরি হয়ে যাওয়ার কারণে, হলো কী, বাংলাদেশের বিপ্লবের পর যেইটা সম্ভাবনা ছিল, তারুণ্যের মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল, সাহিত্যের মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল, অপরাপর ঘটনাগুলোর ভেতরে যে সম্ভাবনাগুলো ছিল, এই সম্ভাবনাগুলো থেমে গেল ।

এইটার কারণে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টাকে কতগুলো বিষয়ে ভাগ করা হয়েছে।  মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাটাকে জাতীয়তার নামে গণহিস্ট্রিয়া তৈরি করা হয়েছে।  কিন্তু গণমুক্তিযুদ্ধের ভাবটা এরকম ছিল না।  গণমুক্তিযুদ্ধের ভাবটা ছিল, একটা সমাজের বিদ্যমান যেসব বে-ইনসাফি ছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রের আমাদের প্রতি যেসব বেইনসাফি ছিল, এগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের একটা মুক্তির বিদ্রোহ।  এই জিনিসটাকে আমরা গণমুক্তিযুদ্ধ বলছি সেজন্য, জনগণের দিক থেকে।  কিন্তু আমাদের নেতৃবৃন্দের দিক থেকে এরকম কোনো ঘটনা ছিল না মুক্তিযুদ্ধে।  নেতৃবৃন্দের দিক থেকে যে ঘটনাটা ছিল, একটা হচ্ছে ক্ষমতা দখল।  আর একটা ঘটনা হচ্ছে আরো বিভিন্ন রকমের বহিঃশক্তির সাথে জোট বেঁধে, নানান রকম ধান্ধা।  যেইটার কারণে এখানে কোনো কিছুরই মৌলিক ট্রান্সফরমেশন ঘটে নাই।  নেতৃত্বেরও কোনো মৌলিক ট্রানসফরমেশন ঘটে নাই।  আমাদের ভেতরে যেইটা বুদ্ধিজীবীতা, তা সবসময় এই যে প্রতিবিপ্লবী নাগরিক সমাজ কায়েম হয়েছিল, তাদের সাথেই তাল মিলিয়ে চলেছে এবং এই বুদ্ধিজীবীতা আসলে তাদেরই প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে সবসময়।  বুদ্ধিজীবীরা কখনোই, যারা গণমুক্তিযুদ্ধ করেছে তাদের প্রতিনিধি ছিল না।  সবসময় প্রতিনিধি ছিল তারা, যারা প্রতিবিপ্লবী হয়ে—এই বিপ্লবের প্রতিপক্ষ হয়ে সব সময় কাজ করেছে, তাদের।  এই ধরনের একটা ব্যাপার আমরা আমাদের এখানে দেখানোর চেষ্টা করছি।  তারপর, এই হচ্ছে, আপাতত, মানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নিয়ে আমরা এইভাবে শুরু করছি।  তারপর হচ্ছে, বর্তমান ঘটনাগুলোকে নিয়েও আমরা বুঝার চেষ্টা করছি।

শাওন

আর, মুক্তিযুদ্ধের পেছনে আপনি যে কথা বললেন যে, পরে মুক্তিযুদ্ধকে একটা জাতীয়তাবাদী কাজ হিসেবে দেখানো হয়েছে, মানে জাতীয়তাবাদী রূপ চলে আসছে মুক্তিযুদ্ধের।  কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কেন হয়? মুক্তিযুদ্ধের পেছনে কি জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল না? বা জাতীয়তাবাদী চেতনাই কি মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল না?

রিফাত

জাতীয়তাবাদী চেতনা বলতে, একটা জিনিস হচ্ছে, জাতীয়তাবাদী চেতনাটা কিন্তু এখন আমাদের এখানে যেভাবে হিস্ট্রিয়া আকারে হাজির আছে, সেই জিনিসটা ছিল না।  মানুষের দিক থেকে, গণমানুষের দিক থেকে সেইটা ছিল না।

শাওন

রাজনীতিবিদদের দিক থেকে সেইটা ছিল?

রিফাত

রাজনীতিবিদদের দিক থেকে থাকতেই পারে।  রাজনীতিবিদদের মধ্যে তো তাদের হরেক রকম ইন্টারেস্ট আছে, তাই অনেক কিছুই থাকবে।  কিন্তু ধরেন, গণমানুষের দিক থেকে যেইটা ছিল—সেইটা হল একটা অবিচার চলছে আমাদের এখানে, এই অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদেরকে প্রতিরোধ গড়তে হবে।  আমাদের এখানে যখন ২৫ মার্চ হামলা হল, তার আগের যেসব পাকিস্তান রাষ্ট্রের ফেনোমেনা আমাদের এখানে হাজির ছিল, এই ফেনোমেনাগুলোর বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ তৈরি করা আমাদের একটা কাজ ছিল।  আমাদের এখানে তো আসলে, যেমন ধরেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা, একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনাটাকে আমরা বলি যে ভাষার, যে, ধরেন, রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিপ্লব।  আসলে তেমন কোনো ঘটনা আমি মনে করি না।  আমি মনে করি যে আসলে এখানে বিদ্যমান যেসব বেইনসাফি চলতেছে, এইটার বিরুদ্ধে তখন একটা প্রতিবাদের অস্ত্র হয়েছে ভাষা।  ভাষাটা কোনো ফ্যাক্টই না।  রাষ্ট্রভাষা বাংলা করা ছাড়াও, অনেক রকম ঘটনা ঘটতে পারে।  ভারতে তো বাংলা ভাষা তেমন করে রাষ্ট্রভাষা না।  ওখানে কোনো প্রতিবাদ করতেছে? বা অনেকগুলো রাষ্ট্রভাষাই থাকতে পারে।  এইটা কোনো ফ্যাক্ট না।  ফ্যাক্ট তখন হয়ে দাঁড়ায়, যখন আপনার কিছু উর্দুভাষী এখানে বেইনসাফি চালাচ্ছে, তখন ভাষাটা একটা চিহ্ন হয়ে গেছে জাস্ট।  আর কিছু না।  আমাদের দিক থেকে।  এগুলো তো আসলে নেতৃবৃন্দ শুরু করে নাই।  নেতৃবৃন্দ বাধ্য হয়ে তখন এগুলোকে গ্রহণ করেছে মাত্র।

শাওন

আপনার বইয়ের প্রসঙ্গেই আসি আবার।  আপনি বললেন যে এইটা বাংলাদেশ কেন্দ্রিক, বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক, বাংলাদেশ কেন্দ্রিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক…

রিফাত

নাহ।  অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক না, সেইটা একটা দূরতর বিষয় হিসেবে আসতে পারে।  সম্পর্ক বিষয়টা হচ্ছে এখানে—আমার সাথে আপনার সম্পর্ক।  আমি মনে করি, যেমন, আমি আপনাকে সহজেই কথাটা বলি, যেমন ধরেন, আমি ঘরে বসে বসে ইবাদত করছি, নামাজ পড়ছি।  আমি মনে করতেছি এখানে কোনো পলিটিকস দাঁড়াচ্ছে না।  কিন্তু আমি, যেই মুহূর্তে আপনি দেখতে পান—এমনভাবে নামাজ পড়তেছি, বা আপনার দেখা হয়ে গেল, তখন এইটার একটা পলিটিকস দাঁড়ায়।  আপনার সাথে এইটার একটা ইন্টারেকশন তৈরি হচ্ছে।

শাওন

সেইটা তো আপনার সাথে বসে চা খাইলেও হয়!

রিফাত

এক্সাক্টলি, প্রত্যেকটা ঘটনায়।  তো, মানুষ যখন নিজে নিজে কোনো একটা কাজ করে—তখন সে নিজের জন্য, যখন আপনার সাথে আমার কোনো ইন্টারেকশন তৈরি হল এই কাজে, তখন আর শুধুমাত্র আমি নিজের জন্য করছি না।  আপনাকে মাথায় রেখেও আমাকে কিছু কাজ করতে হচ্ছে।  এখান থেকেই সম্পর্কের শুরু।  আমি এই জায়গা থেকেই মানুষের রাজনৈতিকতার শুরু—বলার চেষ্টা করেছি।  তো, এই সম্পর্কটা তখনই আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ হয়, যখন আপনার বন্ধের মুক্তি ঘটে।  বন্ধের মুক্তি বলতে, কতগুলো ইসলামি পরিভাষা আছে, আপনার, কোরান শরীফের কিছু পরিভাষা, সেটা হচ্ছে নফসের কতগুলো স্তরের কথা বলা হয়েছে, আমি স্তরগুলোর কথা এখানে ব্যবহার করছি।  নফসের একটা স্তরে মানুষ শুধু পশুর অবস্হায় থাকে।  একটা স্তরে পশু থেকে উন্নীত হয়ে মানুষ একজন আর একজনের কথা ভাবতে চেষ্টা করে, আমি সেই স্তরটাকে রাজনৈতিকতার স্তর বলার চেষ্টা করেছি।

শাওন

আপনি ইসলামের পরিভাষা এই বইতে ব্যবহার করছেন!

রিফাত

হ্যাঁ করছি।  এখানে একটা ব্যাখ্যা আছে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতির।  এই ব্যাখ্যাতে ইসলামের পরিভাষা ব্যবহার করে আমি চেয়েছি, আমাদের এখানে যে এক ধরনের ঘটনা জারি আছে—আমরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলি, বা রাজনীতি করতে চাই—এই ব্যাপারটাকে আমাদের এখানে কঠিন করে ফেলা হয়েছে।  এইটা দুইভাবে হয়েছে।  একটা অংশ কঠিন করেছে, ধরেন যারা বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনা করেন, তারা এই ধর্মীয় আলোচনাটাকে স্রেফ গোষ্ঠিগত আলোচনা বা একটা রিজিড আলোচনায় পর্যবসিত করেন।  এখানে আর কাউকে অ্যান্ট্রান্স দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করে না।  এই আলোচনার ভেতরে কোনো একটা লিবারাল স্পেস থাকে না।  যার কারণে দেখা যাচ্ছে, আমাদের এখানে মৌলভি সাহেবরা বা আলেম সমাজ যখন ইসলামের কথা বলেন, রাষ্ট্রের কথা বলেন, বা অন্য কিছুর কথা বলেন, সেখানে কিন্তু আপনার অ্যান্ট্রান্স থাকবে না।  বা আর একজন ধরেন, তার নাম ধরলাম সনৎ কুমার সাহা, তার স্পেস থাকবে না।  কিন্তু ঘটনাটা হচ্ছে—আমার মনে হয় আর কি—আমাদের এখানে রাজনীতি করার জন্য একটা লিবারাল স্পেস দরকার যেখান থেকে আমি মুসলমান, আপনি হিন্দু, আর একজন অন্য কেউ হইতে পারে।  বা আর একজন সেক্যুলারকেও আমি জায়গা দেব না কেন।  তার জন্যও তো একটা স্পেস দরকার।  সবার জন্য যে একটা কমন স্পেস তৈরি করার ব্যাপার, এই লিবারাল স্পেসটা তৈরি করা আমি মনে করি আমার এই বইয়ের কাজটা।  আমি কোরানের পরিভাষাগুলো ব্যবহার করছি, কারণ আমার মনে হইছে এইটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।  কোরান শরিফের পরিভাষাগুলো।  কারণ হচ্ছে আমাদের এখানে দুইটা ঘটনা।  একটা হচ্ছে আমি মুসলমান।  আমি নিজের পরিভাষাগুলোর সাথে বেড়ে উঠতেছি, এগুলা বুঝতেছি।  এবং আমার মনে হইছে এই পরিভাষা দিয়েই একমাত্র বুঝা যাচ্ছে আমার এই জিনিসটা।  আর ধর্ম তো বড় ব্যাপার, সবাইকে জায়গা দিতে সক্ষম।  এইটা ছাড়া, আমি যখন সেক্যুলার ভাষায় কথাবার্তা বলি, এরা কিন্তু যে আলেম তাকে জায়গা দিতে রাজি না, সেই ভাষায়।  যে ছেলেটা মাদ্রাসায় পড়ছে, তাকে কিন্তু মেরে ফেলতে বলতেছে সেকুলার ভাষাবিদরা, আপনি দেখেছেন।  আমার কথা হচ্ছে এই ভাষাটাকে ডিসেক্যুলারাইজ করা, একই সাথে, আবার, একেবারে বদ্ধ যে ভাষা, এইটাকে উন্মুক্ত করে দেওয়া।  দুইটাই একই সাথে দরকার।

শাওন

অনেক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বলতেছে সেকুলারদের মেরে ফেলার কথা।  তখন তো…?

রিফাত

এক্সাকটলি, সেটা তো আছেই।  সেটা তো—তখন আমি এই জিনিসটাকে এইভাবে দেখি—সেইটা হচ্ছে আপনার—ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির প্রশ্নটা না।  রাজনীতির আসলে ধর্মভিত্তিক আর ধর্মহীনতার কোনো ব্যাপার-স্যাপার নেই।  রাজনীতি রাজনীতিই।  প্রথম কথা।  দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, রাজনীতিকে কেন্দ্র করে যে ক্ষমতাসম্পর্কগুলো তৈরি হয়, এই জিনিসগুলোর নানান রূপ হাজির থাকে।  আমি এখানে যেইটা দেখাইছি, রাজনীতির একটা শয়তানি রূপ আছে।  এই রূপটা হচ্ছে সব সময় সে একটা ছদ্ম সার্বভৌমত্ব নিয়ে হাজির হয়, মানুষের উপরে, আদতে সে সার্বভৌম না।  এইটা হচ্ছে পপুলার সোভারেনটি।  আপনি যখন এই সোভারেনটি বলেন, সেইটা হচ্ছে এমন, সে আদেশ দেবে আপনাকে, আদেশটা এনফোর্স করার তার ক্ষমতা থাকবে। আমি যখন বলি, আইন—আমি যখন বলি যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইন, আইন জিনিসটা হচ্ছে আসলে একটা সোভারেন পাওয়ারের আদেশ।  আদেশটা এমন, সে এইটা পুলিশ দিয়ে এনফোর্স করতে পারবে, এইটাই হচ্ছে আইন।  আমি বলি কী এখানে, আমি যখনই দেখি যে কোথাও, ধরেন কিছু অন্যায় হচ্ছে, একটা মানুষ যখন আর একটা মানুষের উপর কিছু অতিরিক্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে যেইটা তার প্রাপ্য না।  এইটাকে আমি বলি যে ‘ডিউ’, আমাদের মুঈন উদ্দিন স্যার বলেন।  যেইটা তার প্রাপ্য না, যেইটা তার জন্য জাস্টিস না সেইটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন এইটাকে বলি যে, আসলে মানুষ খোদা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।  এইটা সে ধর্মের নামে করুক আর সেকুলারের নামে করুক।  ঘটনা একই থাকে শেষ পর্যন্ত।  তখন আসলে, মূলত যারা ধর্মবোধসম্পন্ন মানুষ, আমি বলছি কী, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে যারা খোদা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে—একটা ছদ্ম সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে—তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি হাতে প্রফেসর মুঈন উদ্দিন আহমদ খান, আমার শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ। যার কাছে গিয়ে শিখি।—রিফাত হাসান

সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি হাতে প্রফেসর মুঈন উদ্দিন আহমদ খান, আমার শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ। যার কাছে গিয়ে শিখি।—রিফাত হাসান

শাওন

আপনার এই বইতে এইবার সাম্প্রতিক যে বিষয়গুলো আসছে ঐগুলো কী কী?

রিফাত

একেবারে সাম্প্রতিক বিষয় যেগুলো?

শাওন

একেবারে, বা একটু আগের সাম্প্রতিক বিষয়।

রিফাত

একেবারে সাম্প্রতিক বিষয় যেগুলো আসছে, সেগুলি হল আমাদের সর্বসাম্প্রতিক বিষয়গুলো যেমন শাহবাগ, হেফাজত এইসব আলাপগুলো আসছে।  বিশেষ করে এইটাকে কেন্দ্র করে তিন-চারটা লেখা ছিল।  আর কিছু, যেমন বলা যায় পলিটিক্যাল অটোবায়োগ্রাফিমূলক কয়েকটা লেখা।  তখন শাহবাগে, তরুণদের একটা অংশের যে ফাঁসি চাই আন্দোলন চলতেছিল।  তরুণদের, কী বলা যায়, আমি তখন বলছিলাম যে, আরব বসন্তে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের তরুণরা শাহবাগ ঘটনায় জড়ো হয়েছিল।  তো, আরব বসন্তে যেসব সমস্যা ছিল, এখানেও সেই সব সমস্যা বিদ্যমান আছে।  অনেকেই ভেবে নিচ্ছে যে, কী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে।  ধরেন, শ্লোগানটা যেভাবে আসছে, ফাঁসি চাই।  স্রেফ ফাঁসি চাই শ্লোগান নিয়ে যে আন্দোলনটা শুরু হল, এইটার বিষয়ে তো আমি কোনো মহৎ কথা বলতে পারি না।  এইরকম একটা ব্যাপার, যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে এইরকম একটা আকাঙক্ষা থাকতে পারে, আকাঙক্ষার প্রশ্ন থাকতে পারে।  আমি মনে করি যে, এই আকাঙক্ষাটাও আসলে মিডিয়ার তৈরি করা।  যারা প্রকৃতই যুদ্ধাপরাধের বিচার চান, সেটা ভিন্ন কোয়াশ্চেন।  সেই কোয়াশ্চেন নিয়ে শুধুমাত্র কাদের মোল্লার ফাঁসির প্রশ্নে একটা আন্দোলন তৈরি করতে পারেন না আপনি।  সেই প্রশ্ন নিয়ে যদি আপনি আন্দোলন তৈরি করবেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার আপনি চান, তখন আপনাকে করতে হবে যেইটা, সেইটা আসলে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে সুষ্ঠুভাবে যাতে চালায়ে নিতে পারে, সেরকম একটা আন্দোলন তৈরির প্রশ্ন।  শাহবাগের যে ঘটনাটি সবচেয়ে ঝামেলা মনে করি, সেটা হচ্ছে, এইটা আমাদেরকে একটা পেনিক সাইকোলজি তৈরি করে দিছে।  তরুণদের ভিতরে।  রাজনীতি নিয়ে আমরা যারা ভাবছি তাদের ভিতরে।  রাজনীতিবিদদের ভিতরে।  যারা কবিতা লিখছেন, তারা কবিতা লিখছেন: ‘ফাঁসি চাই’, দেখবেন।  তো ঘটনাটা হচ্ছে, আমার ছোট বাচ্চা যে টিভি দেখতেছে, সে ‘ফাঁসি চাই’ বলে শ্লোগান দিচ্ছে।  এই ঘটনাগুলোর দায় স্রেফ আমি মনে করি না শাহবাগের।  শাহবাগের এই শ্লোগান বা ঘটনা এতটুকু ছড়াত না আমাদের মিডিয়াগুলো যদি এখানে ভূমিকা পালন না করত।  আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব যারা আছে, আওয়ামীলীগ বলেন, বিএনপি বলেন, এমন কি জামায়াত, সবাই কিন্তু এই জিনিসটা জারি রাখছে, জারি রাখছে দেশপ্রেমের নামে।  আসলে দেশপ্রেম-ট্রেম তো কিছু না।  স্রেফ দলীয় স্বার্থ।

শাওন

শাহবাগ আন্দোলনের সময় কোনো লিবারেল স্পেস কি তৈরি হইছিল?

রিফাত

শাহবাগ আন্দোলনে এইটা তৈরি হয় নি বলেই তো এইটা অনেক ঝামেলা তৈরি হইছে।  আমরা তো এইটার বিরোধীতা করতেছি, শাহবাগ আন্দোলন যদি যুদ্ধাপরাধ বিচারের একটা অবজেক্টিভ ক্রিটিক তৈরি করতে পারত, আমরা সবাই শাহবাগ আন্দোলনকে ওয়েলকাম জানাতাম।  এবং এইটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইত।  কারণ হচ্ছে কী, যুদ্ধাপরাধ বিচারের ব্যাপারটা হচ্ছে, সবসময় আমি বলি, সেটা হচ্ছে, একাত্তর সালে যেসব অমীমাংসিত বিষয় ছিল, অমীমাংসিত বিষয়গুলো যদি আমাদের এখানে, আপনার একটা অবজেক্টিভ ভাবে মীমাংসা করতে না পারি আমরা, আমরা যদি বলি যে, আমরা আসলে জাতীয়তাবাদের যেসব পেনিক ব্যাপার আছে এগুলোর ধোয়া না তুলে, এইটার তো সমাধান করে ফেলতে হবে।  যদি আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নিয়েও চিন্তা করি, বাকি সব কথা বাদ, তো এগিয়ে যাওয়ার একটা প্রশ্ন আছে।  ঠিক না?

শাওন

এবার হচ্ছে আপনার বইতে যে প্রসঙ্গগুলো আসছে, বড় ধরনের বিতর্ক তুলতে পারে, এরকম প্রসঙ্গ কী আছে? মানে, এরকম কথা কি বলেছেন, যদি সেই কথাটি আলোচনায় উঠে আসে, আরো বড় ধরনের বিতর্ক হতে পারে, এই সময়ে, আছে এরকম কিছু?

রিফাত

বড় ধরনের বিতর্কের ব্যাপারটা আসলে আমি এইভাবে দেখি না।  আমার দেখার ব্যাপারটা হচ্ছে কী আপনার, বিভিন্ন সময়ে আমার দেখা জিনিশসলোকে আমার…।

শাওন

আমি এই কারণেই বললাম যে, শাহবাগ আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে অনেক মিডিয়ার দ্বারা, তারপরে অনেক বুদ্ধিজীবী দ্বারা, ভালভাবে এগিয়েছে।  শাহবাগের চেতনায় অনেক বুদ্ধিজীবী, বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবীই বিশ্বাসী।  আপনি যেহেতু শাহবাগের একটি ক্রিটিক্যাল এনালাইসিস দাঁড় করানোর কথা বললেন, সেই কারণে।

রিফাত

হ্যাঁ, একটা জিনিস হচ্ছে যে, আমি একটা কথা বলি।  সেটা হচ্ছে আমাদের ইতিহাস শাহবাগ বা হেফাজত দিয়ে শুরু না।  আমি আমার এখানে শাহবাগের যে ক্রিটিক লিখেছি, একই সাথে আবার হেফাজতেরও ক্রিটিক লিখেছি।  হেফাজতের যে ক্রিটিক এইটাও হেফাজতের ব্যাপারে আমার কিছু বোঝাপড়া, মূল্যায়ন।  তো, আমি তো শাহবাগকেও ওন করি না, হেফাজতকেও ওন করি না।  হেফাজতকেও ওন করার প্রশ্ন আসে না।  আবার, যদি বলেন যে, আমি জাস্টিস প্রশ্নে, জাস্টিস প্রশ্নে কিন্তু আমি হেফাজতের কিছু কিছু জাগায় সাপোর্ট করছি।  এখন হেফাজত কতগুলো বেসিক প্রশ্ন এখানে নিয়ে আসছে।  এগুলোকে বাদ দিয়ে বাকি যেসব প্রশ্নগুলো আছে এগুলোতে আমার কোনো সমর্থন নেই।

শাওন

শাহবাগের কি এমন কোনো পয়েন্ট ছিল?

রিফাত

শাহবাগের একটাই পয়েন্ট।  একাধিক কোনো পয়েন্ট ছিল না।  এইটা আপনাকে মনে রাখতে হবে।  এই কারণেই শাহবাগের ব্যাপারে খুব একটা কথা বলা যায় না।  সেটা হলো, ফাঁসি।  কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই।

কাদের মোল্লা এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে গণজাগরণ।

“তো ঘটনাটা হচ্ছে, আমার ছোট বাচ্চা যে টিভি দেখতেছে, সে ‘ফাঁসি চাই’ বলে শ্লোগান দিচ্ছে। এই ঘটনাগুলোর দায় স্রেফ আমি মনে করি না শাহবাগের। শাহবাগের এই শ্লোগান বা ঘটনা এতটুকু ছড়াত না আমাদের মিডিয়াগুলো যদি এখানে ভূমিকা পালন না করত।”—রিফাত হাসান

শাওন

শাহবাগ আন্দোলনের পরে অনেক জাগায়, শাহবাগ আন্দোলন থেকেই, অনেকেই বলছেন, অনেক বুদ্ধিজীবী বলেছেন, শাহবাগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বলছেন, যে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই।  বা নিরপেক্ষ বিচার চাই।  বা আরো অনেক কথা আসছে।  সেগুলোকে পয়েন্ট আকারে নিচ্ছেন না?

রিফাত

না সেগুলোকে পয়েন্ট আকারে নিচ্ছি না কারণ হচ্ছে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্ন এরা সামনে আনে নাই।  প্রথম কথা।  এ কথাটা কিন্তু আমি কোনো মিডিয়াতে বা শাহবাগে কোথাও ‘বিচার চাই’ জিনিসটা কোথাও পাই নাই।  ফাঁসি চাওয়া আর বিচার চাওয়ার মধ্যে যে তফাৎ, এইটা অনেক বড় তফাৎ।  বিচার চাওয়ার যে আন্দোলন, তার সাথে ফাঁসি চাওয়ার আন্দোলন এক না।  বিচার চাইলে কিন্তু, আমি মনে করি, আমার কথা হচ্ছে আমি যখন বলি যে ফাঁসি চাই…।

শাওন

শুরুতে তো তারা বলেছিল ফাঁসি চাই।  কিন্তু পরে তো অই জায়গা থেকে অনেকেই সরে আসছে।  অনেকেই বলছে যে, বিচার চাই।

রিফাত

অনেকেই বলতে কাদেরকে বুঝাচ্ছেন আপনি?

শাওন

কারো নাম বলতে পারব না নির্দিষ্ট করে।

রিফাত

এই ব্যাপারটাই বলছিলাম।  শাহবাগের যেটা মূল প্রাণ, সেটা হচ্ছে ‘ফাঁসি চাই’।  দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমি এই যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নটাকে দেখি এইভাবে, সেটা হচ্ছে, প্রথম কথা, এই বিচারের প্রশ্নটাকে যদি আপনি একদম গ্রহণযোগ্য বিচার করতে হয়, আমি মনে করি, আওয়ামীলীগের মাহবুবুল আলম হানিফ সাহেব, উনি একসময় একটা কথা বলছেন, যে, ‘ছাত্রশিবিরের বর্তমান প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধী প্রজন্ম না। আমরা আহ্বান করব আপনারা যারা বর্তমান প্রজন্ম আছেন তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এগিয়ে আসুন।’ এই কথা বলেছেন।  তার মানে হচ্ছে, এইটা তারা বুঝেন না এমন না।  সেটা হচ্ছে, আমি মনে করি, জামাত শিবিরের পক্ষ থেকেও, ভেতর থেকেও একটা দল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, এটা আমরা জেনেছি।  মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি, আর কোথাও না।  পপুলার মিডিয়াগুলো বলেছে, তাদের ভিতরেও ফ্রাকশন তৈরি হয়েছে।  এই ফ্রাকশনটাকে কাজে লাগাতে পারত।  যারা ফ্রাকশন করতেছে তারা কিন্তু মৌলিক কিছু জায়গা থেকে, এবং যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে তাদের সাথে জামাতের একটা বিরোধ তৈরি হইছিল।  শিবিরের ভিতরে।  এগুলোকে, আমার কথা হচ্ছে, যাদের আপনি বিচার করবেন, যে গ্রুপের বিচার করবেন, তাদের ভিতরে যদি মাথায় না আসে যে, আমরা ন্যায়বিচার পাচ্ছি, এই বিচার কখনো বিচার হিসেবে বিবেচিত হবে না।  বিচারটা ক্ষত হিসেবে থেকে যাবে।  আপনি যখন আমাদের এখানকার সব ধরনের—আমাদের আইন, আইনের যেসব কাস্টম—সবকিছু বাদ দিয়ে একটা বিচার সম্পন্ন করে ফাঁসি দিয়ে দেবেন, দ্রুত ফাঁসি দিয়ে দেবেন, এই ফাঁসিটা হয়তো কিছুক্ষণের জন্য একটা উল্লাস তৈরি করবে আপনার ভিতরে।  কিন্তু এই উল্লাসটার পর আপনি যখন আজকে থেকে দশ বছর, বিশ বছর পরে আবার যখন এই বিচারটা নিয়ে আরো কথা আসবে, তখন কিন্তু আবার যারা এই বিচার করতেছেন তারা আসামী হবেন।  তখন কিন্তু এটা স্রেফ ইয়ে করার প্রশ্ন না।  বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শুরু থেকেই, জামাত, আমি তো মনে করি, একটা কথা বলি আমি, সেটা হচ্ছে, ১৯৭১ সালেই স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয় নি।  এইটা মাথায় রাইখেন।  আমাদের এখানে যদি, যারা একাত্তরের পর ক্ষমতায় ছিল তাদের মধ্যে যদি সুচিন্তা থাকত—বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধীতা যারা করছে, এই অভিযোগে তাদেরকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করব, তাহলে কিন্তু আমরা এই ঝামেলায় পড়তাম না।  ‘৭১-এর পরে বর্তমান জামাত শিবিরকে নিষিদ্ধ করব কি করব না, এই ঝামেলায় পড়তাম না।  জামাত শিবিরের এই আদর্শ, এইটা মোকাবেলা কীভাবে করবেন? এখন কথা হচ্ছে আসলে, যুদ্ধাপরাধ বিচার আমরা করতেছি, এই প্রক্রিয়ায় আমাদেরকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে জামাত-শিবিরের আদর্শকে।  তো, জামাত শিবিরের আদর্শ তো যুদ্ধাপরাধের আদর্শ না।  এইটা তো হচ্ছে একটা স্রেফ ভিন্ন কোয়াশ্চেন।  এখন ‘৭১ থেকে এ পর্যন্ত যে জামাত শিবির বাংলাদেশে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ওন করে রাজনীতি করে যাচ্ছে, সংসদে সংসদ সদস্য হচ্ছে, বাংলাদেশের জাতীয় দিবস পালন করছে, একুশে ফেব্রুয়ারির দিন পতাকা হাতে হাতে যেসব শিবিরের ছেলেপেলেরা, তাদেরকে আপনি কীভাবে এ দলের বিচার করতে বলবেন? এ দলের বিচার, তিরিশ বছরের রাজনীতির বিচার কি আপনি যুদ্ধাপরাধের বিচার দিয়ে করতে পারবেন? যুদ্ধাপরাধ বিচার করতে হলে তো একাত্তরেই তাকে শেষ করে দেওয়া দরকার ছিল।  একাত্তরে তাকে এই অভিযোগে নিষিদ্ধ করেন নাই কেন?

শাওন

এইবার আর একটু অন্য প্রশ্ন করি।  বই থেকে যেহেতু আমরা দূরে সরে গেছি, আর যাব না এই দিকে।  এই প্রশ্ন দিয়েই আলোচনাটা শেষ করতে চাই।  প্রশ্নটা হল যে, বই লেখা এবং পড়া দুইটাই হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা।  এখন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা বুদ্ধিজীবীতার একটা লক্ষ্য বা কাজ হচ্ছে যে আমরা জানি, যে, বিদ্যমান ব্যবস্হা বা সরকারের সমালোচনা করা।  বিদ্যমান সমাজ যেভাবে চলতেছে, বা দেশ যেভাবে রাষ্ট্র যেভাবে চলতেছে, তার সমালোচনা করা।  সেই পর্যন্ত ঠিক আছে।  কিন্তু যদি কোনো বুদ্ধিজীবীর কাজ, বুদ্ধিজীবীর কথা, বুদ্ধিজীবীর চর্চা, যদি সেটা সরকারি দল হোক বা বিরোধী দল হোক, বা যে কোনো দলকে যদি সমালোচনা করতে গিয়ে যে কাউকে সার্ভ করে, সেই বুদ্ধিজীবীতা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর কিনা? যেমন বিরোধী দলের পক্ষে হয়ে কথা বললে অনেক সময় সরকারের সমালোচনা বা বিদ্যমান ব্যবস্হার সমালোচনা করা যায়।  এটা যায়।  কিন্তু যদি সেই কথা দেখা যায় যে, বিরোধী দলের জায়গা থেকে বলতেছে, একটা দলকে সার্ভ করার জন্য বলতেছে—একটা আদর্শকে সার্ভ করার জন্য বলতেছে—বা একতরফাভাবে হয়, এই জিনিসটা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর কি-না।

রিফাত

প্রথম কথা হচ্ছে, আমার এমনিতে একটা মোটাদাগের কথা সব সময় মনে আসে।  সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের, ধরেন, বাঙালী জাতিয়তাবাদ নামে যে গোষ্ঠিটা আছে, সেই গোষ্ঠিটি যতটুকু যেই পরিমাণ, আপনার, কালচারাল থেকে শুরু করে ক্ষমতাসম্পর্কের জায়গা থেকে সব জায়গা থেকে বুদ্ধিজীবীদের জায়গা থেকে যেই পরিমাণের মহিরুহ তৈরি হইছে, পজিটিভ অর্থে হোক নেগেটিভ অর্থে হোক, সেই পরিমাণের মহিরুহ তার বিরোধী পক্ষের থাকা দরকার।  তাহলে একটা ভারসাম্য অবস্হা তৈরি হবে।  আমি যখন দেখছি যে আপনার, পুরো বাংলাদেশে মিডিয়া বলেন বুদ্ধিজীবী বলেন কবি বলেন সাহিত্যক বলেন এমন কি বললাম যে আরো একদম, ধরেন লোওয়ার ক্যাটাগরি থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ—একদম আ’ম বলতেছি, সবাই দেখলাম কী, একটা সরকারের সবগুলো জিনিস, সরকার—আমি নির্দিষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের কথা বলছি না, কিন্তু ঘটনাটা পড়ে গেছে এখন আওয়ামী লীগ সরকার আছে, এইটা আওয়ামী লীগ প্রশ্ন না, ঘটনা হচ্ছে সবাই যখন একটা জিনিসের পক্ষে, একটা ব্যবস্হার পক্ষে নির্বিচারে দাঁড়িয়ে যায়, শুধুমাত্র, ধরেন সুবিধাবাদিতার একটা প্রশ্ন আছে, কেউ সামনে আসতে চাইবে না, প্রতিবাদ করতে চাইবে না, প্রতিবাদ করলে অনেক রকম ঝামেলার ভয় আছে, এইটা যদি হয়ে থাকে, তখন সমাজে একটা অব্যবস্হা তৈরি হয়।  সেজন্য আমি মনে করি, সেক্ষেত্রে যদি আমি যদি বলি যে, আমি যদি এখন বর্তমান আওয়ামী লীগ ব্যবস্হার সমালোচনা করি, বাস্তবিকভাবেই কেউ কেউ আমাকে বলবে যে, আপনি তো আসলে বিএনপির পারপাস সার্ভ করছেন।  হোক! এইটারে আমি কোনো সমস্যা মনে করি না।  কারণ আমি যখন, আমি কাউকে, কেউ একজনকে বলছিলাম, এই যে সরকারের বিরুদ্ধে এই যে কেউ একটা, যে কোনো একটা কর্মসূচি দিয়েছিল, ধরেন, খালেদা জিয়া, এইটারে আমি কখনো সাপোর্ট করছি।  এখন তার প্রশ্ন হল যে আপনি কেন সাপোর্ট করবেন? এইটাতে আপনার পারপাসটা কী? আমি বললাম যে, না, এইটাতে আমার পারপাস একটাই।  সেটা হল একটা ভারসাম্য অবস্হা তৈরি হওয়া দরকার।  মানে, সব কিছু যে কেউ ইচ্ছেমতো করে যাবে, প্রশ্নহীনভাবে, এই জিনিসটা তো আসলে ভারসাম্য অবস্হা থাকে না।  ভারসাম্য অবস্হার জন্যই এই কর্মসূচি সফল হওয়া দরকার।

শাওন

সেটা ঠিক আছে।  কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশ্য যদি হয় দলের পারপাস সার্ভ করা…।

রিফাত

দলের পারপাস সার্ভ করা কোনো কোনো ক্ষেত্রে, দলের—বুদ্ধিজীবীর উদ্দেশ্য হতে পারে।  কিন্তু এডওয়ার্ড সাইদ যেইটা বলেছেন, ঐ যে, বুদ্ধিজীবীর কাজ হল নিরন্তর সত্য কথা বলে যাওয়া।

শাওন

সত্য কথা বলা, যদি আংশিক সত্য কথা হয়—তাহলে সেই আংশিক সত্য…?

রিফাত

সত্য কথা আংশিক কি আংশিক না? হ্যাঁ, একটা জিনিস হচ্ছে, আপনি যখন আংশিক সত্য বলবেন, তখনো নিশ্চয় এটা ক্ষতিকর।  অবশ্যই ক্ষতিকর।  আংশিক সত্যের মাধ্যমে যদি সত্য লুকানো হয়, তা তো ক্ষতিকরই।  তবে, সত্য কথা, এইটার মানে আপনি কী মনে করছেন সেইটারও একটা ব্যাপার আছে।  যেমন ধরেন, এখানেই আপনার রাজনৈতিক হয়ে ওঠার একটা ব্যাপার আমি বলি।  যে, রাজনৈতিক হয়ে ওঠা।  রাজনৈতিকভাবে একটা জিনিসকে দেখা।  মানে, সত্য জিনিসটা কী, সেটা বুঝার জন্য স্রেফ একটা জিনিসকে অবিকল বর্ণনা করাই শুধু জরুরি না।  একটা ঘটনা ঘটে গেছে, এইটাকে স্রেফ অবিকল বর্ণনা করা এইটাকে সত্য বলা যায় না।  এইটার মধ্যে হাজির পলিটিকসটাকেও দেখতে হবে।  পলিটিকসটার মধ্যে আপনার, সমাজের একটা, ধরেন, ইন্টারেস্ট থাকতে পারে।  রাষ্ট্রের, কোনো কোনো সময়, আমরা তো রাষ্ট্রের অনেক রকম সমালোচনা করি, কিন্তু, দেখেন, কখনো কখনো আমাকে রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, যখন সীমান্তে বিএসএফ খুনোখুনি করে।  দাঁড়াতে হয় না? যখন সীমান্তে বিএসএফ খুনোখুনি করছে, তখন তো আপনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের হয়ে কথা বলছেন—যে, এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের উপর আঘাত।  কিন্তু আমি একই সাথে বলছি যে রাষ্ট্র আমার উপর নিপীড়ণ করছে।  নিপীড়ণ করছে তো! যেই রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনী দিয়ে আমাদের জনগণের উপর, নাগরিকদের উপর, গুলি চালাবে—সেই রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে আমি আবার কথাও বলতেছি।  এইটা ভেবে দেখেন।  বলতেছি তো! এখন আমার কথা হচ্ছে, কোনো দলের পক্ষ হয়ে কথা বলাটারে আলাদাভাবে আমি অপরাধ হিসেবে মনে করি না।  ক্ষতিকর মনে করি না।  কেউ দলের পক্ষ হয়ে কথা বলুক, কোনো সমস্যা নেই।  কথা হচ্ছে, আপনি সত্যের পক্ষে আছেন কি-না।  নিরন্তর সত্য কথা বলে যাওয়াটা বুদ্ধিজীবী না হলে, এইটা না করলে, আপনি তখনো বুদ্ধিজীবী—কিন্তু আসলে—আপনার ভেতরে যেইটা—ধরেন—আমি মোরালিটি আরোপ করি, এই মোরাল প্রশ্নের কারণেই আপনি বুদ্ধিজীবী হিসেবে, মানে তখন আর আপনি সেলফজাস্টিফায়েড না আর কি।

রিফাত হাসান ও আশরাফুল আলম শাওন

রিফাত হাসান ও আশরাফুল আলম শাওন

শাওন

আচ্ছা রিফাত ভাই, এইটা আপনার কততম বই?

রিফাত

প্রথম বই।

শাওন

এইটা প্রথম বই।  আচ্ছা, সামনের বইমেলা পর্যন্ত এক বছর পর্যন্ত সময় আছে।  এই এক বছরের মধ্যে আপনার লেখালেখির কী পরিকল্পনা আছে?

রিফাত

আসলে ঘটনা হচ্ছে কী, আমি পরিকল্পনা করে তো লিখি না।  আর লেখালেখি তো অবশ্যই করবো।  সব সময়ই করবো।

শাওন

বই করার ইচ্ছে আছে?

রিফাত

বই করার ইচ্ছে আছে, যদি তেমন লেখালেখি হয়।  যদি না হয় করবো না।  বই করার ব্যাপারটা হচ্ছে আমি আসলে একেবারে মোটাদাগের রাজনীতির লেখালেখির পাশাপাশি রাজনীতি দর্শন নিয়ে কিছু কাজ করতে চাই।  যেইটার উপরে বেসিস করে আমার রাজনৈতিক ভাবনা চিন্তাগুলো অ্যানালাইসিসগুলো দাঁড়াবে—সেটি নিয়ে আমি আরো কাজ করতে চাই।  সেইটা হয়তো আর একটু ভাবব ও করার চেষ্টা করবো।  জানাশোনার চেষ্টা করবো।  পড়শোনার চেষ্টা করবো।  আমার কিছু ওস্তাদ, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আছে।  শিক্ষকদের কাছে গিয়ে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করবো।  সেটা করতে পারি আর কি।

শাওন

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য।

রিফাত

আপনাকেও।

১/৩/২০১৪

ইউটিউব ভিডিও

২০১৪ সালে গৃহীত সাক্ষাৎকারের ভিডিও

About Author

আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।