সাজেকে, কংলাকে

প্রাক-প্রাথমিক ঘটনা

রিমঝিম একদিন কথায় কথায় বলল, “চলো পাহাড়ে কোথাও ঘুরে আসি।”

আমি হইলাম হাতি দিয়ে টানলেও সহজে ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া বাহির হবার চায় না এমন মানুষ! আমি বিরস মুখে বললাম, “দিনে গিয়ে দিনে চলে আসা যাবে এমন জায়গা তো নাই! আর দূরে পাহাড়ে কোথাও যেতে হলে বাসা থেকে দিবে না।” (মূল ব্যাপার হলো, ঘুম টুম বাদ দিয়ে সারাদিন ঠা ঠা রোদে পাহাড়ে পাহাড়ে দৌড়ঝাঁপ করার আমি কোনো মানেই দেখছিলাম না! পাহাড় দেখতে হইলে টাইগার পাস সি আর বি রোড যাই বসি থাকা ভালো!)

রিমঝিম মন খারাপ করল।

দুইদিন পর রিমঝিম বিভিন্ন আকৃতির হৃদয়ের উড়ে যাওয়া ইমোর সাথে দাঁত বের করা হাসির ইমো পাঠিয়ে মেসেজ দিলো, “জাবেদ ভাইকে বলেছি। উনি রাজি পাহাড়ে যেতে! উনি আমাদের নিয়ে যাবেন।”

shafin-logo

জাবেদ হইলো আমার বড় ভাই। তাঁর এমনিতেই কাজ হইলো দুইদিন বাদে বাদে পাহাড়ে পাহাড়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া। আর তাঁর লাপাত্তাদিনে আমার আম্মু কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আঁই যানি, ইতে ফাহাড়ি বিয়া গইরজি। নইলে ফত্তি মাসত মাইনষে ফাহড়ত ন যা! তুই বেজ্ঞিন জানস।”

জাবেদ পাহাড়ি বিয়া করলে করছে, আমার সাথে এ নিয়ে এত প্যাঁচাল পাড়ার কি আছে বুঝি না! যাকগে, তো রিমঝিম এই পাহাড় ভালোবাসে জাবেদ ভাইকেই পটায় ফেলল, আমাকে আর ওকে নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে।

জাবেদ ভাই প্ল্যান করলো ১৫ আগস্ট যাবে। রিমঝিম দাঁত বের করা যত ইমো আছে পাঠাতে লাগলো!

 

প্রাথমিক ঘটনা

৭ তারিখ মধ্যরাতে বলা নাই কওয়া নাই আমার উথালপাতাল জ্বর আসলো। দুই দিন অজ্ঞান প্রায় গেল। এরপর কোনো মতে চোখ মেললেও জ্বর নামে না, বমিও থামে না। এমন কঠিন অসুস্থতা চলল ১০ দিন। অসুস্থ আমাকে হাতে কোনো রকম ফলটল ছাড়া রিমঝিম দেখতে আসলো। সে নির্বিকার মুখ করে বলল, “তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠো। আমাদের বেড়াতে যেতে হবে!” (আমি কি এমন নিষ্ঠুর বান্ধবী চাইছিলাম!) কোনো মতে বললাম, “আগে বাঁচি কিনা দেখো।”

তবে সে নিষ্ঠুর হইলেও লোক ভালো। অসুস্থ যখন ছিলাম সে আমাকে নানা পদের ভর্তা করে খাওয়াইছে। তাঁর হাতের ভর্তা খাবার আগে আমি কোনো খাবার মুখে তুলতে পারছিলাম না।

 

মধ্যবর্তী গল্প

আমার আম্মু জানতে পারলেন, এই মাসে উনার পুত্র একলা নন, কন্যাও পাহাড়ে যাবে। উনি শুরু করলেন উনার যাবতীয় না না করা, “মাত্র অসুখ থেকে উঠলা তুমি, যাইতে হবে না। পাহাড়ে অনেক মশা, ম্যালেরিয়া হলে কে দেখবে! আর পাহাড়ের কোনো বিশ্বাস আছে, কী না কী হয়!”

আমি জিগালাম, “কী হবে? আমারে তুলে নিয়ে যাবে? যাক। আমি চাই আমারে কেউ তুলে নিয়ে যাক! কয়দিন আনন্দ ফুর্তি করে চলে আসবো।”

safin-9

দীঘিনালা স্টেশনে নামার পর।—লেখক

আমার আম্মু চড় মারার জন্য হাত উঠায়ে বললেন, “মুখে কোনো কথা আটকায় না, না? মায়ের সাথে কেউ এমন বেয়াদবের মতো কথা বলে!” এরপর দোয়া পড়ে ঝেড়ে দিলেন। (আমার আম্মুর ধারণা আমাকে শয়তানে পাইছে, দোয়া পড়ে ঝাড়লে শয়তানের আছর থেকে আমার দ্রুত মুক্তি ঘটবে!)

রিমঝিমকে জানালাম, আম্মু ঝামেলা করতেছে, যাব না।

সে বলল, আচ্ছা।

আমি হাঁফ ছাড়লাম, যাক যাওয়া লাগছে না! রিমঝিমকে ভদ্রতা করে বললাম, “আমি যাব না বলে তুমি যাবা না তা কেন হবে! তুমি এক কাজ করো জাবেদ ভাইকে বলো আর সাথে আরো সঙ্গী সাথী নিয়ে ঘুরতে চলে যাও।”

রিমঝিম কঠিন কণ্ঠে বলল, “গেলে তোমাকে নিয়েই যাব। নাহলে না।”

২২ তারিখ জাবেদ ভাই জানালো ২৪ তারিখ আমরা সাজেক যাচ্ছি।

safin-5

ছাতা একটা, তাই গিটার ছাতা হয়ে গেল।—লেখক

আমি আসমান থেকে পড়লাম। সে, রিমঝিম আর রাসেল ভাই মিলে সব ঠিক করে ফেলেছে! আমি দুধভাত! আমাকে কিছুই বলে নাই! এর মধ্যে মিলির বিনা নোটিশে বিয়ে ঠিক হলো। জাবেদ ভাইকে বললাম, ২৪ তারিখ মিলির বিয়ে। যেতে হলে ২৫ তারিখ যাব সাজেক। রাতে আম্মুকে জানালাম সাজেক যাচ্ছি।

আম্মু যথারীতি চিল্লাফাল্লা শুরু করলেন। আমি চিন্তা করে দেখলাম, আমি আসলে সাজেকে ঘুরতে যেতেই চাই। সুতরাং আম্মুর চিল্লাফাল্লা গায়ে না মাখাই উত্তম।

 

মূল সফর

আমার নিজস্ব একটা অ্যালার্ম আছে। আমাকে যদি নির্দিষ্ট কোনো সময়ে ঘুম থেকে উঠতে হয়, মোবাইলে অ্যালার্ম সেট না করেও আমি ঠিক ঐ সময় ঘুম থেকে উঠে যেতে পারি। তো আমাকে রাতে বলা হলো, সকাল ৭.৪৫-এ বাস। আমি ৬টা ১৫তে উঠে বড় ভাইয়াকে ডাকতে গিয়ে জানলাম বাস আসলে হচ্ছে ৮টা ৪৫-এ। আমাদের দুই ভাই বোনের রেকর্ড আছে দেরি করে পৌঁছানোর, তাই এক ঘণ্টা আগে বলা হয়েছে সময়!

মেজাজ গেল বিগড়ে! আরো আধা ঘণ্টা ঘুমাতে পারতাম! যাই হোক রেডি হয়ে, যাওয়ার পথে রিমঝিমকে তুলে নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেখি বাস ছাড়তে আর দেরি নাই।

এখনকার নিয়ম হলো যেখানেই যাবা যাও, সেলফি থেকে শুরু করে খালি ছবি তুলতে থাকবা। নিজের চোখে কী দেখতেছ ডাযন্ট ম্যাটার! তো আমাদেরও বাসে উঠার পর থেকে কিছুক্ষণ সেলফি, ছবি তোলা চলল। এরপর পাটিসাপটা খেয়ে সকালের নাশতা সাবাড়।

প্রখর রোদ ফাঁকি দিয়ে গাছগাছালি দিয়ে ঢাকা আধাপাকা রাস্তা দিয়ে বাস ঝাঁকি খেতে খেতে এগিয়ে যাচ্ছিল। আমি বাসে উঠলে বা দূরের জার্নিতে গাড়িতে কথা বলি না তেমন। তাই কানে হেডফোন গুঁজে গান শোনা শুরু করলাম। গান শুনতে শুনতে ভাবছিলাম সমুর কথা। সমু এলে ভালোই হতো। আসামাত্র বাংলাদেশের অসহনীয় সৌন্দর্য দেখে ফেলতে পারতো! কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম আমার ট্যুরমেটরা অন্ত্যক্ষরী খেলা শুরু করেছে। রাসেল ভাইদের সামনের সিটে এক আদিবাসী মিষ্টি বাচ্চা বসেছিল। আমাদের গ্রুপের হেঁড়ে গলায় গান শুনে সে অবাক হয়ে হয়তো ভাবছিল, “এই তবে বাংলা গান!”

বাস চলতে চলতে চারপাশে পাহাড়ের গায়ে জুম চাষ দেখা হচ্ছিল। একটা জায়গায় কিছুটা জঙ্গলমতো আসতেই রিমঝিম বলে উঠলো, “বাসের জানলা দিয়ে যদি সাপ ঢুকে?” সবাই হেসে ফেললো। তারপর বাঙালির যা স্বভাব, একেকজন সাপ বিশেষজ্ঞ বের হলো আমাদের মধ্য থেকে। এসব পাহাড়ে যেসব সাপ থাকে সেসব নির্বিষ, মানুষ দেখলে পালায় হেন তেন। মানিকছড়িতে যাত্রা বিরতিতে সবাই দই-চিড়া খেলো।মানিকছড়ি নেমে আমার বড় ভাই নস্টালজিক হয়ে গেল। তাঁর ছেলেবেলা মানিকছড়িতে কেটেছে। তখন আমার জন্ম হয় নি। আমি শুধু গল্প শুনেছি সেই কাঠের রেলিং দেয়া বাংলো বাড়ির।

পথে যেতে যেতে ভ্রম হলো কাশ্মির আছি। ঠিক কাশ্মীরের মতোই কিছু দূর পর পর আর্মির গাড়ি, জিপ যাচ্ছিল বা দাঁড়িয়ে ছিল। ভাবছি এখানেও বাচ্চারা বা ছেলেরা কি পাথর ছুঁড়ে মারে এসব আর্মির গাড়ি দেখলে? অতটা ক্ষোভ কি ওদের মনেও আছে? কিংবা ক্ষোভের অন্য কোনো রকম প্রকাশ?

জাবেদ ভাইয়া সবসময় বলে এসেছে আমাদের জন্য গাড়ি, থাকা আর খাওয়ার ব্যবস্থা করা আছে। দীঘিনালায় বাস থেকে নেমে বোঝা গেল সে আসলে কিছুই আগে থেকে ঠিক করে নাই। পাঁচ ঘণ্টার বাসের ঝাঁকির পর সবারই পেটের নাড়িভুঁড়ি খিদেয় বেরিয়ে আসার জোগাড় তখন, তার মধ্যে এই অব্যবস্থাপনা! চান্দের গাড়ি ঠিক করতে গিয়ে ড্রাইভাররা যে পরিমাণ টাকা চাইছিল তা দেখে সাজেক যাওয়া বাদ দিয়ে ফিরতি বাসে চট্টগ্রাম ফিরে যাওয়াই শ্রেয়ো মনে হচ্ছিল!

দের চোটে সবাই একটা চাকমা হোটেলে ঢুকে খেতে বসে পড়ল। আমরা বাঁশ কুড়ুল এমনিতে ভাজি করে খাই। এখানে দেখলাম ডালে বাঁশকুড়ুল দিয়ে রেঁধেছে। জাবেদ ভাই এর মধ্যে কোন এক পরিচিতের মাধ্যমে চান্দের গাড়ির ব্যবস্থা করে ফেলল। মাইনি ব্রিজের নিচ থেকে সেই চান্দের গাড়ি এসে আমাদের তুলে নিবে। মাইনি ব্রিজ গিয়ে দেখি গাড়ি আসে নি তখনো। ব্রিজের নিচ দিয়ে মাহনি নদী বয়ে চলেছে। ব্রিজের রেলিংয়ে ঝুঁকে মাহনির শান্ত স্রোত দেখতে দেখতে দেখি সবাই অপেক্ষার ছবি তোলা আর সিগারেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক পাগল এসে কোকের বোতল খুঁজল। মুখ লাগিয়ে খেতে পারবে না শর্তে তাকে বটলটা দেয়া হলো। চান্দের গাড়ি চলে আসল আরো আধা ঘণ্টা পর। ড্রাইভার ইলিয়াস আর তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট জহির আসলেন। জহিরের বয়স ১০/১২ হবে। জহিরকে দেখে বেশ মুগ্ধ হলাম। সোনালি চুল আর খুব ফর্সা বাচ্চা। অনেকটা যেন ইউরোপিয়ান ধাঁচ। তাঁর হাসিও সেই সুন্দর।

safin-11

ত্রিপুরা গাতক উইদ হুক্কা এন্ড গিটার।—লেখক

গাড়ি চলতে শুরু করল। ইলিয়াস ভাই বেশ দ্রুতগতিতে চালাচ্ছিলেন কারণ এসকর্ট ধরতে হবে। এসকর্ট হলো আর্মির গাড়ি একটা সামনে আর আরেকটা পিছনে থাকবে এবং মাঝখানে বাকিসব সাধারণ গাড়ি থাকবে। তাঁরা নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাবে। কারণ শান্তিবাহিনীর ভয় নাকি এখনো আছে। এসকর্ট যেখান থেকে নেয় সেই পুলিশ ব্যারাকে গিয়ে দেখা গেলো শেষ এসকর্ট আমরা মিস করে ফেলেছি! হয় রাতে ওখানে থেকে যেতে হবে নয়ত ফিরে যেতে হবে। জহির মিয়া এবার খুব স্মার্টলি ঘটনা সামলালো। সে বলল পথে গাড়ির ইন্জিন ডিস্টার্ব করায় আসতে দেরি হয়েছে। এখন সব ঠিকঠাক, যদি এনারা অনুমতি দেন তাহলে এসকর্ট ছাড়াই তাঁরা যেতে পারে। বেশ অনেকক্ষণ আঁটকে রেখে জাবেদ ভাইকে বহু কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর ছাড়লেন তাঁরা।

এবার রাসেল ভাই আর রাব্বি ছাঁদে উঠে গেল। আমি আর রিমঝিম গিয়ে সামনে ইলিয়াস ভাইয়ের পাশের সিটে বসলাম। রিমঝিমের আনন্দ কে দেখে! সে হাসছে, বাইরে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। শনের বাড়ি খেয়ে হাতে ব্যথাও পেল। একটু পর সে বায়না ধরল সেও গাড়ির ছাঁদে উঠবে। কিন্তু টাইমিং গণ্ডগোল করে ফেলায় তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। যারা ছাদে ছিল নেমে এল। শুরু হলো আরেক মুসিবত! চান্দের গাড়িতে এত ফুটাফাটা যে ব্যাগট্যাগ মানুষজন গাড়ির ভিতরেই ভিজে একসা!

পথের যেখানে যেখানে পাহাড়ের উপর মাচাবাড়ি চোখে পড়ছিল সেখানেই শিশুরা হাত নাড়ছিল। বয়স্ক লোকজন হুক্কা টানছিল। বৃষ্টিতে চারপাশের পাহাড়গুলো সাদা হয়ে গেল। আর সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! বৃষ্টির ছাঁটের সাদা ফাঁকে সবুজ পাহাড়ের রঙ বদলে হয়ে গেছে ঘন কালচে সবুজ। আমি কোনো একটা কবিতা ভাবার চেষ্টা করে ক্ষ্যামা দিলাম। (হুদাই আতলামি আর কি!) পুরোটা রাস্তা জুড়ে গুন গুন সুরের মতো অমলের মুখটাই ভাসছিল।

রাস্তার দুধারে রিমঝিম যাই দেখে তাতেই সে মুগ্ধ! আমি মাঝেমাঝে অস্ফুটে বলি, “তোমার তেল ফুরায় না কেন?”

সে কিচমিচ করে বলে ওঠে, “আমার তেল না ফুরালে তোমার কী?”

পাহাড়ের উপর বাড়ি দেখে সে বলে, “জানো আমাদের বাড়িটাও পাহাড়ের উপর।”

আমার নিজের পাহাড়ে বাড়িঘর করার শখ আছে, যদিও জানি এটা শখই থাকবে আজীবন। শখ পূরণ হবে না। রিমঝিম সৌভাগ্যবতী। তাঁর নিজেরই পাহাড় এবং পাহাড়ি বাড়ি আছে। যত উঁচুতে উঠছে গাড়ি ইন্জিনের আওয়াজের ঠেলায় কান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে খেয়াল করলাম আশপাশে যখনই বাচ্চাকাচ্চা দেখা যাচ্ছে, তারা হাত নাড়ছে। আমার বড় ভাই বলল, ওরা আশা করে ওদের চকলেট দিবে। অনেকে চকলেট ছুঁড়েও দেয়। ব্যাপারটা শুনে খুব একটা ভালো লাগল না আমার কাছে। তবে আমার নিজের যে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি খারাপ লাগল তা হল, ৫/৬ বছরের বাচ্চা দেখলেই আমি লোভাতুর হয়ে ভাবছি কীভাবে বাগায়ে সাথে নিয়ে আসা যায়!

safin-4

বাসের আদিবাসী মিষ্টি শিশু।—লেখক

বৃষ্টিতে ভিজে জবজবা হয়ে সাজেকের রুইলুই পাড়ায় পৌঁছানোর পর জানা গেল কোনো কটেজে রুম পাওয়া যায় নি। কারণ সাথে মেয়ে আছে। কোনো রকমে একটা ত্রিপুরা বাড়িতে দুইটা রুম ম্যানেজ করা গেছে। মাচার উপর কাঠের বাড়ি। ঘরে ঢুকে আমাদের ড্রাইভার ইলিয়াস ভাই পরিতৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন, “খুব আরামে থাকবেন আপনারা। ঐ রুমে মেয়েরা থাকবে। ওখানে খাট আছে।” মেয়েদের জন্য যে রুম সেই রুমে তিন দেয়ালে তিনটা মগা তাবিজ, দুইটা দা, বিভিন্ন বোতল ভরা পানি, পেছনে কোনো একটা মেয়ের ছবিওয়ালা আয়না, বিছানার উপর নানা দাগে ভরা লেপ তোশক এবং অসংখ্য ছারপোকা কিলবিল করছে।

আর রুমটার ঠিক নিচেই শুয়োর বাঁধা। শুয়োরের ঘোতঘোতানি শুনে বুঝলাম রাতেও এই ডাক ঝিঁঝিঁর ডাকের বদলে অবিরাম চলবে! অবশ্য একটু পরেই এই ডাক আর খারাপ লাগল না। সয়ে গেল কানে। ইলিয়াস ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম বাথরুম কোনদিকে। তিনি পিছন দিকের জানলা খুলে যা দেখালেন তা দেখে আমার ছোটবেলায় গ্রামের বাড়ি যাবার স্মৃতি মনে পড়ল! মূল বাড়ি থেকে বহুত দূরে বাথরুম! পানির ব্যবস্থা আছে কিনা জানতে চাইতেই তিনি ঘরের বাইরে জমানো পানি আর বদনা দেখায়ে দিলেন! আমি কোনো মতে হাসি চেপে রিমঝিমকে বললাম, “কোনদিন ভাবছিলা দুজন কবিকে এভাবে বদনা হাতে বাড়ির পিছনে দূরে বাথরুম যাইতে হবে?” (মনে মনে নিজেরে বললাম, “তুমি কোথাকার কোন এলিট ক্লাস থেকে আসছো যে এমন ঢং মারতেছ!?”)

সবাই হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে, কাপড় পাল্টায়ে গোল হয়ে বসল। ততক্ষণে সন্ধ্যা শেষ। মোবাইলের নেটওয়ার্ক বহু আগেই খতম। রাসেল ভাই আর রাব্বি গিটার নিয়ে কিছুক্ষণ জ্যামিং করল। আমি আর রিমঝিম কী করব আর! কিছুক্ষণ গীবত গাইলাম মানুষের। তাজুল ভাই প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বললেন, “দেখছো দুনিয়ার সব মানুষ আসি ভরি গেছে! পাহাড়ে মানুষ আসে নির্জনতায় সময় কাটাতে, এখন মেলা বসায় দিছে!”

আস্তে করে বললাম, “তারাও আপনাকে দেখে একই কথা ভাবতেছে!”

তারপর উনি উনার বগা লেকের কাহিনি বললেন, সেখানে এক ভদ্রমহিলা তাঁর অটিস্টিক ছেলেকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে উঠে গেছেন। উনার কথা হইল, বাচ্চা নিয়ে কেন পাহাড় যাইতে হবে!

কইলাম, “বাচ্চা কাচ্চা আছে বলে কি পাহাড়ে যাবে না কেউ?”

উনি কেওক্রাডাং জয়ের কথা বলেই বললেন, “জানো আমার ছোট বোন আমার আগে কেওক্রাডাং গেছে!”

একটু পরেই বড় ভাই আর তাজুল ভাই গিয়ে বাজার থেকে পাহাড়ি মুরগি, আলু আর তেলনুনমশলা নিয়ে আসল। ইলিয়াস ভাই বসে পড়লেন মুরগি রান্না করতে। রান্না বান্না যখন চলছে তখন রাব্বি গান ধরল, “হারিয়ে গিয়েছি এই তো জরুরি খবর!”

কেউ খুব সুন্দর করে গান গাইলে আমার কেমন যেন ঈর্ষা হয়। নিজে গাইতে পারি না বলেই হয়ত!

গানের পর আবার আড্ডা জমল। আমি কাশ্মীরের গল্প করলাম। একবার ভোরে আমি আর আমার আফগানি বন্ধু জগিং করতে গিয়ে কীভাবে কুকুরের কবলে পড়েছিলাম এবং আমি কুকুর কত অপছন্দ করি ইত্যাদি। দেখলাম তাজুল ভাইও আমার সাথে একমত। তিনিও কুকুর যারপরনাই অপছন্দ করেন। রাসেল ভাই বললেন, কুকুরের মতো লয়াল আর কিছু হয় না। কুকুরকে আদর করতে জানতে হয়। উনার বাবার কুকুর বাঘা বন্যায় ভেসে গিয়েও কীভাবে ঠিক ঠিক ফিরে আসে, গল্প বললেন। রিমঝিম জানালো তাঁরও একটা কুকুর মিন্টু ছিল। তাঁদের বাড়ির লোকের সাথে কেউ ঝগড়া করতে আসলে সেই মিন্টুও ঝগড়া করত। এসব শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ল, আমাকে কেউ একজন একবার কুকুরের দিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল আমি ভয় পাই জেনে! তিক্ততার কথা সব সময় বলতে নেই। কারো প্রতি জমে ওঠা ঘৃণার কথাও সব সময় বলতে নেই।

রাতে খেয়েদেয়ে খাটের উপর পাটি বিছিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম। ওহ বলা হয় নি, ইলিয়াস ভাই অসাধারণ রাঁধুনি। আমরা চেটেপুটে খেয়েছি।

safin-12

কংলাকের পথে।—লেখক

যাই হোক, শুয়ে পড়ার পর দেখি ক্লান্ত হলেও আমাদের ঘুম পাচ্ছে না। রিমঝিম বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে চাইল। আমরা সবাই মিলে বের হলাম। রাতের পাহাড়ি রাস্তাঘাট, রাস্তার দুই পাশে সারিবাঁধা গাড়ির দল, অচেনা সব মানুষ পেরিয়ে একটু দূরে চায়ের দোকানের আলো দেখে আমাদের খেয়াল হলো আমরা কেউ টাকা নিয়ে বের হই নি। আবার দুজন ফেরত গেল টাকা আনতে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম রাস্তার উপরেই একটা মেয়ে কফি বিক্রি করছে। সম্ভবত এত ভালো কফি আমি এর আগে তেমন খাই নি। ফিরে এসে দেখি আমাদের বিছানার পাটি বিছিয়ে দুই গাতক রাসেল ভাই আর রাব্বির গিটার নিয়ে গান গাইছে! সবাই ঘুমিয়ে পড়বে এটা শুনে অবশ্য তাঁরা চলে গেল।

ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করতেই দেখলাম ছারপোকার যন্ত্রণায় ঘুমানো অসম্ভব। দুজন গুটুরগুটুর গল্প শুরু করতেই অন্য রুম থেকে বলা হলো, কথার শব্দে তাঁরা ঘুমাতে পারছে না। আমরা এরপর ফিস ফিস শুরু করলাম। এরপর বলা হলো, ফিস ফিস আরো যন্ত্রণার! শুয়োরের ঘোঁতঘোতানি আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ, সাথে ছারপোকার কামড় এই নিয়ে মাশাল্লাহ আমাদের ঘুম চটকে চটকে কেমনে যেন হলোও! আমাদেরকে বড় ভাই বলে দিয়েছিল সকাল ৫টায় উঠতে হবে। কংলাক পাহাড়ে যাবে সবাই।

রিমঝিম বলল সে পাহাড়ে ভোর হওয়া দেখবে। ঠিক সাড়ে ৪টায় ঘুম ভাঙল আমার। পাশের আরেকটা কটেজ থেকে এক দঙ্গল পোলাপান বের হয়ে বাইরে কিচকিচ করা শুরু করে দিলো। তাঁদের আওয়াজে কীসের ঘুম কীসের কী! সবাই উঠে পড়লো।

safin-3

মেঘে ঢাকা পাহাড়।

আর্মির রিসোর্টের সাথে লাগোয়া একটা পার্ক আছে। গাছ, দোলনা, বড় বড় পাথরের চাই এর ভিতর সিঁড়ি দিয়ে উঠে ছোট ব্রিজ, কাঠের বেন্চ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বেশ সুন্দর ছোট পার্ক। চারদিকে সমস্ত পাহাড়ে মেঘ ঘুরছে, ফিরছে এলোমেলো ঘন হয়ে। যেদিকেই তাকাই সাদা মেঘ আর সবুজ পাহাড়।

রিমঝিম মুগ্ধ হয়ে বলল, এখানে সে সারাজীবন থেকে যেতে চায়!

আমি বললাম, আর দুইদিন এই একই মেঘ আর পাহাড় দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে যাবে। কংলাক পাহাড়ের কিছুদূর ওঠার পর আমি আর তাজুল ভাই থেকে গেলাম। রাসেল ভাই আগেই পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন। আমার বড় ভাই, রাব্বি, ইলিয়াস ভাইয়ের সাগরেদ জহির, জহিরের বন্ধু, আর রিমঝিম গেল। আমরা দুইজন অপেক্ষা করতে লাগলাম। মাঝেমাঝে ঝির ঝির বৃষ্টি আসে আর যায়। রোদ ওঠে, আবার ছায়া ঘনায়। প্রকৃতির চৌদ্দ রূপ দেখানো চলছিল।

safin-14

পাহাড়ে ঝর্না।

এর মধ্যে অনেকগুলো গ্রুপ গেল। এক ভদ্রমহিলা বাচ্চা কোলে গেলেন। আরেকজন তাঁর দুই মেয়ে(৬/৮ বছরের) নিয়ে গেলেন। আরেক বাচ্চাকে মা যেতে মানা করায় সে গগনবিদারী চিক্কুর পেরে কান্না শুরু করল। দেখে আমি নিজেই মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করে বললাম, “মা জননী যাইতে দেন!”

কান্নার সাফল্যে সে যাবার অনুমতি পেল। আরেক দল এসে আমাদের জিজ্ঞেস করল, কতদূর আর চূড়া? আমরা যেন এই মাত্র চূড়া থেকে নেমে এসেছি এমন ভঙ্গীতে বললাম, “বেশি না অল্প! ১৫ মিনিট লাগবে।”

উনারা পনের মিনিট শুনে খুশি হয়ে রওনা দিলেন। এক ঘণ্টা পার হবার পরেও যখন আমাদের সাহসী অভিযাত্রী দল ফিরে আসলো না, আমরা হাঁটা মারলাম আর অপেক্ষা না করে। তাজুল ভাই বললেন, ওরা এসে আমাদের খুঁজে না পেলেই বুঝবে আমরা চলে গেছি কটেজে।

safin-10

কংলাক জয় করে অভিযাত্রী দল।—লেখক

নিচের দিকে আসতে আসতে দেখি রাসেল ভাই আসছেন। ক্যামেরা উনার হাতে ছিল। তারপর কিছুক্ষণ ছবি তোলা চলল। হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখি নিচের পাহাড় থেকে এমন করে ধোঁয়ার মতো মেঘ উঠছে যেন মেঘ আকাশ থেকে না পাহাড়ের নিচ থেকে উৎপন্ন হয়!

ছবি তুলতে তুলতে দেখি অভিযাত্রী দল নেমে আসছে। রিমঝিম পেয়ারা দিল। সে চূড়ায় উঠে পেয়ারা গাছ পেয়ে, গাছে উঠেই পেয়ারা পেড়েছে। মানুষের যে কত তেল থাকতে পারে ওরে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না! আমি হলে চূড়ায় উঠার পর জিভ বের হয়ে যেত, আর সে গাছেও উঠলো আবার! নেমে আসতে আসতে এমন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল, আমরা দৌড়ে কোনো রকমে একটা ঝুপড়ি দোকানে ঢুকলাম।

ইলিয়াস ভাই দেখি বিশাল এক হুক্কা টানছেন গড় গড় করে! দেখে কেমন লোভ হল! বললাম, “ইলিয়াস ভাই, আপনার শেষ হইলে আমারে দিয়েন!”

উনি দিলেন। আমার বড় ভাই দেখায় দিলো কীভাবে টানতে হয়। টানতে গিয়ে গলার ভিতর ধোঁয়া ঢুকে খকখকানি শুরু হল! আনইশ্মার্ট মাইয়া কোনখানকার!

বৃষ্টি থামার পর ফিরে এলাম কটেজে। তারপর সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে খিচুড়ি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম সবাই। আবার সেই ইস্কর্ট ধরা। প্রায় ৭০টা গাড়ি নিয়ে লাইন ধরে যাত্রা শুরু হল। এবার আমি, রিমঝিম আর জাবেদ ভাইয়া চান্দের গাড়ির ছাদে উঠে গেলাম।

 

কিছুদূর পর দেখলাম, চান্দের গাড়িগুলোও রেস লাগাইছে! কে কার আগে যেতে পারে! পথে একটা জায়গায় ঝর্নার কাছে সব গাড়ি থামানো হল। সবাই নেমে আবার ১২টা ছড়া পেরিয়ে ঝর্নায় যাওয়া হলো। ঝর্নার নিচে এক বিশাল গ্রুপ দখল করে রাখায়, আমাদের আর ভেজা হলো না! দূর দূর থেকে যতটা ভেজা যায় আর কি!

ফেরার সময় গাড়ির ছাঁদে।—লেখক

ফেরার সময় গাড়ির ছাদে।—লেখক

দীঘিনালা ফিরে এসে আবার দুপুরের ভাত খেয়ে দেখি গাড়ি নেই। কোনো বাসের টিকেট নেই! পরে আবার ট্যাক্সি নিয়ে খাগড়াছড়ি এসেও সেই এক অবস্থা। পরদিন অফিস আর কাজ আছে সবারই। ফিরতে হবে যে করেই হোক। একটা বাস পাওয়া গেল, ২৩ জনের একটা গ্রুপ বাস ভাড়া করেছে সেখানে ভাগ্যক্রমে পিছনের কিছু সিট খালি আছে। উঠে পড়লাম। ৫টা বেজে বিকেল।

 

সন্ধ্যার পর এক জায়গায় গাড়ি থামতে আমাদের এক সহযাত্রী আবিষ্কার করলেন গাড়ির হেডলাইট নষ্ট! আমাদের ড্রাইভার টর্চ লাইট জ্বালিয়ে হেডলাইটের কাজ করছেন! সবাই হাউকাউ করে উঠতে ড্রাইভার সাহেব বললেন, “এতক্ষণ কোনো সমস্যা যখন হয় নাই, পরেও হবে না। আর আপনাদের বেশি সমস্যা হলে অন্য বাস দেখেন তাইলে।”

সবাই চুপসে গেল। কারণ বাসের ক্রাইসিস আছে তা সবার জানা! সবাই সুড় সুড় করে উঠে গেল বাসে। আল্লাহর নামে যাত্রা আবার শুরু হল। হাটহাজারিতে আমার বড় ভাই শফি হুজুরের মাদ্রাসা দেখালো। আসলে মাদ্রাসা না, মাদ্রাসার পাশের কালী মন্দির দেখালো। বলল, “বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এটা বেশ ভালো উদাহরণ! এখানে নিয়মিত পূজা হয়।”

খুবই ক্ষুধার্ত অবস্থায় চট্টগ্রাম ফিরে আসলাম। দুনিয়ার যে প্রান্তে যাই না কেন, চট্টগ্রাম শহরের গন্ধ পেলেই শান্তি শান্তি লাগে।

About Author

শাফিনূর শাফিন

গল্প কবিতা অনুবাদের চেষ্টা করি। একটা ইংরেজি ওয়েবজিন 'প্রাচ্য রিভিউ'র কবিতা বিষয়ক সম্পাদক। চট্টগ্রাম নিবাসী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। প্রথম কবিতার বই 'নিঃসঙ্গম'। নিজেকে নিয়ে মূল ব্যস্ততা।