“গঠনমূলক সমালোচনা খুব ভাল কথা। কিন্তু যারা অন্যদেরকে মারা যেতে বলে বা ব্যর্থ বলে কটাক্ষ করে—তাদের দিকে কে নজর রাখবে?”

২০১৭ সালের জুন মাসের মাঝামাঝিতে আইটিউন্স স্টোরে নতুন একটি অ্যাপের সন্ধান পাওয়া যায়। কয়েকদিনের মাঝেই তা সেরা ২০০ ফ্রি অ্যাপের তালিকায় চলে আসে। আর এক মাসের ভেতর আইটিউন্স স্টোরে সারাহাহ’র অবস্থান চলে যায় একেবারে শীর্ষে।

সৌদি আরব নির্মিত এই অ্যাপ আইটিউন্সের পাশাপাশি গুগল প্লে স্টোরেও ৫০ লাখ বারের বেশি ডাউনলোড করা হয়েছে। আর আইটিউন্সের চার্টে বিশ্বের ৩০টা দেশে এই অ্যাপের অবস্থান এক নম্বরে।

কিন্তু এই সাফল্যই শুধু নয়, সারাহাহ নামের এই অ্যাপ নিয়ে মানুষের মাঝে আলোচনা হচ্ছে ভিন্ন এক প্রসঙ্গেও।

‘সারাহাহ’ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ মোটামুটিভাবে ‘সততা’ বলা যায়। সৌদি আরবের ওয়েব ডেভেলপার জায়িন আলাবদিন তৌফিক এর নির্মাতা।

কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীরা যেন একে অপরকে তাদের ব্যাপারে গঠনমূলক সমালোচনা জানিয়ে বেনামি মেসেজ দিতে পারেন—প্রাথমিকভাবে সেই উদ্দেশ্যেই এই অ্যাপের নির্মাণ।

এক মাসের ভেতর আইটিউন্স স্টোরে সারাহাহ’র অবস্থান চলে যায় একেবারে শীর্ষে।

২৯ বছর বয়সী তৌফিক ২০১৬ সালে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলেন এবং ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে অ্যাপের সাথে সমন্বয় করে তা বাজারে ছাড়া হয়।

এর মুখ্য উদ্দেশ্য নাকি ‘বেনামি ও গঠনমূলক বার্তার মাধ্যমে মানুষকে আত্ম-উন্নয়নে সাহায্য করা’। তৌফিক জানান, সারাহাহ’তে এর মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি মেসেজ পাঠানো হয়েছে।

প্রতিটা ইউজার যখন সারাহাহ’তে অ্যাকাউন্ট খোলেন, তখন তাকে নিজস্ব একটি কাস্টম ইউআরএল দিয়ে দেওয়া হয়। সেই লিঙ্ক তিনি তার সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করেন। তারপর লিংকটাতে প্রবেশ করে তাকে মেসেজ লিখে পাঠিয়ে দেন তার ফ্রেন্ডলিস্টের বন্ধুরা। কিন্তু কে তাকে সেই মেসেজ পাঠিয়েছেন তা ইউজার জানতে পারেন না।

এই জানতে না পারার কারণে যোগাযোগটা হয় সম্পূর্ণ একমুখী। মেসেজের গ্রাহক কাউকে রিপ্লাই দিতে পারেন না তাই। আর এ বৈশিষ্ট্যই সারাহাহ’কে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

সারাহাহ’র নির্মাতা জায়িন আলাবদিন তৌফিক

যদিও প্রথম দিকে ইউজাররা তাদের সারাহাহ অ্যাকাউন্টের লিংক শুধু বন্ধু ও পরিচিত লোকদের মাঝেই শেয়ার করছিলেন; কিন্তু ধীরে ধীরে অনেকে ফেসবুক এবং ইন্সটাগ্রামের মত চ্যানেলে ফলোয়ার ও অপরিচিতদের জন্যেও সেই লিংক খুলে দেন। আর আশা করতে থাকেন ‘গঠনমূলক’ সমালোচনার।

তবে ছবি ও ভিডিও শেয়ারের জন্য বিখ্যাত সাইট ‘স্ন্যাপচ্যাট’ এর কল্যাণে সারাহাহ’র জনপ্রিয়তা বহু গুণ বেড়ে যায়। ৫ জুলাইয়ের এক আপডেটের ফলে ব্যবহারকারীরা স্ন্যাপের ভেতর তাদের অ্যাকাউন্টের লিংক শেয়ার করার সুযোগ পান।

মামামিয়া ডট কম’কে সিডনির ১৭ বছর বয়সী একজন জানান, “মেসেজগুলিতে মূলত ইউজারের ব্যাপারে মন্তব্য থাকার কথা। কিন্তু দেখা যায়, বেশিরভাগ শুধু সমালোচনাই থাকে। আসলে এই অ্যাপ সাইবার-বুলিংয়ের এক নতুন ক্ষেত্র।”

মেসেজ প্রেরণকারীকে চিহ্নিত করার কোনো উপায় না থাকায়, এটা বিদ্রূপ ও কটাক্ষের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

আইটিউন্সে সারাহাহ’র রিভিউগুলিতেও সে রকম প্রতিক্রিয়াই পাওয়া যায়।

“নাম প্রকাশ না করার সুযোগে আমার স্কুলের অনেককে সারাহাহ ব্যবহার করে তাদের সহপাঠীদের ব্যাপারে আপত্তিকর মন্তব্য করতে দেখেছি আমি,” বলেন আইটিউন্সের একজন ইউজার, “গঠনমূলক সমালোচনা খুব ভাল কথা। কিন্তু যারা অন্যদেরকে মারা যেতে বলে বা ব্যর্থ বলে কটাক্ষ করে—তাদের দিকে কে নজর রাখবেন?”

“আমার ছেলে একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিতে হয় তাকে, কারণ কেউ একজন খুবই জঘন্য ও রেসিস্ট এক মন্তব্য করে। তাকে শূলে চড়ানোর কথাও বলা হয়। এই অ্যাপ ঘৃণা ছড়ানোর একটা প্রজননক্ষেত্র।”

আরো পড়ুন: কীভাবে আপনি নিজেকে ফেসবুক অ্যাডিকশান থেকে মুক্ত করবেন

সম্প্রতি ‘ম্যাশেবল’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৌফিক বলেন, অ্যাপটিকে ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক স্থান হিসাবে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে আপত্তিকর বেশ কিছু শব্দ ফিল্টার করার ব্যবস্থা করা হবে। সেই সাথে ব্যবহারকারীরা যাতে মেসেজ প্রেরণকারীদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট কাউকে ব্লক করতে পারেন—সেরকম উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেরেমি ব্ল্যাকম্যান মামামিয়া’কে জানান, এরকম বেনামি উপায়ে মানুষদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এর আগে আরো প্ল্যাটফর্ম এসেছে। যেমন ‘Yik Yak’, secret.ly এবং ask.fm। sarahah সেই ধারাতেই নতুন এক সংযোজন।

সারাহাহ’তে নির্মাতা জায়িন আলাবদিন তৌফিকের অ্যাকাউন্ট

তিনি বলেন, “দুঃখজনক ব্যাপার হল, এ ধরনের প্রকল্পে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেয়া হয় না। সাইবার বুলিং বা আক্রমণাত্মক মন্তব্যের ব্যাপারে রিপোর্ট করার জন্য সারাহাহ’তে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয় নাই।”

“অ্যাপল স্টোরে সারাহাহ ব্যবহারকারীদের বয়স ১৭ বছরের ঊর্ধ্বে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পেছনে কারণটাও যথাযথ। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা এরকম মানসিক নিপীড়ন সহজে নিতে পারবে না। আর নাম প্রকাশ না করার সুবিধা থাকলে সেই অত্যাচারের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।”

কমেন্ট করুন

মন্তব্য