স্টিভ জবস প্রযুক্তিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেও পিতা হিসেবে ছিলেন প্রযুক্তিবিমুখ।

স্টিভ জবস (১৯৫৫-২০১১) মানেই নতুন যুগ, অভাবনীয় উদ্ভাবন, আর মোড় ঘুরিয়ে দেয়া প্রযুক্তি।

সুতরাং এটা শুনে যে কেউ অবাক হতে পারেন, অ্যাপেলের এই সাবেক সিইও তার নিজের কোম্পানির সব থেকে চমকপ্রদ পন্য আইফোন ও আইপ্যাড নিজের সন্তানদের ব্যবহার করতে দিতেন না।

স্টিভ জবস প্রযুক্তিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেও পিতা হিসেবে ছিলেন প্রযুক্তিবিমুখ। যিনি নিজে সন্তানদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করতেন।

“আমরা আমাদের সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত করেছি” জবস ২০১০ সালে এমনই জানিয়েছিলেন। সন্তানদের যন্ত্র নির্ভরতার ব্যাপারে এমনই সচেতন ছিলেন তিনি।

জবস নিঃসন্দেহে একজন জিনিয়াস, কিন্তু তিনি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে, অ্যাংরি বার্ডস খেলে কিংবা ফেসবুকে কিছুক্ষণ পরপর স্ট্যাটাস আপডেটের ভেতরে গড়ে ওঠেন নি।

Wired পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ক্রিস অ্যান্ডারসনও বাসায় ব্যবহার করা প্রতিটা প্রযুক্তি অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিৎ বলে মনে করেন।এইসময়কার বাবামায়েরা জানেন আইফোন এবং আইপ্যাডের প্রতি তাদের সন্তানরা কতটা আকর্ষণ বোধ করে। এই হালকা ও সহজ ব্যবহারের যন্ত্রগুলি একধরনের শৈল্পিক খেলনা হয়ে উঠেছে শিশুদের কাছে। অনেক ক্ষেত্রে তা বাবামায়েরও বিকল্প। যে যন্ত্র বাচ্চাদের অনেক ভাবে বিনোদিত করতে পারে, আকৃষ্ট করতে পারে, আবার শান্তও করতে পারে। স্কুল ছুটির দিনে কিংবা বাবামা যখন ড্রাইভিং কিংবা অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত সেই সময় এই ডিভাইসগুলি নিয়ে শিশুরা শান্ত থাকে।

Wired পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ক্রিস অ্যান্ডারসনও বাসায় ব্যবহার করা প্রতিটা প্রযুক্তি অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিৎ বলে মনে করেন।

বাবামায়ের কাজ সহজ করে দেয়ার জন্য অ্যাপলের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার পাশাপাশি কি আমরা কখনো এটা ভেবেছি এর ক্ষতির দিক নিয়ে? শিশুদের জন্য এই ডিভাইসগুলি আসলেই যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

স্টিভ জবস এ নিয়ে ভাবতেন। নিউইয়র্ক টাইমসে  প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে সাংবাদিক নিক বিল্টন এমনটাই জানিয়েছেন। তিনি জবসের সাথে তার কথোপকথনের স্মৃতিচারণে জানান, তার নিজের ধারণা ছিল জবসের সন্তানেরা অবশ্যই আইপড ভালবাসে, কিন্তু তার এই ধারনার কথা শুনে জবস জানান, তারা আসলে তাদের সন্তানদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে কড়াকড়ি রেখেছেন। তার সন্তানেরা আইপড ব্যবহার করে না।

বিল্টনের ভাষায়, তার এই উত্তরে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। কেননা বিল্টনের নিজস্ব কল্পনা ছিল, জবসের বাড়ির দেয়াল টাচ স্ক্রিনের মত, ডাইনিং টেবিল আইপ্যাডের তৈরি। বাসায় যাওয়া অতিথিদের সেখানে আইপড বিলানো হয়। কিন্তু জবস জানিয়েছিলেন আসলে তার বাড়ির পরিবেশ এর ধারেকাছেও না।

২.
জবস একমাত্র প্রযুক্তিগুরু নন যিনি শিশুদের এসব ডিভাইসের প্রতি আসক্তির ক্ষতিকর দিক নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, আরো অনেকেই এই আসক্তির ক্ষতিকর ব্যাপার নিয়ে ভাবেন।

Wired পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ক্রিস অ্যান্ডারসনও বাসায় ব্যবহার করা প্রতিটা প্রযুক্তি অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিৎ বলে মনে করেন। তার সন্তানেরা নাকি তার স্ত্রীর প্রযুক্তি ব্যবহারের আচরণকে অনেকটা ফ্যাসিস্ট আচরণ মনে করে, কেননা তাদের বন্ধুবান্ধবদের বাসায় প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে এমন কঠিন বাধা-নিষেধ নেই। তিনি সন্তানদের ক্ষেত্রে এমন কড়াকড়ির কারণ হিসেবে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানান। কারণ প্রযুক্তির ক্ষতিকর অনেক ব্যাপারের শিকার তিনি নিজেই।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা একটা সমীক্ষা প্রকাশ করেছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে মাত্র অল্প কিছুদিন এই গ্যাজেটগুলি থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখলে তাদের সামাজিক দক্ষতা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

যেটা আসলেই আমলে নেবার মত পর্যবেক্ষণ, যখন আরো জানা যায় বর্তমানে আমেরিকায় শিশুদের এরকম ডিভাইস ব্যবহারের দৈনিক গড় প্রায় সাড়ে সাতঘণ্টা। জবস নিঃসন্দেহে একজন জিনিয়াস, কিন্তু তিনি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে, অ্যাংরি বার্ডস খেলে কিংবা ফেসবুকে কিছুক্ষণ পরপর স্ট্যাটাস আপডেটের ভেতরে গড়ে ওঠেন নি।

স্টিভ, ইভ, রীড, এরিন ও লরেন্স জবস, ২০০৩ সালে, ইটালিতে

স্টিভ জবস বইয়ের লেখক ওয়াল্টার আইজ্যাকসন অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতার পরিবারের সাথে বহু অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছেন। তিনি দেখেছেন জবস তার পরিবারকে সশরীর সময় দেয়াটাকেই প্রাধান্য দিতেন।

স্টিভ জবস প্রতি সন্ধ্যায় রান্নাঘরের লম্বা ডাইনিং টেবিলে বসে সন্তানদের সাথে বই, ইতিহাস ও আরো বিচিত্র ব্যাপারে কথা বলতেন। ডাইনিংয়ে কাউকে আইপ্যাড কিংবা কম্পিউটার আনতে দেখেন নি তিনি। এবং ওয়াল্টার আইজ্যাকসনের মনে হয় নি এই ডিভাইসগুলির প্রতি জবসের সন্তানেরা কোনভাবে আসক্ত।

তাই অ্যাপল কিংবা, স্যামসং বা অন্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলি তাদের বিজ্ঞাপনে যখন আপনাদের বোঝাতে চেষ্টা করে, এই ক্ষুদ্র ডিভাইসগুলি ছাড়া আপনাদের জীবন অপূর্ণ তখন এটা ভেবে দেখবেন, যিনি এই যন্ত্রগুলি তৈরি করেছিলেন তার ভাবনাটা কিন্তু এর থেকে অনেক আলাদা ছিল।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য