তখন ভাবতেছিলাম, এত অল্প পরিচয়ে আগে কারও সাথে দেখা করতে যাই নাই। কেন যাইতেছি তবে এখন? উত্তর পাই নাই।

কেন প্রথম প্রথম শফিকের সাথে পরিচিত হইতে চাইছিলাম তার কোনো সদুত্তর নাই আমার কাছে। গিটার আর গানের প্রতি আমার বরাবরের দুর্বলতা ছিল—শফিকের সাথে আগাইয়া পরিচিত হইতে চাওয়ার এইটা একটা কারণ। সে গিটারিস্ট, ভোকালিস্ট না। তবু আমি তারে গান শোনানোর জন্য বলছিলাম। আমি বলার আগে বলার মত পরিবেশ সে তৈরি কইরা দিছে।

শফিক জিজ্ঞেস করল, গান শুনব কি না।

আমি দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়া বইলা বসলাম, শুনাবা?

—তোমার তো হোয়াটস্যাপ নাই।

—মেসেঞ্জারও নাই।

—তাইলে?

—ফোনে শুনাইতে পারো, যদি তোমার সমস্যা না থাকে।

—আরে কী সমস্যা! টেলিটক হইলে তো কথাই নাই।

আমি আমার জিপি নাম্বারটা টাইপ কইরা দিলাম।

শফিক বলল, পরের দিন ফোন দেবো নে।

ফোনে কথা বলার আগে আমাদের মেসেজিং হইছে। শফিক তখন শোকাহত একরকম, তার প্রাক্তন প্রেমিকার শোক কাটাইয়া উঠতে পারে নাই। তার প্রাক্তন প্রেমিকারে আমি চিনি, তবে পরিচিত না।

শফিক তার প্রেমিকারে নিয়া বলত। কেন ব্রেকআপ হইল, কী নিয়া ঝামেলা হইত—সবটাই জানলাম। তার জীবনের অলিগলি জুইড়া যে তার প্রেমিকা বিরাজমান—তার কথায় বুইঝা নিলাম। আমি মাঝেমধ্যে তাদের প্রেমের ব্যাপারে দুই একটা কথা বলতাম, সাবধানতা অবলম্বন কইরা বলতাম। কারও সম্পর্ক সমন্ধে উইড়া আইসা মন্তব্য করা অযাচিত ব্যাপার।

আমার তখন পরীক্ষা চলে। ফেসবুক ডিঅ্যাক্টিভেট থাকে বেশিরভাগ সময়ে। যে অল্প সময়টুকু অ্যাক্টিভ থাকে, তখন শফিকের সাথে কথা হয়। সে আমার উল্টা স্বভাবের। ফুর্তিবাজ, বাড়াবাড়ি রকম মিশুক, বেপরোয়া ধরনের। ভাবগাম্ভীর্য নাই।

আমাদের দেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, যেহেতু আমরা বেশ দূরের দুই শহরে থাকি। শফিক মাঝেমাঝে দুঃখ কইরা বলত, আমাদের দেখা হইতে হইতে আর এইরকম কথা হইবে না হয়তো। সুতরাং, দেখাও হইবে না আমাদের।

মজার ব্যাপার হইল—এক সপ্তাহের মাথায় আমাদের দেখা হইল।

একলা বরিশাল আইসা, রাস্তায় বইসা ৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সেইদিন আমার সাথে তার দেখা হইছে। তার হকচকাইয়া আসা আমারে অবাক করছে। একই সাথে বিব্রত করছে।

সেইদিন পরীক্ষা দিয়া আর বান্ধবীদের সাথে দাঁড়াইয়া গল্প করলাম না। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলাম। ঝটপট গোসল সারলাম। দুপুরে খাইলাম না।

আমার অপরাধবোধ হইতেছিল যেন শফিক ঢাকা থিকা বরিশাল আসায় আমার অপরাধ হইছে। আমি ভিজা চুল টাওয়েল প্যাচায়া রাইখা বাকিসব গোছগাছ করতেছিলাম। বাবা বাসায় আসার আগে বের হইতে না পারলে বিরাট ঝামেলা হইবে।

বিশ মিনিট পর রেডি হইয়া শফিকরে ফোন দিলাম। বললাম, আইএইচটির সামনে আসো। রিকশা কইরা আসো। বিশ টাকার বেশি নিবে না ভাড়া।

শফিক ফোন কাইটা দিল।

আমি আরেকবার ব্যাগের টাকাপয়সার অবস্থা দেইখা বাসা থিকা বাইর হইলাম। রিকশা নিলাম। আমাদের বাসা থিকা আইএইচটি কাছে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা।

আইএইচটির গেইটের সামনে আসার পর রিকশাওয়ালারে রিকশা থামাইতে বললাম। গেইট থিকা সইরা ছায়ার জায়গায় রিকশাওয়ালা রিকশা থামাইলেন।

শফিক তখন আসে নাই।

আমি ব্যাগ থিকা ফোন বের কইরা মোবাইলের স্ক্রিনে মুখ দেইখা টিপটা কপালের ঠিক মাঝে দিছি কিনা দেইখা নিলাম। বাসা থিকা তাড়াহুড়া কইরা বের হইছি। দেখার সময় ছিল না।

পাঁঁচ/সাত মিনিট পর শফিকরে আবার ফোন দিলাম। জিজ্ঞেসা করলাম সে রিকশা পাইছে কিনা।

—না, হাঁইটা আসতেছি। টাকা নাই।

—চেনো না তো তুমি!

—একটা ফ্রেন্ড নিয়া আসতেছে। প্যারা নাই।

ফোন রাখলাম।

টাকা না নিয়া একটা মানুষ ঢাকা থিকা চইলা আসছে, ভাবতে ভাবতে বিরক্ত হইতেছিলাম। রিকশাওয়ালা তাড়া দিতেছিলেন, পরে ফোন বাহির কইরা বউর সাথে কথা বললেন।

কিছুক্ষণ পর, সুনসান দুপুরের রাস্তায় একটা মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। রিকশার পেছনের ফাঁকা দিয়া তাকাইয়া দেখলাম, এক কান্ধে গিটার, আরেক কান্ধে ব্যাগ, ব্যান্ডের লোগোওয়ালা টি-শার্ট একজন দাঁড়ায়া আছেন।

আমি রিকশা থিকা নামলাম, বললাম,  আসতে পারছো তাইলে!

—হ্যাঁ। এই তো। আসলাম। কী খবর?

—খবর নাই। কে দিয়া গেল?

—পরিচিত হইলাম কিছুক্ষণ আগে, একটা ছেলে, এইখানে বাসা, সে দিয়া গেল।

—আচ্ছা, রিকশায় ওঠো।

—কই নিয়া যাবা?

—বৃন্দাবন।

রিকশায় হুড ওঠানোতে তার বসতে অসুবিধা হইতেছিল। যেহেতু সাথে বড় একটা ব্যাগ, গিটার আছে, সে সেইগুলি নিয়া কুঁজো হইয়া বইসা রইল।

রিকশায় বইসা আমি যতক্ষণ কথা বলছি, ততক্ষণই শফিক বার বার আমার দিকে তাকাইছে, খানিক বাদে চোখ নামাইয়া ফেলছে। আমি কারও চোখের দিকে তাকাইয়া কথা বলতে পারি না, আমি তাই পাশে বইসা তার চোখ ওঠানো-নামানো বুঝতে পাইরা উপভোগ করলাম।

শফিকের কণ্ঠ খ্যাশখেশা, ঠাণ্ডা লাইগা আরও বিচ্ছিরি অবস্থা হইছে। তবু সে কথা বলা থামায় নাই। কথা বন্ধ হইয়া আসলে গলা খাকারি দিয়া আবার বলতে শুরু করছে। সে বলতেছিল, সকাল থিকা ৮ ঘণ্টা সে কী কী করছে।

“লঞ্চ থিকা নাইমা মসজিদে গেলাম। ইমাম বললেন, গিটার নিয়া ঢোকন যাইব না। গিটার বাইরে রাখলাম। ওযু কইরা নামায পড়লাম। বসলাম। তখন মসজিদের এক হুজুরের সাথে আলাপ হইল। হুজুর গান শোনানোর জন্য বললেন। তার নিজের রুমে নিয়া গেলেন।”

মাঝে শফিক কাহিনী ছাইড়া সিরিয়াস হইয়া বলল, এইসব হুজুরদের আমি পছন্দ করি না। সে কারণ বলার আগে আমি বললাম, “চাইল্ড অ্যাবিউজ। এর জন্যই তো?”

শফিক মাথা নাড়ল।

“হুজুরের রুমের পাশে আমসেপারা পড়ানোর রুম। ঠিকমতো গাইতে পারতেছিলাম না। হুজুর পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে নিয়া গেলেন। গান না শুইনা আমারে উনি কিছুতেই ছাড়বেন না। আমারও তাড়া নাই। শুনাইলাম দুইটা গান। তারপর সেইখান থিকা বাইর হইয়া হাঁটতে শুরু করলাম। ক্ষুধা লাগছে। ব্যাগে পপকর্ন বাদে কিছু নাই। অনেক দূর হাঁটার পর একটা খাবারের দোকান পাইলাম। ব্রেকফাস্ট করলাম। সেইখান থিকা বাইর হইয়া মনে হইল, তুমি কোন কলেজে পড়ো তাই তো জানি না।”

আমার সাথে শফিকের খুব অল্প দিনের পরিচয়। আমি অল্প জানি তার ব্যাপারে, সে আরও অল্প। পরীক্ষা দিয়া আইসা একটা টেক্সট পাইছিলাম, “আচ্ছা ইনিসী, কোন কলেজে পড়ো তুমি?” তখন ভাবতেছিলাম, এত অল্প পরিচয়ে আগে কারও সাথে দেখা করতে যাই নাই। কেন যাইতেছি তবে এখন? উত্তর পাই নাই। ভাবিও নাই। চটজলদি শফিকরে ফোন দিছিলাম। চিন্তা হইতেছিল। সে কিছুই চেনে না, কী হইল কে জানে!

শফিক ব্রেকফাস্ট কইরা আমার বাসার পাশের পার্কে চইলা আসছে। আমি তারে এই পার্কের কথা বলছিলাম, এইখানে বইসা থাকা সেফ, তাই সে যেন পার্কেই থাকে তাও বইলা দিছিলাম। পার্কে তার সাথে হিজড়াদের দেখা হইছে। তারা টাকা চাইছে তার কাছে। শফিক নিজেরে ভবঘুরে বইলা পরিচয় দিয়া বলছে, তার কাছে কোনো টাকাপয়সা নাই। তবে সে গান শুনাইতে পারে তারা চাইলে।

সাইডওয়াকে বইসা তারপর সে তাগো গান শুনাইছে। গান গাইয়া টাকাপয়সার ব্যাপার চুকাইলো। রাস্তায় তার লগে যাগোই দেখা হইছে, তাগোই সে নিজেরে যাযাবর বইলা পরিচয় দিছে। আমি তারে ভার্সিটির আইডি কার্ড সাথে নিয়া আসতে বলছিলাম যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে অন্তত ওইটা দেখানো যায়। শফিক তাও আনে নাই।

পার্কের সামনে দীঘি আছে একটা। তার পাশে সাইডওয়াক। মানুষজন তাতে আইসা বসেন, প্রেম করেন কেউ কেউ। শফিকের প্রেম করার সুযোগ নাই।

না, সে বসেও নাই। একপাশে ঘাট বান্ধানো আছে দীঘির। সেইখানে গিটার আর ব্যাগ রাইখা সে গোসল কইরা নিছে।

জিজ্ঞাসা করলাম, জামাকাপড় পাল্টাইছো কই?

শফিক যেন কিছুই হয় নাই এমন মুখ কইরা কইল—ওইখানে। সবার সামনে।

এই কথা শুইনা প্রথমবারের মত আমি তার মুখের দিকে তাকাইলাম। রিকশায় পাশে বইসা সে অনর্গল কথা বইলা যাইতেছে, কিন্তু মুখের দিকে তাকাইতে ইচ্ছা হয় নাই। সবার সামনে জামাকাপড় পাল্টানোর কথা শুইনা তারে না দেইখা আমি পারলাম না।

তার চেহারা সাধারণ, চুল দাঁড়ি অবিন্যস্ত—সেইটাও স্বাভাবিক। নাকের ডগায় চশমা নামাইয়া রাখছে। কথা বলতেছে পুরান ঢাকাইয়াদের মত। গলার স্বর বাজে। কথা বলার ধরন তার চেয়েও বেশি বাজে।

শফিকরে তার কথার মাঝে জিজ্ঞেস করলাম, হোমটাউন কোথায় তোমার?

—পাবনা।

—সেইখানের মানুষজন এইভাবে কথা বলে?

—উঁহু। আমি আসলে একসময় সবার কথা ইমিটেট কইরা বলতে চাইতাম। রংপুর, নোয়াখালী, বরিশাল—সব অঞ্চলের মানুষের কথা। এইটা করতে করতে একসময় বিচ্ছিরি জিনিসটা আমার হ্যাবিটে দাঁড়ায় গেল। আমি নর্মালি কথা বলতে পারি না এখন।

শফিকরে সংক্ষেপে “আচ্ছা” বইলা রিকশাওয়ালারে রাখতে বললাম। আমরা নামবো।

শফিক যে টাকাপয়সা নিয়া আসে নাই, সেইটা আগেই প্রমাণ হইয়া গেছে। আমি ব্যাগ থিকা টাকা বাইর করলাম। একশো টাকার একটা নোট রিকশাওয়ালার হাতে দিয়া আমি নামলাম।

রিকশাওয়ালা বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তার পলিথিনের ব্যাগের টাকাপয়সা হিসাব করা শুরু করল।

শফিক হঠাৎ খুব মজা নিয়া বলল—“ভালোই খাটো তুমি।”

রিকশাওয়ালা টাকার হিসাব করা রাইখা শফিকের মুখের দিকে তাকাইলেন। আমিও তাকাইলাম। আমার হাইট যে ৫ ফিট ১ ইঞ্চি এইটা আমি যেন নতুন কইরা জানলাম। এমন সেন্সলেস মানুষও যে দুনিয়ায় থাকে, এইটাও নতুন আবিষ্কার করলাম।

রিকশাওয়ালা আমারে বাকি টাকা ফেরত দিলে তা ব্যাগে নিয়া আমি সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। মেজাজ খারাপ হইয়া গেছে, বাসায় ফিরা আসব কিনা ভাবতেছি। কেন এইসব মানুষের সাথে দেখা করতে আসছি ভাইবা প্রচণ্ড রাগ হইতেছিল নিজের ওপর।

শফিক পাশেপাশে হাঁটতেছে, কথা বলতেছে এবং কথা খুব বিরক্তিকর ঠেকতেছে।

আমি তার কোনো কথায় হু-হা করলাম না। রোদের জন্য রাস্তার পাশে ঘাসের ওপর বসা গেল না। তাই আরও সামনে আগাইলাম।

সামনে নদী, নাম কীর্তনখোলা। ওপারের চর দেখা যায় এপারে দাঁড়ায়। রাস্তার পাশে বসার জন্য কয়েকটা সিট করা।

আমি শফিকের পাশে না হাঁইটা সামনে আগায়া গেলাম। পিছন থিকা সে কয়েকবার নাম ধইরা ডাকল। ফিরা তাকায়া বললাম—না চেচাইয়া চইলা আসো।

যে সিটটা খালি, তার ওপর একটা খালি মিস্টির প্যাকেট রাখা। সেইটা ফালাইয়া বই দিয়া জায়গাটা ঝাড়া দিয়া তারপর বসলাম।

আমার ব্যাগ, আমি, শফিকের ব্যাগ, শফিক—এইভাবে বসলাম। শফিক গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞেস করল, বিরক্ত হইতেছো? চোখমুখ কুঁচকায়া আছো কেন?

—রাতে ঘুমাই নাই। ঘুম আসছে। টায়ার্ড।

—আমি ভাবছিলাম, তুমি আমাকে লাঞ্চ করাবা।

—টাকা থাকলে করাইতাম। মাস শেষ, টাকা নাই।

—কই মাস শেষ? আজকে বিশ তারিখ!

—ওই একই।

—একই না। ক্ষেইপা আছো কেন?

—রিকশাওয়ালার সামনে আমারে খাটো বলার খুব দরকার ছিল?

—তুমি ওইটা ধইরা বইসা আছো! হা হা হা! তোমাকে তো কম-ই পঁচাইছি। আমি এইরকম, মানুষরে বিব্রত করতে ভাল্লাগে।

—আচ্ছা।

—শোনো, আমাদের দেশের মেয়েরা এইরকম হাইটেরই বেশির ভাগ। তুমি ঠিক আছো, অ্যাভারেজ।

—তোমার কাছে ঠিক ভুল শুনতে চাই নাই।

শফিক এই প্রসঙ্গ বাদ দিয়া অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু করল।

তার নিজের কথা সব। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা, টেস্টে ফেল, অ্যাডমিশান, ভার্সিটি, প্রেমিকা, ব্যান্ড, শো, প্র্যাকটিস, ফ্রেন্ড, ফ্যামিলি—আমি মোটামুটি তার ব্যাপারে সামারি লেখার মত তথ্য পাইয়া গেলাম।

শফিক গান খুব বাজে গায় না। কথাবার্তা মিক্সড আপ কইরা যেমন জঘন্য কইরা ফেলছে, গানের ক্ষেত্রে তেমন হয় নাই। আর যেহেতু গিটারিস্ট সে, প্র্যাকটিস আছে গানের, শ্রুতিকটু লাগে না তাই।

শফিক গান শুরু করল—উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার। আমি নদীর ট্রলারদের দেখতেছি। রাস্তার মানুষজন প্রথমে অবাক হইয়া শফিকরে, পরে আমারে দেখতেছে। হেমন্তের বিকাল, নদীতে ভাইসা যাওয়া নৌকারা, দূরের ইটের ভাটার ধোঁয়া, পাশে একটা ছেলে আমার পছন্দের গান শুনাইতেছে—আমার ম্যাজিক্যাল মনে হইতেছিল সবটা। সুন্দর, অথচ স্বাভাবিক না।

গান শেষ কইরা শফিক ব্যাগ থিকা তার সানগ্লাস বাইর করল। বলল, এইটা লাকি সানগ্লাস।

হাসলাম, রাগ কইমা গেছে তখন।

ফেরার সময় ওইখানটার আশপাশ আরেকটু ঘুইরা দেখলাম। শফিক পিছনে হাঁটতেছে আর কথা বলতেছে। প্রাক্তন প্রেমিকার কথা বলতেছে, আফসোস করতেছে। কথাপ্রসঙ্গে বলল, তার বন্ধু তারে এক প্যাকেট কনডম দিছে গত মাসে, সেইটা জলেই যাইবে। আর কয়দিন আগে দিলে হয়ত জলে যাইত না।

আমি আবার তারে দেখার জন্য পিছন ফিরা তাকাইলাম। সে নদীর দিকে তাকায়া আছে। মুখে কোনো রকম অস্বাভাবিক আঁকিবুকি নাই।

খানিক সামনে আগাইয়া টঙের দোকানের বেঞ্চে বসলাম। চা খাওয়ার জন্য। শফিক সিগারেট কিনা নিল। মাগরিবের আজান পড়ছে তখন। অন্ধকার হইয়া আসতেছে।

রিকশা করলাম।

শফিক আসার সময়ের চেয়ে আরেকটু বেশি গা ঘিঁইষা বসল এবং এইজন্য সে ‘স্যরি’ও বইলা নিল।

ক্ষুধায় আমার যাই-যাই অবস্থা তখন। শফিকরে বললাম, তুমি না আসলে দুপুরে আমার খাওয়া হইত, ঘুম হইত।

—আমি না আসলে আমার তিনবেলার খাওয়াই হইত। এত কষ্টও হইত না সারাদিন।

—আসলা কেন?

—বুঝতেছি না আসলে।

—কেন?

—তাও বুঝতেছি না।

আমি কিছু বললাম না। বাসার কাছাকাছি চইলা আসছি। জিজ্ঞেস করলাম, চিনছো?

—না।

—এই যে এইখানে দেখা হইছিল দুপুরে।

—ও! হ্যাঁ! চিনছি!

—নামতে হবে এইখানে।

—আচ্ছা।

—কই যাবা?

—লঞ্চঘাট। থাকা যাবে না। টাকা নাই। ভুলে অল্প টাকা নিয়া আসছি। শুধু লঞ্চভাড়া আর উবারের ভাড়া আছে।

—আচ্ছা।

শফিক নামল।

বিদায় দিলাম না, সেও দিল না।

রিকশা চলা শুরু হইল। পিছনে ফিরা তাকাইলাম না।

বাসায় আইসা দাঁড়াইতে ফোনে টেক্সট আসল—“It was a fun little trip and meet. Thanks for the opportunity.”

আমি ফোন রাইখা বারান্দায় আইসা দাঁড়াইলাম। ৮ ঘণ্টা অপেক্ষার জন্য শফিকের প্রতি এক রকম মায়া হইতেছে।

শফিক যখন রিকশা থিকা নামল, তখন চারপাশের অন্ধকারের চেয়ে তার মুখের ওপর নাইমা আসা অন্ধকার বেশি চোখে লাগতেছিল। কেন এত বিষণ্ণ লাগতেছিল? কে জানে!

রাত্তিরে যোগাযোগ হইল না। আমি পড়া শেষ কইরা পড়ার টেবিলে ঘুমাইয়া গেছিলাম।

সকাল পাঁচটায় ফোনের ভাইব্রেশনে ঘুম ভাঙলো। একটা মেসেজ আসছে। শফিকের।

“ঢাকা পৌঁছাইছি। তুমি যাওয়ার পর থেকে ঢাকা আসা পর্যন্ত কেমন জানি ঘোরের মধ্যে কাটাইছি। ক্যানো এমন হইল জানি না। I just felt sad. Thanks again for your time, btw.”

ফোন অফ কইরা রাখলাম। টেবিলের ওপর মাথা ঠেস দিয়া চোখ বন্ধ কইরা ছিলাম।

মাথায় কিছু লাইন ঘুরতেছে। “I am also feeling sad. Why am I feeling sad, dear? I don’t know, too!”

শফিককে টেক্সট করলাম না।

লাইনগুলি মাথায় ঘুরতে ঘুরতে আমার ক্লান্তি চইলা আসল। আমি টেবিলে মাথা ঠেস দিয়াই রইলাম।

কমেন্ট করুন

মন্তব্য