page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

৫ মে’র মুখ

২০১৩ সালের ৫ মে আমি যে অফিসে চাকরি করতাম সেটা ছিল সতের তলায়। যারা উঠেন নাই এত উপরে তারা এর উচ্চতা টের করতে পারবেন না। এত উঁচায় আমাদের একটা স্মোকিং জোন ছিল। এর ছোট্ট জানালাটা যে দিকে সে দিকে মতিঝিল।

অই জানলা দিয়া দেখা আকাশে বিপুল ধোঁয়া সেদিন। খবরে জানতেছিলাম সেখানে গণ্ডগোল চলতেছে। হেফাজতের লোকেরা সব পুড়ায়া দিতেছে। টিভি-অনলাইনে খবর পইড়া আমার টেনশন মিটে না।

একটু পর পর ধোঁয়া দেখতে যাই। আশা করি ধোঁয়া কমবে। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনায়ে আসলেও সেটা কমল না।

সেদিন মোটামুটি টেনশন নিয়াই অফিস থিকা আগে আগে বাইর হইলাম। অনেকের লগে আলাপ করলাম। ভাবলাম খারাপ কিছু হবে না। রাতে টিভি দেখতে বসলাম। দিগন্ত চ্যানেল দেখতেছিলাম বোধহয়। রাত কয়টা হবে জানি না। ততক্ষণে যৌথ বাহিনী নেমে গেছে হেফাজতিদের তুলে দিতে। আমি টিভিতে দেখলাম এক কিশোর হয়রান হয়ে পড়ে আছে রাস্তায়। তার আশপাশে পুলিশের ছুটাছুটি। ঐ কিশোর একা, অসহায়, সে কোথায় যাবে, কী করবে, কেন আসল ঢাকায় জানে না বলে তার মুখ দেখে মনে হইল। একটু পর সে উঠে বসল। তাকাইল চারপাশে। সেখানে কেউ নাই, টিভি ক্যামেরার আলো তারে কতটা পথ দেখাইল কিম্বা আমাদের দরদি সরকারের বাহিনী জানি না। ওরে আমি চিনি না। ইভেন ও যদি শাপলা চত্বরে না আসত আমি তার বিষয়ে মনোযোগীও হইতাম না। হইলাম তার আসার কারণ আছে দেখে। সেই কারণটা রাজনৈতিক।

salahuddins1

আমি ভাবলাম এই ঘটনায় আর লিপ্ত থাকা যাবে না। এ থেকে বের হয়ে যাইতে হবে। দিগন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই আমি টিভি বন্ধ করে দিলাম। শুয়ে পড়লাম। ঘুম চলে আসল।

রাতে আমার সহজে ঘুম না আসলেও সেদিন আসল। পরদিন ছুটি ছিল। এদিক-সেদিক কেনাকাটা করলাম। ব্যাংকে গেলাম। ফোন দিলাম দুই-একজনকে। পত্রিকা, অনলাইন টিভিতে তাণ্ডবের বিবরণ। আমি হেফাজতকে এভাবে ঢাকা ছাড়া করার বিষয়ে আপত্তি জানায়া স্ট্যাটাস দিলাম।

এরপর নানাভাবে, মূলত ফেসবুকেই এই ঘটনায় আবার লিপ্ত হয়ে গেলাম। আমাদের প্রগতিশীল, বামপন্থী বন্ধুদের জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা পড়লাম হেফাজতকে নিয়ে। অন্যরা তো ছিলেনই।

এত ঘটনা ৫ মের বলে শেষ করা যাবে না। বামের বুজুর্গদের কেউ কেউ আমারে হেফাজতি-জামায়াতি বললেন। আমার বিষয়ে তাদের মন্তব্য করার কোনো কারণ নাই। আমি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কেউ না। কিন্তু না করে পারেন না সামাজিক কারণে। আমি ফলে না চাইলেও যুক্ত হয়ে পড়ি এসব ঘটনায়। তবে অদ্ভূতভাবে ৫ মের সব ঘটনা আমার কাছে রাতের টিভিতে দেখা ঐ অসহায় কিশোরের মুখ হিসাবে ধরা দেয়। আর কিছু তেমন মনে থাকে না।

অন্যরা হয়ত বলে নানা ঘটনার কথা। কিন্তু ঐ কিশোরের কথা কেউ বলে না। ওর কোনো ফটোগ্রাফ নাই, ভিডিও ফুটেজ নাই। লোকে কেমন পক্ষে-বিপক্ষে হেফাজতকাণ্ডের ছবি শেয়ার দেয় ফেসবুকে।

আমি ওরে মনে করতে না চাইলে অথচ সেই জোব্বা পড়া কিশোর আমার মধ্যে কেমন সাঁধায়া গেল। সে চকিত ধরা দেয় নিজের খেয়াল-খুশি মতো। আমার রাজনৈতিক বুঝ আমি স্থগিত রাখতে চাই। পারি না। মনে হয় কন্সপিরেসির আলাপ দিয়ে কী হবে? হেফাজতের ঢাকায় আসা, তাদের পক্ষ নেওয়া, তাদের বিরোধীতা করা কিম্বা তাদের সঙ্গে সরকারের আবার খাতির হওয়া এসব নিয়ে বলে কী হবে?

নিজের বুঝ নিজে নিয়া আমি আমার মতোই তো থাকি। আর বন্ধু কিম্বা সংসারসঙ্গ করি। চাকরি করি। সেখানে হেফাজত বিশ্লেষণের দরকার পড়ে না। তারপরও আমি সেসব করি এসব সঙ্গদোষেই মূলত।

হেফাজতে ইসলাম ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তারা এখনকার ইন্ডিয়ার সঙ্গেও যুক্ত। যারা শাহবাগে ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র খুঁজে পান তারা হেফাজতের বেলায় কেন পান না সেই প্রশ্নের উত্তর ফলে আমি আর এখন জানতে চাই না। কারণ আমি জানি আমাদের দোষ দেওয়ার বা ধরার স্বভাব। নিজের অস্তিত্ব সংকট প্রবল বলে এমনটা হয়। আমার অস্তিত্ব যেন অন্যকে খাটো বা হেয় নিদেন সমালোচনার উপর ডিপেন্ড করে। সে অর্থে তো ইডিওলজি দেখলাম না। পাল্টাপাল্টি ছাড়া অথবা দাবিনির্ভরতা ছাড়া।

হেফাজতের ঢাকায় আসার ভরসা কি কেবলই বিএনপি ছিল? নাকি সরকার তাদের আনছে? সরকার আনলে এভাবে আবার তাদের তাড়াইল কেন? আবার সেই সরকারের সঙ্গেই তাদের এখন খাতির কেন? এমন সব প্রশ্নও আমি কাউরে করি না কো আর। কারণ লাভ নাই, মাঝখানে কোনো জায়গা এখন আর বাকি নাই।

অথবা যেসব বুদ্ধিজীবী সমর্থন দিছেন হেফাজতের ঢাকায় আসার, তারা কেন ভাবেন নাই এই নওল কিশোরেরা বিপদে পড়তে পারে, তাদের জীবনে ভয়াবহ এক রাত নেমে আসতে পারে। যে গিমিক তারা তুললেন তা তো উদ্ধার করতে পারলেন না।

আমার দেশ কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই যে রাজনীতি করতে চাইল অথবা বিএনপি অথবা এই ধারার বুদ্ধিজীবীরা কিম্বা বিপরীতের লোকেরা কেউ পরবর্তী পরিণতির ভাবনা ছাড়াই একদল মানুষকে যে ভাগাভাগির মধ্যে ফেলে দিলেন সেই রাজনীতি নিয়েও আলাপ আর দেখলাম না।

হেফাজত একটু ভালো আর সবল থাকলে, কেউ যদি একটু দয়া করে তাদের সুযোগ দিতেন কিছু কিছু কথা বলার, তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলাপের তাইলে আমরা বেটার অবস্থায় কি থাকতে পারতাম এর চাইতে। সেদিনের হেফাজত খেদানোর বিজয় কি আমরা খুব পারছি এনজয় করতে?

নাকি বিষয়টা ভিন্ন আরো। এই ভাগাভাগি উইল কন্টিনিউ। এবং এই ভাগাভাগিই পরিণতি আমাদের। এসব হাইলি পলিটিক্যাল আলাপের কিছুই ঐ ছেলেটার সঙ্গে আমার হবে না। হবে সেসব লোকেদের সঙ্গেই যারা ঐদিনের ঘটনা থেকে দূরে ছিল, হয়ত বেঁচে গেছে, এখন ভুলে যাওয়ার মধ্যে আছে।

অথবা তার দলের পক্ষের বুদ্ধিজীবী কিম্বা বিপক্ষের কারুর সঙ্গে। ওর সঙ্গে হবে না। ও আমার সামনে আসলেও চিনব না। টিভির দৌলতে তারে আমার দেখা। ওর কোনো অ্যাসথেটিক্স নাই, পলিটিক্সও কি ছিল তেমন? মনে হয় না।

ওর পলিটিক্স তো অন্যরা বানাইছে। ওরে শত্রু হিসাবেও হাজির করছে অন্যরাই। নিজের পরিণতির বিষয় ওর ভূমিকা হয়ত কেবল ওই আস্থা। এই আস্থার গুরুত্ব সেদিন কেউ দিল না। আমি তো দেখি আস্থা বিষয়টাই এখন দেশ থিকা উধাও হয়ে গেছে। আমরা যেনবা ঐ কিশোরটা না অথবা ওর মতো কখনো হব না এই কসরৎই তো করে যাইতেছি।

নাকি এর চাইতে ভালো আছি অনেকে বা কেউ কেউ?

 

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।