page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব

‌আম

আমকে বলা হয় ফলের রাজা। আম শুধু স্বাদে গন্ধেই অতুলনীয় নয়, আম ব্যাপকভাবে পুষ্টিকর উপাদানে সমৃদ্ধ। কিছু কিছু ফলকে স্বাস্থ্যগত উপকারিতার জন্য ‘সুপার ফ্রুটস’ বলা হয়, আম তার একটি।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের ঋতুভিত্তিক ফলের একটি আম। হিমালয়ের পাদদেশে, ইন্ডিয়া উপমহাদেশের সমতলভূমিতে আমগাছ জন্মায়। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের দিক থেকে, আম ‘অ্যানাকারডিয়াসিয়ে’ পরিবারের সদস্য। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের আরো অসংখ্য প্রজাতির ফলগাছ, যেমন কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম ইত্যাদি এই পরিবারের সদস্য।

আমের বৈজ্ঞানিক নাম ‘ম্যানগিফেরা ইন্ডিকা’।

ইন্ডিয়া উপমহাদেশের অনেক অঞ্চলেই আম উৎপন্ন হয়। আর এখন সারা পৃথিবি জুড়ে ব্যাপকভাবে আমের চাষ হচ্ছে। প্রথমে মুকুল ধরে, এবং পরে একটি লম্বা বোঁটায় একটি আম ধরে, কখনো কখনো একটি বোঁটায় একাধিক আমও ধরে।

একেকটি আম লম্বায় ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। আমের প্রস্থ হয় সাধারণত ৪ থে ১০ সেন্টিমিটার। আমের আকৃতি বিশিষ্ট, অর্থাৎ আমের মতই। তবে কোনো কোনো জাতের আম লম্বাটে এবং গোলাকারও হয়। একেকটি আমের ওজন ১৫০ গ্রাম থেকে ৭৫০ গ্রাম হয়। আমের বাইরের খোসা মসৃণ হয় এবং কাঁচা আমের খোসা সবুজ রঙের হয়। আম পাকলে দেখতে উজ্জ্বল সোনালী বা লাল বা কমলা রঙের হয়; এটা নির্ভর করে আমের জাতের উপর। আমের সিজন শুরু হয় এপ্রিলের শেষের দিকে এবং আগস্টের একেবারে শেষ পর্যন্ত থাকে। এই সময়টুকুর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন জাতের আম পাওয়া যায়।

খোসা ছাড়ানোর পর আমের ভিতরের অংশ রসালো হয় এবং কমলা-হলুদ রঙের হয়। ভিতরের এই মাংসল অংশকে বলে মেসোক্র্যাপ। মাংসল অংশের ভিতরে সাদা রঙের আঁটি থাকে, এই আঁটির উপরে আমের মূল রসালো অংশটি থাকে। আমের ঘ্রাণ মোটামুটি তীব্র এবং অনেক সুন্দর। আমের স্বাদ মিষ্টি, সাথে সামান্য টক ভাব থাকে। ভালো জাতের আমে আঁশ থাকে না এবং টক ভাব খুবই কম থাকে। আমের আঁটি একবীজপত্রী হয় সাধারণত, তবে কখনো কখনো দ্বিবীজপত্রীও হয়।

আমের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
আমে প্রচুর খাদ্য-আঁশ, ভিটামিন, মিনারেলস, পলিফেনলিক ধরনের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যৌগ থাকে।

নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে আম কোলন, ব্রেস্ট এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে। অনেকগুলি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আমের পলিফেনলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ব্রেস্ট ক্যান্সার ও কোলন ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে।

আমে প্রচুর ভিটামিন এ, বেটা-ক্যারোটিন, আলফা-ক্যারোটিন ও বেটা-ক্রিপ্টোক্সানথিন থাকে। ১০০ গ্রাম আমে প্রতিদিনকার চাহিদার ২৫ শতাংশ ভিটামিন এ থাকে। উপরে উল্লিখিত এই উপাদানগুলি একসাথে মিলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং চোখের জন্য কাজে লাগে। ক্যারোটিন সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক ফল খেলে তা ফুসফুস ক্যান্সার ও মুখের ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে।

তাজা আমে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। ১০০ গ্রাম আমে ১৫৬ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে, এবং মাত্র ২ মিলিগ্রাম সোডিয়াম থাকে। শরীরের কোষ এবং তরল উপাদানের জন্য পটাশিয়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ, পটাশিয়াম হার্টের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণ করে।

আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-সিক্সও (পাইরডোক্সাইন), ভিটামিন-সি ও ভিটামিন-ই থাকে। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেলে শরীরে সংক্রামক জীবানু এবং অক্সিজেন-বিহীন র‍্যাডিকেলগুলির  বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হয়। ভিটামিন বি-সিক্স ব্রেইনের GABA হরমোন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। ভিটামিন বিসিক্স রক্তের হোমোসাইস্টেইনের মাত্রার ভারসাম্যও নিয়ন্ত্রণ করে, এই ভারসাম্য নষ্ট হলে হৃৎপিণ্ডের ধমনী ও শিরার সমস্যা হয়ে স্ট্রোক হতে পারে।

আমে যথাযথ পরিমাণে কপার থাকে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমের জন্য কপার সহায়ক জিনিস, যেমন সাইটোক্রোম সি-অক্সিডেস এবং সুপারঅক্সাইড ডিসমুটেস অ্যানজাইম নিঃসরণের জন্য কপার সহায়ক; অন্য দুটি সহায়ক উপাদান হল জিংক ও ম্যাংগানিজ। লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনের জন্যও কপার প্রয়োজনীয়।

তাছাড়া, আমের খোসাতে প্রচুর পরিমাণে ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস থাকে; ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

আম নির্বাচন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
আম সিজনাল ফল। মার্চ মাসেই মুকুল থেকে আম বড় হতে থাকে এবং পাকলে বাজারে নেওয়া হয়।

আম বড় হলে গাছ থেকে পেড়ে পরে পাকানো হয়। কাঁচা আম খুবই টক হয়। অর্গানিকভাবে আম পাকার জন্য গাছেই রেখে দেওয়া হয় এবং পাকলে সেগুলি পাড়া হয়। আম বেশি পেকে গেলে গাছ থেকে পড়ে যায় এবং অতিরিক্ত পেকে যাওয়ার পর পচে যেতে শুরু করে।

বাজারে বিভিন্ন জাতের, তাই বিভিন্ন সাইজ ও রঙের আম পাওয়া যায়। আলফনসো জাতের আম হয় ইন্ডিয়ার মহারাষ্ট্র প্রদেশে, সিন্ধুরি জাতের আম হয় পাকিস্তানের কেশর অঞ্চলে- এই জাতের আমগুলি তাদের স্বাদের জন্য অতুলনীয়। টোটাপুরি জাতের আমের নিচের সামনের দিকের অংশ টিয়াপাখির ঠোঁটের মত বাঁকা হয়। টোটাপুরি জাতের আম কাঁচা অথবা আধাপাকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু। আমের জাতের ধরন অনুযায়ী আম টক ও মিষ্টির মিশ্র স্বাদের হয় এবং সেই সাথে বিশেষ ধরনের মিন্ট বা লবঙ্গের স্বাদযুক্ত আমও পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতের আম যেমন হেইডেন বা বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড আম অনেক জনপ্রিয়।

আম পছন্দ করার সময় দাগবিহীন এবং কালশিটেবিহীন আম পছন্দ করবেন। আম না পাকলে স্বাভাবিক রুম টেম্পারেচারে আম কয়েকদিন রেখে দেওয়া যাবে, পেপার দিয়ে ঢেকে রাখলে আম পাকবে। পাকা আম রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করতে পারবেন। তবে আম খাওয়ার আগে রেফ্রিজারেটর থেকে বের করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখবেন, তাহলে আমের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যাবে।

যে পদ্ধতিতে আম খাবেন
আমের শরীর থেকে ধূলা-ময়লা ও রাসায়নিক উপাদান পরিষ্কার ক্রয়ার জন্য ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে সেই পানিতে আম ধুয়ে নিবেন। এরপর শুকনা কাপড় দিয়ে আমটিকে মুছে শুষ্ক করবেন। আমটিতে বাইরের কোনো ফ্লেভার বা কোনো উপাদান দিবেন না। আমটিকে লম্বাভাবে ফালি করে কাটবেন। এমনভাবে কাটবেন যেন মাঝখানের অংশে আমের আঁটি পড়ে। এরপর আমের ফালিগুলি থেকে খোসা ছাড়িয়ে নিবেন। এখন এই ফালিগুলিকে আপনার পছন্দ অনুযায়ী সাইজ করে কাটতে পারেন।

আরো পড়ুন: কলা

আরেকভাবে আম কাটতে পারেন। আমের আঁটির দুই পাশে থেকে আম কেটে নিবেন। এভাবে কাটলে আমের বেশিরভাগ অংশ কাটা হয়ে যাবে। এরপর আঁটির সাথে লেগে থাকা চিকন অংশগুলি কাটবেন। এরপর খোসা ছাড়িয়ে আপনার পছন্দমত- লম্বালম্বি বা পাশাপাশিভাবে বা কিউব করে কাটতে পারবেন। তবে খোসা ছাড়ানোর সময় সাবধানে ছাড়াতে হবে যাতে খোসার সাথে আমের মাংসল অংশ না উঠে আসে।

বাড়তি কোনো ফ্লেভার বা উপাদান ছাড়াই আম খাওয়া যাবে। এবং এভাবে আম খাওয়াই ভালো।

আম কিউব করে কেটে ফ্রুট সালাদে দেওয়া যাবে।

বরফের কিউব দিয়ে আম খুব সুস্বাদু পানীয়।

আমের রস দুধের সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে ম্যাংগো মিল্কশেক তৈরি করা যায়। জ্যাম, জেলি, আইস ক্রিম ও ক্যান্ডি ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যে আম ব্যবহার করা হয়।

কাঁচা আম থেকে বিভিন্ন ধরনের আচার, জ্যাম, চাটনি ও মোরব্বা তৈরি করা যায়।

সাবধানতা
যাদের অতিরিক্ত ভিটামিন-এ গ্রহণে সমস্যা হতে পারে তাদের আম পরিহার করা উচিৎ।

কাঁচা আম থেকে অনেকের অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে। কাঁচা আম থেকে কিছু অ্যালার্জি উপাদান উদ্দীপিত হয়। আম থেকে অ্যালার্জির সমস্যা হলে মুখের দুপাশে, ঠোঁটে এবং জিহবার আগায় চুলকায়। কারো কারো ক্ষেত্রে এই সমস্যা মারাত্মক হতে পারে, যেমন ঠোঁট ফুলে যায়, মুখের দুপাশে ঘা হয়, বমি অথবা ডায়রিয়া হতে পারে।

এইগুলি হয় কারণ কাঁচা আমে অ্যানাকারডিক নামে এক ধরনের এসিড থাকে। অ্যানাকারডিয়াসিয়ে পরিবারের অন্যান্য ফলেও এই এসিড থাকে। তাই এই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত অন্য ফল খেলেও কারো কারো এই সমস্যাগুলি হতে পারে। পাকা ফল খেলে এই ধরনের সমস্যা হওয়া সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তবে যাদের আম খেলে অ্যালার্জি হয়, তাদের জন্য আম পরিহার করাই সবচেয়ে ভাল।

সূত্র: নিউট্রিশন অ্যান্ড ইউ ডটকম

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক