প্রশ্নটা বইয়ের নয়, অভ্যাসের

কিনোকুনিয়ার ঢাকায় আগমনকে শুধু আরেকটি বিদেশি ব্র্যান্ডের ব্যবসা সম্প্রসারণ হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের বইয়ের বাজার সম্পর্কে বহুদিনের কিছু ধারণাকে নতুন করে পরীক্ষা করার একটি সুযোগ। দেশে পাঠক আছে কি নেই, বইয়ের বাজার বাড়ছে না কমছে, মানুষ কি এখনও বই কেনে, নাকি সবকিছু ডিজিটালে চলে গেছে—এসব প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু উত্তরগুলি কখনোই এত সরাসরি যাচাইয়ের মুখে পড়েনি।

বাংলাদেশে বইয়ের বাজার নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত দুটি বিপরীত মত শোনা যায়। একদল বলেন, দেশে পাঠক কমে যাচ্ছে; অন্যদল বলেন, অমর একুশে বইমেলার জনসমুদ্রই প্রমাণ করে পাঠকের অভাব নেই। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই মেরুর মাঝামাঝি কোথাও।

প্রতি বছর বইমেলায় লাখ লাখ মানুষ আসেন, কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়, নতুন বই প্রকাশিত হয় হাজার হাজার। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে বছরের বাকি সময়ে অধিকাংশ প্রকাশক ও বই বিক্রেতা সেই মাত্রার বিক্রি ধরে রাখতে পারেন না।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের বড় অংশ এখনও মৌসুমি চক্রের মধ্যে আবদ্ধ; অনেক প্রকাশকের বার্ষিক আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে বইমেলার সময়। অর্থাৎ বইয়ের প্রতি আগ্রহ আছে, কিন্তু নিয়মিত বই কেনার অভ্যাস এখনও তুলনামূলক সীমিত। যে ব্যক্তি বছরে একবার বইমেলায় কয়েকটি বই কেনেন আর যে ব্যক্তি সারা বছর নিয়মিত বই কেনেন, বাজারের জন্য এই দুই পাঠকের মূল্য এক নয়। কিনোকুনিয়ার মত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা মূলত দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশের বইয়ের বাজার আসলে কত বড়?

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখতে হয়। দেশের বইয়ের বাজারের বড় অংশ গড়ে উঠেছে পাঠ্যপুস্তক, সহায়ক বই, চাকরির প্রস্তুতিমূলক বই এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রকাশনার ওপর। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, গবেষণা, শিল্পকলাবিষয়ক বই কিংবা আন্তর্জাতিক প্রকাশনার বাজার তুলনামূলকভাবে ছোট।

ফলে যখন বলা হয় বাংলাদেশের বইয়ের বাজার বড়, তখন তার সবটুকু কিনোকুনিয়ার সম্ভাব্য বাজার নয়। কিনোকুনিয়া মূলত সেই অংশটিকে লক্ষ্য করছে, যেখানে পাঠক বইকে শুধু পরীক্ষার উপকরণ হিসাবে নয়, জ্ঞান, আনন্দ কিংবা ব্যক্তিগত আগ্রহের অংশ হিসাবে কেনেন। তাই বাংলাদেশের বইয়ের বাজার বড়—এই কথাটি সত্য হলেও, কিনোকুনিয়ার জন্য উপযোগী বাজার কত বড়, সেটিই আসল প্রশ্ন।

ঢাকার গুরুত্ব এবং কারা কিনোকুনিয়ার সম্ভাব্য ক্রেতা

এই কারণে ঢাকার গুরুত্বও আলাদা। দেশের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক স্কুল, কর্পোরেট কর্মীবাহিনী, উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সবচেয়ে বড় পাঠকগোষ্ঠী—সবই মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। গত দুই দশকে এমন একটি নগর মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা ইংরেজি বই পড়ে, আন্তর্জাতিক পডকাস্ট শোনে, অনলাইন কোর্স করে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায় বা কাজের সূত্রে বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

তবে জনসংখ্যা বড় হলেই বাজার বড় হয় না। কিনোকুনিয়ার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—এই সম্ভাব্য পাঠকদের হাতে খরচ করার মত অর্থ কতটা আছে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ সংখ্যায় বিশাল হলেও তাদের একটি বড় অংশ এখনও অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর নয়। যুব বেকারত্ব এখনও একটি বাস্তব সমস্যা, এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ বয়সে তরুণ হলেই তিনি কিনোকুনিয়ার সম্ভাব্য ক্রেতা হয়ে উঠছেন না।

এখানেই ঢাকার বিশেষত্ব। কিনোকুনিয়া সম্ভবত বাংলাদেশের গড় তরুণকে লক্ষ্য করে ব্যবসা করছে না। বরং তারা তাকিয়ে আছে অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু উচ্চ ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নগর শ্রেণির দিকে—আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, কর্পোরেট পেশাজীবী, প্রযুক্তিখাতের কর্মী, উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা, গবেষক এবং বিদেশমুখী পরিবারগুলির দিকে।

আরেকটি বাস্তবতা হল, তাদের সম্ভাব্য ক্রেতাদের একটি অংশ নিজের আয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। ঢাকার আন্তর্জাতিক স্কুলগুলির উচ্চ টিউশন ফি, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক পরীক্ষার কোচিং এবং বৈশ্বিক শিক্ষাবাজারে অংশগ্রহণ—সবকিছুই ইঙ্গিত দেয় যে শহরটিতে এমন একটি পরিবার-শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা সন্তানের শিক্ষা ও বইয়ের পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত। যে পরিবার বছরে কয়েক লাখ টাকা শিক্ষাব্যয়ে খরচ করতে পারে, তাদের কাছে দুই বা তিন হাজার টাকার একটি বইয়ের দাম ভিন্নভাবে ধরা পড়ে।

অবশ্য এই বাজারকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক হবে না। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে বটে, কিন্তু “মধ্যবিত্ত” শব্দটির ভেতরেই বিশাল বৈচিত্র্য লুকিয়ে আছে। মাসে ষাট হাজার টাকা আয় করা একটি পরিবার এবং মাসে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করা আরেকটি পরিবার—দুজনেই নিজেদের মধ্যবিত্ত বলতে পারে। কিনোকুনিয়ার প্রকৃত বাজার সম্ভবত এই বিস্তৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপরের স্তরে, যেখানে বই, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক পণ্যের জন্য নিয়মিত ব্যয় করার সামর্থ্য রয়েছে।

এই কারণেই কিনোকুনিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে না বাংলাদেশের ১৮ কোটির বেশি মানুষের ওপর। তাদের দরকার তুলনামূলক ছোট কিন্তু নিয়মিত ব্যয়ক্ষম একটি পাঠকগোষ্ঠী। যদি ঢাকায় এমন কয়েক দশ হাজার পরিবার থাকে, যারা বছরে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা বই, স্টেশনারি, মাঙ্গা, শিশুতোষ প্রকাশনা বা শিক্ষাসামগ্রীর পেছনে খরচ করতে প্রস্তুত, তাহলে একটি প্রিমিয়াম বইয়ের দোকানের জন্য সেটাই যথেষ্ট হতে পারে।

ফলে কিনোকুনিয়ার আগমনকে শুধু বইয়ের বাজারের পরীক্ষা হিসাবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে ঢাকার শিক্ষিত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও আন্তর্জাতিকমুখী নগর শ্রেণির সাংস্কৃতিক ভোক্তা-আচরণেরও একটি পরীক্ষা। প্রশ্নটি কেবল মানুষ বই পড়ে কিনা, তা নয়; প্রশ্ন হল, তারা বইকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যয় হিসাবে বিবেচনা করে।

বাংলা বনাম ইংরেজি: দ্বৈত বাজারের বাস্তবতা

বাংলাদেশে ইংরেজি বইয়ের বাজার বাড়লেও পাঠকের বিশাল অংশ এখনও বাংলা ভাষাভিত্তিক। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কিনোকুনিয়ার সাফল্য শুধু আমদানি করা ইংরেজি বইয়ের ওপর নির্ভর করবে না। তারা বাংলা বইকে কতটা গুরুত্ব দেয়, কীভাবে উপস্থাপন করে, এবং বাংলা ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনার মধ্যে কী ধরনের সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

যদি দোকানটি শুধু ইংরেজি ভাষার একটি দ্বীপে পরিণত হয়, তাহলে বাজার সীমিত থাকবে। কিন্তু যদি এটি বাংলা ও বৈশ্বিক পাঠ-সংস্কৃতির মিলনস্থল হয়ে উঠতে পারে, তাহলে সম্ভাবনা অনেক বড়।

পাঠক সমাবেশ: বইয়ের দোকান থেকে পাঠকসমাজ

বাংলাদেশের বইয়ের খুচরা বাজার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পাঠক সমাবেশকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কঠিন। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু বই বিক্রির ব্যবসা করেনি; বরং কয়েক প্রজন্মের পাঠকের কাছে বইয়ের দোকানকে একটি সাংস্কৃতিক ঠিকানায় পরিণত করেছে। ঢাকার শাহবাগের দোকানটি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র, শিক্ষক, লেখক, গবেষক ও বইপ্রেমীদের মিলনস্থল হিসাবে পরিচিত। এমন এক সময়ে, যখন বইয়ের দোকান মানেই ছিল তাকভর্তি বই আর নগদ বিক্রি, তখন পাঠক সমাবেশ বইকে ঘিরে একটি সম্প্রদায় তৈরির ধারণা সামনে আনে।

যখন বইয়ের দোকান মানেই ছিল তাকভর্তি বই আর নগদ বিক্রি, তখন পাঠক সমাবেশ বইকে ঘিরে একটি সম্প্রদায় তৈরির ধারণা সামনে আনে।

কিনোকুনিয়ার জন্য পাঠক সমাবেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণে। বাংলাদেশে এমন পাঠক যে বই কিনতে দোকানে যেতে রাজি, তাক ঘেঁটে বই আবিষ্কার করতে পছন্দ করে, বইয়ের দোকানে সময় কাটাতে ভালবাসে—এই সংস্কৃতি শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। এর পেছনে পাঠক সমাবেশের মত প্রতিষ্ঠানের কয়েক দশকের অবদান রয়েছে। ফলে কিনোকুনিয়া এমন একটি বাজারে প্রবেশ করছে, যেখানে বইয়ের দোকানকে শুধু বিক্রয়কেন্দ্রের চেয়ে বেশি কিছু হিসাবে দেখার একটি ঐতিহ্য আগে থেকেই আছে।

বাতিঘর: অভিজ্ঞতাকে পণ্য বানানোর পাঠ

যদি পাঠক সমাবেশ বইয়ের দোকানকে পাঠকসমাজের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে থাকে, তবে বাতিঘর দেখিয়েছে কীভাবে একটি বইয়ের দোকান নিজেই একটি গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করে পরে ঢাকায় বিস্তার লাভ করা বাতিঘর বই বিক্রির পাশাপাশি নান্দনিক স্থাপত্য, আরামদায়ক পরিবেশ, দীর্ঘ সময় ধরে বই ঘাঁটার সুযোগ এবং কিউরেটেড সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছে। অনেক পাঠকের কাছে সেখানে যাওয়া শুধু বই কেনা নয়; বরং একটি অভিজ্ঞতা।

বিশ্বের নানা শহরে কিনোকুনিয়া বহু বছর ধরে যে ‘ডেস্টিনেশন বুকস্টোর’ ধারণা অনুসরণ করছে, বাংলাদেশের বাজারে বাতিঘর তার একটি স্থানীয় সংস্করণ তৈরি করেছে।

এই দিক থেকে দেখলে বাতিঘর এবং কিনোকুনিয়ার মধ্যে একটি আকর্ষণীয় মিল আছে। বিশ্বের নানা শহরে কিনোকুনিয়া বহু বছর ধরে যে ‘ডেস্টিনেশন বুকস্টোর’ ধারণা অনুসরণ করছে, বাংলাদেশের বাজারে বাতিঘর তার একটি স্থানীয় সংস্করণ তৈরি করেছে। অবশ্য দুটির শক্তি এক নয়। বাতিঘরের শক্তি বাংলা বই, স্থানীয় পাঠক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ; কিনোকুনিয়ার শক্তি আন্তর্জাতিক সংগ্রহ, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বহুভাষিক প্রকাশনা। কিন্তু দুটিই একই মৌলিক ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে: মানুষ শুধু বই কিনতে আসে না, বইয়ের আশপাশে তৈরি হওয়া পরিবেশের জন্যও আসে।

আসল প্রতিদ্বন্দ্বী: পাইরেসি

তবে কিনোকুনিয়ার প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভবত অন্যত্র। সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী পাইরেটেড বইয়ের বাজার। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের পাঠক একই বইয়ের তিনটি সংস্করণ দেখে অভ্যস্ত—মূল আন্তর্জাতিক সংস্করণ, ভারতীয় সংস্করণ এবং পাইরেটেড সংস্করণ। অনেক ক্ষেত্রে একটি বইয়ের আন্তর্জাতিক সংস্করণের দাম যেখানে দুই হাজার টাকার বেশি, সেখানে পাইরেটেড সংস্করণ পাওয়া যায় কয়েকশ টাকায়।

কিন্তু পাইরেসির জনপ্রিয়তার কারণ শুধু দাম নয়। অনেক সময় পাঠক আসল সংস্করণ কিনতে চান, কিন্তু সেটি দেশে সহজে পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে বই প্রকাশের কয়েক মাস পরও বাংলাদেশে পৌঁছায় না, কিংবা পৌঁছালেও সীমিত সংখ্যায় আসে। কিনোকুনিয়ার একটি সম্ভাব্য শক্তি এখানেই—তারা যদি দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং বিস্তৃত আমদানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে অন্তত একাংশ পাঠক বৈধ সংস্করণের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী: রকমারি

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হল রকমারি। গত এক দশকে বাংলাদেশের বই কেনার অভ্যাসে যে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে, সেটি সম্ভবত এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। আগে একটি বই খুঁজে পেতে পাঠককে দোকান ঘুরতে হত; এখন মোবাইল ফোন থেকেই অর্ডার করা যায়। দেশের প্রায় সব বড় প্রকাশকের বই এক জায়গায় পাওয়ার সুবিধা, ছাড় এবং বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রকমারিকে একটি শক্তিশালী খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

তবে রকমারি এবং কিনোকুনিয়া আসলে দুই ভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল। রকমারির শক্তি সুবিধা, ডিসকাউন্ট এবং দ্রুত ডেলিভারি। কিনোকুনিয়ার শক্তি হবে আবিষ্কার, ব্রাউজিং, আকস্মিক বই-খুঁজে-পাওয়া এবং দোকানে থাকার অভিজ্ঞতা। ফলে প্রশ্নটা শুধু কে বেশি বই বিক্রি করবে তা নয়; বরং পাঠক কোন পরিস্থিতিতে কোন প্ল্যাটফর্ম বেছে নেবে, সেটি।

নতুন পাঠক তৈরির চ্যালেঞ্জ

নতুন পাঠক তৈরির বিষয়টি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের একটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা হল, নতুন পাঠক তৈরির কাজ খুব সীমিত। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান পাঠকদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। অথচ পাঠক তৈরি হয় শৈশবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, শিশু থেকে কিশোর এবং কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকে রূপান্তরের পথে বড় একটি অংশ হারিয়ে যায়। অনেক শিশু বই পড়ে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মজীবনে প্রবেশের পর তাদের বড় অংশ নিয়মিত পাঠাভ্যাস ধরে রাখতে পারে না। এই ‘রিডিং ড্রপ-অফ’ সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বহু দেশের বাস্তবতা।

বাংলাদেশের পাঠকসংস্কৃতির আরেকটি বৈপরীত্য হল, বইমেলায় ভিড় করা মানুষ আর সারা বছর বই কেনা মানুষ সবসময় একই ব্যক্তি নন। অনেকেই বইকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসাবে ভালবাসেন, কিন্তু নিয়মিত কেনেন না। ফলে নতুন পাঠক তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান পাঠকদের নিয়মিত ক্রেতায় রূপান্তর করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

লাভ করবে কীভাবে?

বর্তমান বিশ্বে শুধু বই বিক্রি করে বড় বইয়ের দোকান চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই বিশ্বের বড় বড় বইয়ের দোকান এখন বইয়ের পাশাপাশি স্টেশনারি, উপহারসামগ্রী, মাঙ্গা ও অ্যানিমে পণ্য, সদস্যপদ কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্যাফে, শিক্ষা-উপকরণ এবং বিশেষ আমদানিকৃত পণ্যের ওপরও জোর দেয়।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি সম্ভাবনা আছে, যা তুলনামূলক কম আলোচিত। সেটি হল প্রাতিষ্ঠানিক বা B2B বাজার। আন্তর্জাতিক স্কুল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, কর্পোরেট লাইব্রেরি এবং বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য বই ও তথ্যসেবা সরবরাহের বাজার এখনও অনেকাংশে অগোছালো। জাপানে কিনোকুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবসাগুলির একটি এই খাতেই। বাংলাদেশেও তারা যদি এই ক্ষেত্রটিতে প্রবেশ করে, তাহলে খুচরা বিক্রির বাইরে একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস তৈরি করতে পারবে।

কিনোকুনিয়ার আগমন থেকে স্থানীয়রা কী শিখতে পারে?

কিনোকুনিয়ার আগমনকে স্থানীয় বইয়ের দোকানগুলির জন্য হুমকি হিসাবে দেখার প্রলোভন আছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কোনো বাজারে ঢুকলেই স্থানীয় খেলোয়াড়রা হারিয়ে যায় না। অনেক সময় উল্টাটা ঘটে। বাজার বড় হয়, নতুন ক্রেতা আসে, আর স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের শক্তি নতুন করে আবিষ্কার করে।

বাংলাদেশের বইয়ের দোকানগুলির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল তারা স্থানীয় পাঠককে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক ভাল চেনে। তাই দামের লড়াইয়ে নামা বা কিনোকুনিয়াকে অনুকরণ করার চেষ্টা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বরং বাংলা সাহিত্য, ছোট প্রকাশনা, স্বাধীন প্রকাশক, আঞ্চলিক ইতিহাস, স্থানীয় গবেষণা এবং নতুন লেখকদের বইয়ের মত ক্ষেত্রগুলিতে তাদের স্বাভাবিক শক্তিকে আরও জোরালো করতে হবে।

বাস্তবে পাঠক সমাবেশ, বাতিঘর, রকমারি এবং কিনোকুনিয়া—চারটি প্রতিষ্ঠান চার ধরনের শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। পাঠক সমাবেশের শক্তি দীর্ঘদিনের পাঠকসম্প্রদায়, বাতিঘরের শক্তি অভিজ্ঞতাভিত্তিক বইয়ের পরিবেশ, রকমারির শক্তি প্রযুক্তি ও সুবিধা, আর কিনোকুনিয়ার শক্তি আন্তর্জাতিক সংগ্রহ ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা। ভবিষ্যতের সফল বইয়ের দোকান সম্ভবত এই চার ধরনের শক্তির কোনো না কোনো সমন্বয় ঘটাতে পারবে।

কিনোকুনিয়ার কী করা দরকার?

বাংলাদেশে কিনোকুনিয়ার সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি তারা মনে করে, তাদের সবার জন্য বইয়ের দোকান হতে হবে।

ঢাকার বাজারে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের খেলোয়াড় আছে। বাংলা বইয়ের ক্ষেত্রে আছে প্রকাশক-নির্ভর বাজার, পাঠক সমাবেশের মত পুরোনো প্রতিষ্ঠান, বাতিঘরের মত অভিজ্ঞতাভিত্তিক বইয়ের দোকান, আর রকমারির মত শক্তিশালী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এই বাস্তবতায় সবার সঙ্গে একযোগে প্রতিযোগিতায় নামা কিনোকুনিয়ার জন্য প্রয়োজনীয়ও নয়, লাভজনকও নয়।

বরং তাদের শক্তি এমন এক জায়গায়, যেখানে অন্যদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

সেটি হল আন্তর্জাতিক বই, বৈশ্বিক প্রকাশনা, কিউরেটেড সংগ্রহ এবং প্রিমিয়াম পাঠ-অভিজ্ঞতা।

কিনোকুনিয়ার প্রকৃত প্রতিযোগিতা সম্ভবত শাহবাগের বইয়ের দোকানের সঙ্গে নয়; বরং অ্যামাজন, বিদেশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে বই আনা, কিংবা বিদেশফেরত পাঠকের প্রত্যাশার সঙ্গে। যে পাঠক লন্ডন, সিঙ্গাপুর, টোকিও বা দুবাইয়ের বড় বইয়ের দোকানে গিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশে একই ধরনের অভিজ্ঞতা খুঁজে পান না। কিনোকুনিয়া সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।

এই কারণে কিনোকুনিয়ার মূল পণ্য আসলে বই নয়; আভিজাত্য। তবে আভিজাত্য বলতে এখানে কৃত্রিম চাকচিক্য বোঝানো হচ্ছে না। বরং এমন একটি অভিজ্ঞতা, যেখানে বইয়ের নির্বাচন, দোকানের পরিবেশ, কর্মীদের জ্ঞান, বইয়ের বিন্যাস, শিশুদের বিভাগ, স্টেশনারি, শিল্প-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান এবং সামগ্রিক পরিবেশ—সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট মান বজায় থাকে।

এই মান ধরে রাখার জন্য তাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে তিনটি বিষয়ে।

প্রথমত, সংগ্রহ। বাংলাদেশের অধিকাংশ বইয়ের দোকানে যে বই পাওয়া যায়, কিনোকুনিয়ার তাকেও যদি সেই একই বই ভরে যায়, তাহলে তাদের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা কমে যাবে। তাদের শক্তি হওয়া দরকার বিরল, নতুন, আন্তর্জাতিক এবং বিশেষায়িত বই। গবেষণা, শিল্পকলা, স্থাপত্য, নকশা, ফটোগ্রাফি, শিশুতোষ সাহিত্য, গ্রাফিক নভেল, বিজ্ঞান, ব্যবসা ও সমসাময়িক নন-ফিকশনের মত বিভাগে তারা পার্থক্য গড়ে তুলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পরিবেশ। অনেক বইয়ের দোকান বই বিক্রি করে; কিন্তু খুব কম দোকান এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে মানুষ বই না কিনেও এক ঘণ্টা কাটাতে চায়। কিনোকুনিয়ার দরকার নিজেদেরকে একটি “তৃতীয় স্থান” হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা—বাড়ি ও কর্মক্ষেত্রের মাঝামাঝি এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ পড়তে, ভাবতে, আবিষ্কার করতে এবং সময় কাটাতে আসে।

তৃতীয়ত, সম্প্রদায়। বাংলাদেশের বইয়ের বাজারে একটি বড় সুযোগ হল আন্তর্জাতিকমুখী পাঠকদের জন্য নিয়মিত অনুষ্ঠান। লেখক-আলোচনা, নতুন বই উন্মোচন, শিশুদের গল্পপাঠ, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বুক ক্লাব, অনুবাদ-আলোচনা, এমনকি বিদেশি প্রকাশকদের সঙ্গে যৌথ অনুষ্ঠান—এসবের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে শুধু বিক্রেতা নয়, সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারী হিসাবেও প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

তাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্রেতাও সম্ভবত সাধারণ অর্থে “সব পাঠক” নন। বরং আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, প্রযুক্তিখাতের পেশাজীবী, বিদেশফেরত পরিবার এবং সন্তানদের শিক্ষার পেছনে বড় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিই তাদের মূল গ্রাহক হতে পারে। সংখ্যায় তারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, কিন্তু বইয়ের জন্য ব্যয় করার ক্ষমতা এবং আগ্রহ—দুটিই তাদের বেশি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, কিনোকুনিয়ার দরকার নিজেদেরকে “সবার বইয়ের দোকান” হিসাবে নয়, “সেরা বইয়ের দোকান” হিসাবে ভাবা। কারণ ইতিহাস বলছে, প্রিমিয়াম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সাধারণত বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে সফল হয় না; বরং নিজেদের জন্য একটি স্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেই সফল হয়।

ঢাকায় কিনোকুনিয়ার ভবিষ্যৎও সম্ভবত সেখানেই। যদি তারা আকারের চেয়ে মান, দামের চেয়ে নির্বাচন, আর বিক্রির চেয়ে অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেয়, তাহলে তারা হয়ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বইয়ের দোকান হয়ে উঠতে পারে।

উপসংহার

সবশেষে প্রশ্নটা হয়ত কিনোকুনিয়া সফল হবে কি হবে না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হল, ঢাকা কি এমন একটি শহরে পরিণত হয়েছে যেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের বইয়ের দোকান দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে?

যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে লাভবান শুধু কিনোকুনিয়া হবে না; হবে পুরো প্রকাশনা শিল্প। এতে আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের আগ্রহ বাড়বে, বৈধ আমদানির পথ শক্তিশালী হবে, পাঠকের পছন্দের পরিসর বাড়বে এবং স্থানীয় বইয়ের দোকানগুলিও নিজেদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে।

আর যদি উত্তর “না” হয়, তাহলেও সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হবে। কারণ তখন বোঝা যাবে, সমস্যা বইয়ের সরবরাহে নয়; সমস্যা পাঠকের অভ্যাস, ক্রয়ক্ষমতা, বাজারের কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারে।

এক অর্থে, উত্তরার সেন্টারপয়েন্টে খোলা এই নতুন দোকানটি শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়। এটি বাংলাদেশের পাঠকসমাজ, প্রকাশনা শিল্প এবং নগর সংস্কৃতির ওপর চালানো এক দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা। আগামী কয়েক বছরে সেই পরীক্ষার ফলাফলই বলে দেবে, ঢাকার বইয়ের বাজার আসলে কতটা গভীর, কতটা পরিণত, আর কতটা প্রস্তুত একটি বৈশ্বিক বই-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ পথ হাঁটার জন্য।

তথ্যসংগ্রহ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: ব্রাত্য রাইসু

লিংক
ওয়েব সাইট
ফেসবুক পেইজ