আজ ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ সহজেই দুধ হজম করতে পারে। কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে ল্যাকটোজ—দুধের প্রধান শর্করা—হজম করার ক্ষমতা ছিল না। ফলে দুধ খেলে পেটের সমস্যা হত। পরে কিছু মানুষের মধ্যে এমন একটি জিন ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের বড় হওয়ার পরও দুধ হজম করতে সাহায্য করত। কিন্তু এই পরিবর্তন পুরো জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে যেতে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর।

অন্যদিকে চশমার কথা ভাবুন। দুর্বল দৃষ্টিশক্তি একসময় মানুষের জন্য বড় অসুবিধা ছিল। কিন্তু চশমা আবিষ্কারের পর সেই সমস্যা অনেকাংশে মিটে গেছে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে। একইভাবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে বহু শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে অল্প সময়েই। অর্থাৎ যে সমস্যাগুলি একসময় জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাধা হতে পারত, এখন সেগুলির অনেকগুলির সমাধান মানুষ প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সামাজিক ব্যবস্থার সাহায্যে অনেক দ্রুত খুঁজে পাচ্ছে।

সেখান থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—মানুষের জীবন ও অভিযোজনকে এখন বেশি প্রভাবিত করছে কোনটি? জিন, নাকি সংস্কৃতি?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক, টিমোথি এম. ওয়্যারিং এবং জ্যাকারি টি. উড, একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করেছেন। ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তাদের গবেষণাপত্র BioScience জার্নালে প্রথম অনলাইনে প্রকাশিত হয় এবং পরে ২১ অক্টোবর মুদ্রিত সংখ্যায় স্থান পায়। গবেষণাপত্রটির নাম Cultural Inheritance Is Driving a Transition in Human Evolution। সেখানে তারা যুক্তি দেন যে মানুষ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, মানুষের অভিযোজনের প্রধান চালিকাশক্তি ধীরে ধীরে জিন থেকে সরে সংস্কৃতির দিকে চলে যাচ্ছে।

এই ধারণার জন্য তারা একটি নতুন নামও প্রস্তাব করেছেন—Evolutionary Transition in Inheritance and Individuality (ETII)। সহজ ভাষায়, মানুষের ভবিষ্যৎ গঠনে জৈবিক উত্তরাধিকারের চেয়ে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গবেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মানবসমাজকে আরও সমন্বিত একটি সুপারঅর্গানিজম বা সমষ্টিজীব-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর বিজ্ঞানভিত্তিক গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকীগুলিতে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

বিবর্তন কি গিয়ার বদলাচ্ছে?

ওয়্যারিং অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন, আর উড পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রাণীর আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন। দুজনেই মেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের Applied Cultural Evolution Lab-এর গবেষক। তাদের মূল বক্তব্য খুবই সরল—জিনগত বিবর্তন সাধারণত ধীরে ঘটে, কারণ জিন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়ায়। কিন্তু সংস্কৃতিগত পরিবর্তন অনেক দ্রুত ঘটতে পারে। একটি নতুন ধারণা, প্রযুক্তি, আইন বা সামাজিক নিয়ম কখনও কখনও কয়েক বছরের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

দুধ হজমের জিনের উদাহরণই ধরা যাক। মানুষের একটি প্রজন্ম পার হতে গড়ে ২০ থেকে ৩০ বছর লাগে। ফলে কোনো নতুন জিন পুরো জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়তে বহু প্রজন্ম লেগে যায়। আবার দুধ হজম করতে পারা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন ছিল না; এটি কেবল কিছু অতিরিক্ত পুষ্টিগত সুবিধা দিত। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনও খুব শক্তভাবে কাজ করেনি। ফলস্বরূপ এই জিনের বিস্তার ঘটতে হাজার হাজার বছর লেগেছে।

কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। একটি কার্যকর ধারণা, প্রযুক্তি বা অভ্যাস মানুষ একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারে। ফলে একই প্রজন্মের মধ্যেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই গবেষকদের মতে, আধুনিক পৃথিবীতে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃতি জিনের চেয়ে দ্রুত মানুষকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করছে।

ওয়্যারিংয়ের ভাষায়, “মানুষের বিবর্তন যেন গিয়ার বদলাচ্ছে।” তার মতে, আমরা যখন অন্যদের কাছ থেকে দক্ষতা শিখি, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি, তখন আসলে এমন এক ধরনের উত্তরাধিকার গ্রহণ করি যা আমাদের দ্রুত অভিযোজিত হতে সাহায্য করে। আর এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার অনেক ক্ষেত্রেই জিনগত পরিবর্তনের চেয়ে দ্রুত কাজ করে।

উড বিষয়টি আরও সরাসরি ভাষায় বলেছেন, “সাংস্কৃতিক বিবর্তন জিনগত বিবর্তনের তুলনায় এত দ্রুত কাজ করে যে দুটির মধ্যে গতি তুলনা করাই কঠিন।”

তাদের দাবি শুধু তাত্ত্বিক নয়। উদাহরণ হিসাবে দেখা যায়, দুর্বল দৃষ্টিশক্তি থাকলেও মানুষ এখন চশমা বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। সিজারিয়ান অপারেশন কিংবা বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা এমন মানুষকেও সন্তান নেওয়ার সুযোগ দেয়, যাদের ক্ষেত্রে অতীতে তা সম্ভব নাও হতে পারত। অর্থাৎ প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এমন অনেক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে, যেগুলি আগে কেবল জৈবিক বিবর্তনের ওপর নির্ভর করত।

এই কারণেই ওয়্যারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন—আপনার জীবনে বেশি প্রভাব ফেলে কোনটি: জন্মের সময় পাওয়া জিন, নাকি আপনি যে সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির মধ্যে বাস করছেন?

তার মতে, আধুনিক বিশ্বে উত্তরটি ক্রমশ দ্বিতীয় দিকেই ঝুঁকছে। একজন মানুষের স্বাস্থ্য, আয়ু, শিক্ষা, নিরাপত্তা কিংবা জীবনমান নির্ধারণে তার জিনের পাশাপাশি—এবং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি—ভূমিকা রাখছে হাসপাতাল, শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

একা মানুষ নয়, দলবদ্ধ মানুষ

এখানেই ওয়্যারিং ও উডের তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে।

জিন আমরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাই। কিন্তু সংস্কৃতি কোনো একজন মানুষের সম্পত্তি নয়। ভাষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, আইন, সামাজিক রীতি কিংবা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান—এসব তৈরি হয় অসংখ্য মানুষের দীর্ঘদিনের যৌথ প্রচেষ্টায়। একজন শেখায়, আরেকজন শেখে, তারপর সেটি আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ সংস্কৃতি মূলত একটি দলগত অর্জন।

গবেষকদের মতে, মানুষের ইতিহাসের বড় বড় পরিবর্তনের পেছনেও এই দলগত সাংস্কৃতিক শক্তিই কাজ করেছে। কৃষির উদ্ভব, নগর সভ্যতার বিকাশ, রাষ্ট্র গঠন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কিংবা গণশিক্ষা—এসব কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। এগুলি বহু মানুষের জ্ঞান, সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সামাজিক ব্যবস্থা।

আজ একজন মানুষের দীর্ঘায়ু হওয়া, শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়া বা রোগ থেকে বেঁচে যাওয়ার পেছনে শুধু তার ব্যক্তিগত জিন কাজ করে না। এর পেছনে রয়েছে হাসপাতাল, ওষুধ, টিকাদান কর্মসূচি, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য নীতি। অর্থাৎ আধুনিক মানুষের টিকে থাকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভর করছে সমাজের সম্মিলিত সক্ষমতার ওপর।

এখান থেকেই গবেষকদের একটি বড় দাবি আসে। তাদের মতে, মানুষ যত বেশি সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে, তত বেশি একটি সমষ্টিজীব সদৃশ সমাজে রূপ নেবে।

এককোষী প্রাণী থেকে বহুকোষী জীব, এবার কি মানুষের পালা?

বিবর্তনের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলি জীবনের গতিপথই বদলে দিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল এককোষী প্রাণী থেকে বহুকোষী প্রাণীর উদ্ভব।

পৃথিবীতে জীবনের শুরুতে অধিকাংশ প্রাণী ছিল এককোষী। কিন্তু কোনো এক সময়ে কিছু কোষ একসঙ্গে কাজ করা শুরু করে। ধীরে ধীরে তারা এমনভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে যে আলাদা হয়ে আর টিকে থাকতে পারে না। ফলাফল হিসাবে জন্ম নেয় বহুকোষী প্রাণী—যেমন মানুষ, গাছপালা বা অন্যান্য প্রাণী।

একই ধরনের ঘটনা দেখা যায় পিঁপড়া ও মৌমাছির মত সামাজিক পোকামাকড়ের মধ্যেও। একটি মৌমাছি বা পিঁপড়া একা পুরো কলোনির কাজ করতে পারে না। কিন্তু হাজার হাজার সদস্য একসঙ্গে কাজ করে এমন একটি সংগঠন তৈরি করে, যা অনেকটা একক জীবের মত আচরণ করে।

জীববিজ্ঞানীরা এই ধরনের পরিবর্তনকে বলেন Evolutionary Transition in Individuality (ETI)। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে আগে যাদের আলাদা ব্যক্তি হিসেবে দেখা হত, তারা পরে একটি বৃহত্তর এককে পরিণত হয়।

ওয়্যারিং ও উডের প্রশ্ন হল—মানুষের ক্ষেত্রেও কি তেমন কিছু ঘটছে?

তাদের মতে, আধুনিক মানুষ ক্রমশ এমন সব সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যা কোনো ব্যক্তি একা তৈরি বা পরিচালনা করতে পারে না। ভাষা, ইন্টারনেট, শিক্ষা ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনীতি, রাষ্ট্র কিংবা স্বাস্থ্যসেবা—এসবের কোনোটিই একক মানুষের সৃষ্টি নয়। এগুলি বিশাল সামাজিক নেটওয়ার্কের ফল।

তাদের দাবি, সংস্কৃতির গুরুত্ব যত বাড়ছে, মানুষকে বোঝার ক্ষেত্রেও “একক ব্যক্তি” ধারণার পাশাপাশি “দল” বা “সমষ্টি” ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ওয়্যারিংয়ের ভাষায়, এখানে একটি আত্মশক্তিবর্ধক চক্র কাজ করে। উন্নত সামাজিক সংগঠন মানুষের মধ্যে সমন্বয় ও যৌথ কর্মকাণ্ডকে আরও শক্তিশালী করে। আবার সেই যৌথ প্রচেষ্টা নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ফলে সমাজ আরও শক্তিশালী হয়। তারপর সেই শক্তিশালী সমাজ আবার নতুন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।

মানুষ কি একদিন “সুপারঅর্গানিজম” বা “সমষ্টিজীব” হয়ে উঠবে?

গবেষকেরা একটি সাহসী সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।

উদাহরণ হিসাবে তারা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা উল্লেখ করেন। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের জিন নিয়েও কাজ করতে পারে। কিন্তু এই প্রযুক্তি তৈরি বা ব্যবহার করা কোনো একক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার বিশাল বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো, গবেষণাগার, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

অর্থাৎ জিনের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণও শেষ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব হচ্ছে।

এই প্রবণতা যদি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের মানুষকে হয়ত কেবল আলাদা আলাদা ব্যক্তি হিসাবে নয়, বরং একটি বৃহৎ সামাজিক ব্যবস্থার অংশ হিসাবেও দেখতে হতে পারে। ওয়্যারিং ও উড এই সম্ভাব্য অবস্থাকে “সুপারঅর্গানিজম” বা “সমষ্টিজীব” ধারণার সঙ্গে তুলনা করেছেন—যেখানে একটি সমাজ এতটাই সমন্বিত হয়ে ওঠে যে সেটি অনেকটা একক জীবের মত কাজ করে।

তবে এটি এখনো একটি তাত্ত্বিক ধারণা, প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য নয়।

এটি কি শুধু ধারণা, নাকি পরীক্ষা করাও সম্ভব?

ওয়্যারিং ও উড বলছেন, তাদের প্রস্তাবিত তত্ত্ব কেবল দার্শনিক আলোচনা নয়; এটি বৈজ্ঞানিকভাবেও পরীক্ষা করা সম্ভব।

তারা এমন কিছু সূচক প্রস্তাব করেছেন, যার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা যাবে মানুষ কতটা জিনগত উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভর করছে আর কতটা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপর। এ জন্য গাণিতিক মডেল ও কম্পিউটার সিমুলেশন তৈরির কাজও চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক বিবর্তন মানেই অগ্রগতি—এমন ধারণা ভুল। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বা ধনী সমাজ অন্যদের চেয়ে “বেশি বিবর্তিত”—এ কথাও তারা বলছেন না।

উডের ভাষায়, বিবর্তন কখনও উপকারী সমাধান তৈরি করে, আবার কখনও ভয়াবহ ফলাফলও বয়ে আনতে পারে। তাই সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারণাকে কোনো নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসাবে দেখা উচিত নয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই তত্ত্ব হঠাৎ করে আসেনি। ২০২১ সালেই ওয়্যারিং ও উড জিন ও সংস্কৃতির সহবিবর্তন নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে এই ধারণার প্রাথমিক রূপ ছিল। ২০২৫ সালের গবেষণাপত্রটি সেই কাজের আরও বিস্তৃত ও পরিণত সংস্করণ, যেখানে নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং অতিরিক্ত প্রমাণ যুক্ত করা হয়েছে।

সবাই কি একমত?

বিজ্ঞানে কোনো নতুন বা বড় তত্ত্বই প্রশ্ন ছাড়া গ্রহণ করা হয় না। ওয়্যারিং ও উডের ETII তত্ত্বও তার ব্যতিক্রম নয়।

তাদের মূল দাবি হল, মানুষ ক্রমশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যেখানে সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান জিনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু সব বিজ্ঞানী এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন।

আপত্তির মূল কারণ হল, ওয়্যারিং ও উড যে ধারণার ওপর তাদের তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন, সেটি মূলত জীববিজ্ঞানের একটি পুরোনো ধারণা—Evolutionary Transition in Individuality (ETI)। এই ধারণা ব্যবহার করা হয় এমন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে, যেখানে অনেক ছোট একক মিলে একটি বড় ও সমন্বিত এককে পরিণত হয়। উদাহরণ হিসেবে এককোষী প্রাণী থেকে বহুকোষী জীবের উদ্ভব বা পিঁপড়া-মৌমাছির কলোনির বিকাশকে ধরা হয়।

সমালোচকদের প্রশ্ন হল—মানব সমাজকে কি সত্যিই একইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের গবেষক আরশাম নেজাদ কুর্কি সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে যুক্তি দিয়েছেন যে এখানে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। তার মতে, মানুষ সহযোগিতা করে, কাজ ভাগাভাগি করে এবং বড় বড় সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে—এ কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে মানব সমাজকে সরাসরি বহুকোষী জীব বা পিঁপড়ার কলোনির সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

কুর্কির আপত্তি মূলত দুটি বিষয়ে।

প্রথমত, জীববিজ্ঞানে ETI তখনই ঘটে যখন একটি দল নিজেই একটি নতুন “জৈবিক একক”-এ পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের শরীরের কোটি কোটি কোষ আলাদা আলাদা বংশবিস্তার করে না; পুরো মানুষটিই একটি জীব হিসাবে বংশবিস্তার করে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র, জাতি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান কি সেভাবে নতুন রাষ্ট্র বা নতুন সমাজ “জন্ম” দেয়? কুর্কির মতে, বাস্তবে এমনটি ঘটে না।

দ্বিতীয়ত, জৈবিক বিবর্তনে প্রাকৃতিক নির্বাচন সরাসরি কাজ করে বংশবিস্তার বা প্রজননের ওপর। যে বৈশিষ্ট্য বেশি সফলভাবে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছায়, সেটিই টিকে থাকে। কিন্তু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। একটি ধারণা, প্রতিষ্ঠান বা সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে, অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, কিন্তু সেটিকে জীববিজ্ঞানের অর্থে “প্রজনন” বলা যাবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কুর্কির বক্তব্য হল, যদি “প্রজনন” বা “নির্বাচন” শব্দগুলির অর্থ খুব বেশি বিস্তৃত করে দেওয়া হয়, তাহলে ETI ধারণাটিই তার নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক অর্থ হারাতে পারে। তখন প্রায় যেকোনো ধরনের সামাজিক পরিবর্তনকেই ETI বলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে, যা ধারণাটিকে দুর্বল করে দেবে।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে কুর্কি সরাসরি ওয়্যারিং ও উডের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করেননি। তিনি মানব সমাজে ETI প্রয়োগ করার বৃহত্তর প্রবণতাটিকেই প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত ও সুসংগঠিত তত্ত্ব বর্তমানে ওয়্যারিং ও উডেরটিই। ফলে তার সমালোচনা স্বাভাবিকভাবেই এই তত্ত্বের ওপরও প্রযোজ্য হয়ে যায়।

এখন পর্যন্ত কুর্কির এই নির্দিষ্ট আপত্তির জবাবে ওয়্যারিং ও উড কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেননি। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানে নতুন ধারণা সাধারণত এভাবেই বিকশিত হয়। একজন গবেষক নতুন ব্যাখ্যা দেন, অন্যরা তার দুর্বলতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, তারপর নতুন তথ্য ও গবেষণার মাধ্যমে বিতর্ক এগিয়ে যায়।

অন্যদিকে ওয়্যারিং ও উডের ধারণার পক্ষে কিছু সমর্থনও রয়েছে। একই গবেষণা ধারার ওপর করা কয়েকটি পর্যালোচনা গবেষণায় দেখা গেছে, জিন ও সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি সহবিবর্তন বিশ্লেষণ করলে তাদের প্রস্তাবিত ধারণার সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। তবে সেখানেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—মানব সমাজ কি সত্যিই এতটা সমন্বিত যে তাকে একটি নতুন বিবর্তনীয় একক হিসাবে বিবেচনা করা যায়?

অর্থাৎ বর্তমানে পরিস্থিতি হল, তত্ত্বটি পুরাপুরি বাতিলও হয়ে যায়নি, আবার সর্বজনস্বীকৃতও হয়ে ওঠেনি। এটি এখনও সক্রিয় বৈজ্ঞানিক বিতর্কের বিষয়।

ওয়্যারিং ও উড নিজেরাও স্বীকার করেন যে তারা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তাদের মতে, মানুষের বিবর্তনে সংস্কৃতির ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে—এটি একটি ব্যাখ্যামূলক কাঠামো বা তাত্ত্বিক মডেল। ভবিষ্যতের গবেষণাই বলে দেবে, এই ধারণা কতটা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে।

ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে?

এই তত্ত্ব সত্য হোক বা না হোক, একটি বিষয় নিয়ে খুব কম বিজ্ঞানীরই দ্বিমত আছে—মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের প্রধান প্রতিরক্ষা ছিল না কোনো নতুন জিনগত পরিবর্তন। বরং টিকা, হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক নিয়মকানুনই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। অর্থাৎ সংকট মোকাবিলায় মানুষ ব্যক্তি হিসাবে নয়, মূলত সংগঠিত সমাজ হিসাবে কাজ করেছে।

ওয়্যারিং ও উডের মতে, ভবিষ্যতেও যদি এই প্রবণতা বাড়তে থাকে, তাহলে মানুষের সাফল্য বা ব্যর্থতা ক্রমশ নির্ভর করবে তার সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাগুলির সক্ষমতার ওপর। কোন সমাজ কত দ্রুত নতুন সমস্যার সমাধান করতে পারে, কত দক্ষভাবে জ্ঞান ছড়াতে পারে এবং কত ভালভাবে সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে—সেটাই হয়ত ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এই তত্ত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানেই। এটি শুধু মানুষের অতীত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে না, বরং ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি প্রশ্ন তোলে।

যদি আমাদের জীবন ক্রমশ প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তাহলে “স্বাধীন ব্যক্তি” হিসাবে মানুষের পরিচয় কতটা বদলাবে? ভবিষ্যতের মানুষ কি প্রধানত একজন ব্যক্তি, নাকি একটি বৃহত্তর সামাজিক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা নেই। তবে ওয়্যারিং ও উডের গবেষণা অন্তত এটুকু মনে করিয়ে দেয় যে মানব বিবর্তনের গল্প হয়ত শুধু ডিএনএর গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ধারণা, জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সহযোগিতারও গল্প।

তথ্যসংগ্রহ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: ব্রাত্য রাইসু